মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে ঘুষখোর এসিল্যান্ড আবিদ ও সার্ভেয়ার নাজমুলের ত্রাসের রাজত্ব
- আপডেট: ০৭:৫৪:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
- / ১৮০০৬
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের অন্তর্গত ১৩টি মৌজা এবং ২টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন এক দুর্নীতি ও ঘুষের মহোৎসবের বিস্তারিত চিত্র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যেখানে সরকারি সেবার নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন ৩৮ ব্যাচের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ রেফাঈ আবিদ। যার প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এবং নির্দেশনায় পুরো কার্যালয়টি এখন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁর এই ঘুষ সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি হিসেবে কাজ করছেন সার্ভেয়ার থেকে সদ্য কানুনগো পদে পদোন্নতি পাওয়া নাজমুল। যিনি নিজের অবৈধ আয়ের ধারা সচল রাখতে এবং এই সার্কেলে নিজের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তদবিরের মাধ্যমে এখানেই রয়ে গেছেন বলে গোপন সূত্রে জানা যায়। এই সিন্ডিকেটের জাল এতটাই বিস্তৃত যে নামজারি সহকারী রাকিব ও খাদিজা এবং মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান ও সঞ্জীব ধুনিয়া এই পুরো প্রক্রিয়ার মাঠ পর্যায়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। তারা সরকারি দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন বহিরাগত দালাল ও তথাকথিত ওমেদারদের মাধ্যমে ফাইলের মূল অনুলিপি বা হার্ডকপি নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেন। তারা ‘লাইন’ নামক একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুসংগঠিত চ্যানেলের মাধ্যমে সেবা নিতে আসা সাধারণ ভূমি মালিকদের জিম্মি করে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা পকেটে ভরছেন। এই প্রক্রিয়ার সার্বিক তদারকি ও ঘুষের অর্থ সংগ্রহ নিশ্চিত করেন এসিল্যান্ডের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী অফিস সহকারী রাকিব যার অনুমতি ছাড়া কার্যালয়ের কোনো ফাইলে হাত দেওয়ার দুঃসাহস কেউ দেখায় না। এই পুরো কার্যালয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পরিকল্পিতভাবে ঘুরিয়ে রাখা হয় যাতে ঘুষের টাকা লেনদেনের কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ভিডিও ফুটেজ রেকর্ডেড না থাকে। এই অন্ধকারের রাজত্বে এসিল্যান্ড সৈয়দ রেফাঈ আবিদ নিজের একটি সুনির্দিষ্ট ও লিখিত গোপন ঘুষের রেট চার্ট তৈরি করেছেন যা অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। এই রেট চার্ট অনুযায়ী ‘খ’ তফসিলভুক্ত যেকোনো ফাইলের জন্য নির্ধারিত ঘুষের পরিমাণ ৩০,০০০ টাকা যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১৪,০০০ টাকা সরাসরি চলে যায় এসিল্যান্ড আবিদের পকেটে এবং ‘পার্ট এলএ’ ও ‘পার্ট খাস’ জমির ফাইলের অনুমোদন পেতে হলে গুনতে হয় ১৬,০০০ টাকা যার মধ্যে ৭,০০০ টাকা এসিল্যান্ডের জন্য অবধারিতভাবে বরাদ্দ থাকে। সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষের হার ৮,৫০০ টাকা ধার্য করা হলেও জমির পরিমাণ ১০ শতকের বেশি হলেই এই ঘুষের অংক মুহূর্তের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়। যেকোনো সাধারণ বা ছোটখাটো আবেদনের জন্য সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা দিতে হয় যার মধ্যে মাত্র ১০ শতক জমির জন্য এসিল্যান্ডের নিজস্ব ভাগ ২,০০০ টাকা এবং ১০ শতকের বেশি হলে তাঁর ভাগের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। শিল্পসমৃদ্ধ শ্যামপুর এলাকার শিল্প প্লটের ফাইলের অনুমোদন দেওয়ার জন্য কেবল এসিল্যান্ড আবিদকেই দিতে হয় এককালীন ২০,০০০ টাকা এবং কোনো মিসকেসের ফাইল উত্থাপিত হলেই তার ধরণ ও গুরুত্ব বিবেচনা করে ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়। ঘুষ লেনদেনের এই সমস্ত ভয়ংকর প্রমাণ গোপন রাখতে এবং কারা টাকা দিয়েছে তা নিশ্চিত করতে এসিল্যান্ড আবিদ ফাইলে একটি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা ‘বিশেষ চিহ্ন ব্যবস্থা’ ব্যবহার করেন। যে সমস্ত ফাইলে বা আবেদনে এই সুনির্দিষ্ট চিহ্নটি অনুপস্থিত থাকে সেগুলো কোনো কারণ ছাড়াই সরাসরি নামঞ্জুর করে দেওয়া হয়। এই অর্থলোভী কর্মকর্তার চাহিদামতো পর্যাপ্ত ঘুষের টাকা না দেওয়ায় এবং নির্ধারিত রেটের চেয়ে কম টাকা প্রস্তাব করায় ১২৩৫/২৫-২৬ নম্বর কেসটি যা সিটি নামজারি থেকে নামজারি কর্তন হওয়ার কথা ছিল তা সম্পূর্ণ আটকে রাখা হয়েছে। এই বিশাল ঘুষ বাণিজ্যের অর্থ সংগ্রহের জন্য এসিল্যান্ড আবিদ তাঁর নিজস্ব একটি ক্যাডার ও দালাল বাহিনী লালন-পানন করেন। যারা সাধারণ মানুষ ও ভূমি সেবাগ্রহীতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে সরাসরি এসিল্যান্ডের টেবিলে পৌঁছে দেয়। এই কার্যালয়ের মূল ফটক দিনের বেলা সরকারি নিয়মে চললেও প্রকৃত অর্থে রাত ১০টা পর্যন্ত অফিসের ভেতরে লাইট জ্বালিয়ে চলে টাকার বান্ডিল গোনার কাজ। বাইরে থেকে অফিস বন্ধ মনে হলেও ভেতরে দালালদের আনাগোনা ও ফাইলের স্তূপ সচল থাকে। এর আগে গত ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সোনালী খবরের প্রথম পাতায় এই এসিল্যান্ড আবিদের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে একটি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও উচ্চতর প্রশাসন থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এই কর্মকর্তা এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করেন এবং এই দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার কারণে অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের ও গুমের হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন এবং অত্যন্ত অহংকার করে বলেছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে প্রতিবেদককে তুলে নিয়ে গিয়ে এমন জায়গায় গায়েব করে দেবেন যে কেউ তাঁর খোঁজ পাবে না। প্রজাতন্ত্রের একজন সাধারণ বেতনভোগী কর্মচারী হয়েও সরকারের একাধিক সংস্থাকে ব্যবহার করে একজন সাংবাদিককে গুম করার এই দুঃসাহস তিনি কোথা থেকে পাচ্ছেন তা নিয়ে সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের অধীনে থাকা সাধারণ নাগরিকরা এখন তীব্র আতঙ্ক ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন । কারণ সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ঘুষ না দিলে ফাইল হারিয়ে যায় অথবা বাতিল করে দেওয়া হয় আর মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই মাত্র একদিনের মধ্যে সমস্ত অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। সরকারি সেবা যেখানে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা সেখানে এই মতিঝিল ভূমি অফিসটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক এবং শোষণের উৎসে পরিণত হয়েছে যেখানে আবিদের মুখের কথাই অঘোষিত আইন হিসেবে গণ্য হয় এবং তাঁর এই বেপরোয়া কালোবাজারি ও জিম্মিদশার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই প্রশাসনিক দানব ও দুর্নীতিলিপ্সু চক্রের বিরুদ্ধে যদি এখনই উচ্চপর্যায়ের কোনো বিচার বিভাগীয় বা দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা হয় তবে এই জনভোগান্তি আরও চরম আকার ধারণ করবে। সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যবস্থার ওপর থেকে চিরতরে আস্থা হারিয়ে ফেলে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে যা কোনো প্রগতিশীল রাষ্ট্রের জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম ও প্রকাশ্য লুণ্ঠনের অবসান ঘটিয়ে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং দেশের ভূমি সেবা খাতকে রক্ষা করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সাথে এই এসিল্যান্ড আবিদ চক্রের সাথে জড়িত প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চালিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।



















