০৬:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

গোপালগঞ্জ থেকে বগুড়া: পরিচয় বদলের অভিযোগে বিমান চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক তথ্য

  • আপডেট: ০১:৪০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০৬

মো.দীন ইসলাম:

৫ আগস্টের পুর্বে গোপালঞ্জ, পরে বগুড়া! বিমান চিকিৎসক এর অভুতপুর্ব জালিয়াতি!

জন্মনিবন্ধন জালিয়াতির ফৌজদারি অপরাধ থেকে চাকুরীচ্যুতির সুপারিশ —শেষ পর্যন্ত মাত্র তিন ইনক্রিমেন্ট কর্তন!বিমানের চিকিৎসক ডা. আব্দুর রহমানকে ঘিরে তদন্ত, পুনঃতদন্ত ও শাস্তি কমানোর সিদ্ধান্তে নানা প্রশ্ন!

বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স লিমিটেডের একজন চিকিৎসককে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত, চাকুরীচ্যুতির সুপারিশ এবং পরবর্তীতে শাস্তি লঘু করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রশাসনিক দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডা. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে জন্মস্থান সংক্রান্ত তথ্য গোপন, পরস্পরবিরোধী সরকারি নথি ব্যবহার, বিদেশ সফরে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল।

জন্মস্থান নিয়ে দ্বৈত পরিচয়ের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. আব্দুর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্র, এসএসসি সনদ এবং ২০১৯ সালে ইস্যুকৃত পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে বগুড়ার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু চাকুরীতে যোগদানের সময় এবং পরবর্তী বিভিন্ন প্রশাসনিক নথিতে তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ও জন্মস্থানধারী হিসেবে উপস্থাপন করেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চাকুরী লাভের ক্ষেত্রে এই পরিচয় পরিবর্তন কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ২০২১ সালে তিনি গোপালগঞ্জকে জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন গ্রহণ করেন। অথচ পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় নথিতে জন্মস্থান ছিল বগুড়া। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং যথাযথ আইনি ভিত্তি ছাড়া এ ধরনের পরিবর্তন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একাধিক নথিতে একই তথ্য, নাকি পরিকল্পিত উপস্থাপন?

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, চাকুরীতে যোগদানের সময় পূরণ করা ব্যক্তিগত তথ্য ফরম, পার্সোনাল ফাইল এবং পরবর্তী বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR)-এও গোপালগঞ্জকে জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি এটি কেবল অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে থাকে, তবে কীভাবে একই তথ্য ধারাবাহিকভাবে একাধিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত হলো?

আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বাংলাদেশ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধনে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা ভুয়া তথ্য প্রদান করলে—সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫,০০০ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড
প্রযোজ্য হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
বিদেশ সফরে বারবার একই চিকিৎসক কেন?

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিদেশ সফর এবং একজন ঊর্ধ্বতন দুদক কর্মকর্তার সফরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ যাত্রায় তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।তিনি যেসব সফরে অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে—১৬.০৯.২০২৩ ২৩.০১.২০২৪ ২৫.০১.২০২৪
১১.০৬.২০২৪ (সিঙ্গাপুর) — ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে।
২৫.০৯.২০২৩ (ব্যাংকক) — দুদকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে।

অতীতে ছাত্রলীগ করা ও গোপালঞ্জ বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর প্রচলিত বিধিবহির্ভূত এই সফরে শুধুমাত্র তাকেই মনোনীত করা হয়।

বিমানে একাধিক চিকিৎসক কর্মরত থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার একই ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগকারীদের মতে, এসব সফরের ফলে টিকিট, ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রধান চিকিৎসকের মনোনয়ন নিয়েও প্রশ্ন:

উক্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ১৮ আগস্ট ২০২৩, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ও ০৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিঃ তারিখে VVIP ফ্লাইটে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) ও নিরাপত্তা বিভাগে প্রেরিত কাগজপত্রসমূহ বিমানের প্রধান চিকিৎসক দ্বারা যাচাইপূর্বক সাক্ষরিত ছিল।এছাড়া তার প্রতি বছর জমাকৃত ACR প্রধান চিকিৎসক কর্তৃক সাক্ষরিত ছিল।

এমতাবস্থায়, উক্ত অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বিমানের প্রধান চিকিৎসক এর নজর এড়িয়ে কিভাবে যাচাই-সাক্ষর সম্পন্ন হলো, তা প্রশাসনের নিকট রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

নিরাপত্তা ভেটিংয়ে ভিন্ন পরিচয়?
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিরাপত্তা সংক্রান্ত নথিতে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন।

সূত্রের দাবি, ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা ভেটিংয়ের জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) ও অন্যান্য সংস্থায় প্রেরিত নথিপত্র পর্যালোচনার সময় জন্মস্থান সংক্রান্ত অসঙ্গতি সামনে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে গোপালগঞ্জ পরিচয় ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় আবার বগুড়ার পরিচয় উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

ফরেন পোস্টিং ভাইভা বোর্ডে পক্ষপাতের অভিযোগ

ডা. আব্দুর রহমান ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিমানে যোগদান করেন। এরপর থেকে যতগুলো ফরেন পোস্টিং সংক্রান্ত ভাইভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই তিনি মেডিকেল বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি সেখানে সিনিয়র ও জুনিয়র মিলিয়ে আরও তিনজন চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এতে বোর্ড গঠনের নিরপেক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সরকার পতনের সময় অননুমোদিত অনুপস্থিতি
সূত্র মতে—সরকার পতনের আগে ১ তারিখ তিনি গোপালগঞ্জে যান

পতনের পর ৭ তারিখ পর্যন্ত তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন
এই সময়ের জন্য কোনো অনুমোদিত ছুটি নেননি
৮ তারিখ স্বল্প সময়ের জন্য অফিসে এসে পুনরায় চলে যান
পরে প্রধান চিকিৎসকের সহায়তায় অনুপস্থিতিকে ছুটি হিসেবে সমন্বয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলে থাকা ব্যক্তিকে সিক লিভ দেওয়ার অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—
ফার্স্ট অফিসার অনিন্দ রেজার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তিনি জেলে থাকা অবস্থায় বিমানের চাকরিতে অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ সেই সময়কে অসুস্থতাজনিত ছুটি (Sick Leave) হিসেবে দেখিয়ে ডা. আব্দুর রহমান সিক লিভ অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলে থাকা অবস্থায় কোনো কর্মচারীর সিক লিভ পাওয়ার সুযোগ নেই। এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের শামিল।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, এরপরও পুনঃতদন্ত কেন?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ২০২৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এবং ১৩ জুন ২০২৫ তারিখের ভিভিআইপি ফ্লাইট-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার পর বিমানের নিরাপত্তা বিভাগ এবং পরবর্তীতে তদন্ত বিভাগ অভিযোগগুলোর বিষয়ে নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ প্রদান করে।
এর ভিত্তিতে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. আব্দুর রহমানকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন এবং চাকুরীচ্যুতির শাস্তি কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় নতুন বিতর্ক।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে বিভিন্ন মহলের তদবির ও প্রভাবের কারণে বিষয়টি পুনঃতদন্তে পাঠানো হয়। প্রশ্ন উঠেছে—যদি অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিদ্যমান থাকে, তাহলে পুনঃতদন্তের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?
চাকুরীচ্যুতি থেকে তিন ইনক্রিমেন্ট কর্তন সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ৪ জুন ২০২৬ তারিখে বর্তমান এমডি ও সিইও স্বাক্ষরিত এক আদেশে ডা. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে চাকুরীচ্যুতির পরিবর্তে তিনটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কর্তনের শাস্তি আরোপ করা হয়।
এ সিদ্ধান্তের পর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যে অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে চাকুরীচ্যুতির মতো সর্বোচ্চ প্রশাসনিক শাস্তির আলোচনা হয়েছিল, সেগুলোর পরিণতি কীভাবে তুলনামূলক লঘু শাস্তিতে সীমাবদ্ধ হলো?
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
বিমানের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তদন্তের ফলাফল, পুনঃতদন্তের যৌক্তিকতা এবং শাস্তি কমানোর কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।

তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে একই ধরনের অভিযোগে সবার জন্য সমান মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহল পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়ন এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

গোপালগঞ্জ থেকে বগুড়া: পরিচয় বদলের অভিযোগে বিমান চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক তথ্য

আপডেট: ০১:৪০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

মো.দীন ইসলাম:

৫ আগস্টের পুর্বে গোপালঞ্জ, পরে বগুড়া! বিমান চিকিৎসক এর অভুতপুর্ব জালিয়াতি!

জন্মনিবন্ধন জালিয়াতির ফৌজদারি অপরাধ থেকে চাকুরীচ্যুতির সুপারিশ —শেষ পর্যন্ত মাত্র তিন ইনক্রিমেন্ট কর্তন!বিমানের চিকিৎসক ডা. আব্দুর রহমানকে ঘিরে তদন্ত, পুনঃতদন্ত ও শাস্তি কমানোর সিদ্ধান্তে নানা প্রশ্ন!

বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স লিমিটেডের একজন চিকিৎসককে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত, চাকুরীচ্যুতির সুপারিশ এবং পরবর্তীতে শাস্তি লঘু করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রশাসনিক দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডা. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে জন্মস্থান সংক্রান্ত তথ্য গোপন, পরস্পরবিরোধী সরকারি নথি ব্যবহার, বিদেশ সফরে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল।

জন্মস্থান নিয়ে দ্বৈত পরিচয়ের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. আব্দুর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্র, এসএসসি সনদ এবং ২০১৯ সালে ইস্যুকৃত পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে বগুড়ার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু চাকুরীতে যোগদানের সময় এবং পরবর্তী বিভিন্ন প্রশাসনিক নথিতে তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ও জন্মস্থানধারী হিসেবে উপস্থাপন করেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চাকুরী লাভের ক্ষেত্রে এই পরিচয় পরিবর্তন কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ২০২১ সালে তিনি গোপালগঞ্জকে জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন গ্রহণ করেন। অথচ পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় নথিতে জন্মস্থান ছিল বগুড়া। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং যথাযথ আইনি ভিত্তি ছাড়া এ ধরনের পরিবর্তন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একাধিক নথিতে একই তথ্য, নাকি পরিকল্পিত উপস্থাপন?

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, চাকুরীতে যোগদানের সময় পূরণ করা ব্যক্তিগত তথ্য ফরম, পার্সোনাল ফাইল এবং পরবর্তী বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR)-এও গোপালগঞ্জকে জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি এটি কেবল অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে থাকে, তবে কীভাবে একই তথ্য ধারাবাহিকভাবে একাধিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত হলো?

আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বাংলাদেশ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধনে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা ভুয়া তথ্য প্রদান করলে—সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫,০০০ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড
প্রযোজ্য হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
বিদেশ সফরে বারবার একই চিকিৎসক কেন?

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিদেশ সফর এবং একজন ঊর্ধ্বতন দুদক কর্মকর্তার সফরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ যাত্রায় তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।তিনি যেসব সফরে অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে—১৬.০৯.২০২৩ ২৩.০১.২০২৪ ২৫.০১.২০২৪
১১.০৬.২০২৪ (সিঙ্গাপুর) — ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে।
২৫.০৯.২০২৩ (ব্যাংকক) — দুদকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে।

অতীতে ছাত্রলীগ করা ও গোপালঞ্জ বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর প্রচলিত বিধিবহির্ভূত এই সফরে শুধুমাত্র তাকেই মনোনীত করা হয়।

বিমানে একাধিক চিকিৎসক কর্মরত থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার একই ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগকারীদের মতে, এসব সফরের ফলে টিকিট, ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রধান চিকিৎসকের মনোনয়ন নিয়েও প্রশ্ন:

উক্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ১৮ আগস্ট ২০২৩, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ও ০৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিঃ তারিখে VVIP ফ্লাইটে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) ও নিরাপত্তা বিভাগে প্রেরিত কাগজপত্রসমূহ বিমানের প্রধান চিকিৎসক দ্বারা যাচাইপূর্বক সাক্ষরিত ছিল।এছাড়া তার প্রতি বছর জমাকৃত ACR প্রধান চিকিৎসক কর্তৃক সাক্ষরিত ছিল।

এমতাবস্থায়, উক্ত অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বিমানের প্রধান চিকিৎসক এর নজর এড়িয়ে কিভাবে যাচাই-সাক্ষর সম্পন্ন হলো, তা প্রশাসনের নিকট রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

নিরাপত্তা ভেটিংয়ে ভিন্ন পরিচয়?
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিরাপত্তা সংক্রান্ত নথিতে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন।

সূত্রের দাবি, ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা ভেটিংয়ের জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) ও অন্যান্য সংস্থায় প্রেরিত নথিপত্র পর্যালোচনার সময় জন্মস্থান সংক্রান্ত অসঙ্গতি সামনে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে গোপালগঞ্জ পরিচয় ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় আবার বগুড়ার পরিচয় উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

ফরেন পোস্টিং ভাইভা বোর্ডে পক্ষপাতের অভিযোগ

ডা. আব্দুর রহমান ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিমানে যোগদান করেন। এরপর থেকে যতগুলো ফরেন পোস্টিং সংক্রান্ত ভাইভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই তিনি মেডিকেল বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি সেখানে সিনিয়র ও জুনিয়র মিলিয়ে আরও তিনজন চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এতে বোর্ড গঠনের নিরপেক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সরকার পতনের সময় অননুমোদিত অনুপস্থিতি
সূত্র মতে—সরকার পতনের আগে ১ তারিখ তিনি গোপালগঞ্জে যান

পতনের পর ৭ তারিখ পর্যন্ত তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন
এই সময়ের জন্য কোনো অনুমোদিত ছুটি নেননি
৮ তারিখ স্বল্প সময়ের জন্য অফিসে এসে পুনরায় চলে যান
পরে প্রধান চিকিৎসকের সহায়তায় অনুপস্থিতিকে ছুটি হিসেবে সমন্বয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলে থাকা ব্যক্তিকে সিক লিভ দেওয়ার অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—
ফার্স্ট অফিসার অনিন্দ রেজার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তিনি জেলে থাকা অবস্থায় বিমানের চাকরিতে অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ সেই সময়কে অসুস্থতাজনিত ছুটি (Sick Leave) হিসেবে দেখিয়ে ডা. আব্দুর রহমান সিক লিভ অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলে থাকা অবস্থায় কোনো কর্মচারীর সিক লিভ পাওয়ার সুযোগ নেই। এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের শামিল।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, এরপরও পুনঃতদন্ত কেন?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ২০২৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এবং ১৩ জুন ২০২৫ তারিখের ভিভিআইপি ফ্লাইট-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার পর বিমানের নিরাপত্তা বিভাগ এবং পরবর্তীতে তদন্ত বিভাগ অভিযোগগুলোর বিষয়ে নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ প্রদান করে।
এর ভিত্তিতে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. আব্দুর রহমানকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন এবং চাকুরীচ্যুতির শাস্তি কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় নতুন বিতর্ক।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে বিভিন্ন মহলের তদবির ও প্রভাবের কারণে বিষয়টি পুনঃতদন্তে পাঠানো হয়। প্রশ্ন উঠেছে—যদি অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিদ্যমান থাকে, তাহলে পুনঃতদন্তের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?
চাকুরীচ্যুতি থেকে তিন ইনক্রিমেন্ট কর্তন সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ৪ জুন ২০২৬ তারিখে বর্তমান এমডি ও সিইও স্বাক্ষরিত এক আদেশে ডা. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে চাকুরীচ্যুতির পরিবর্তে তিনটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কর্তনের শাস্তি আরোপ করা হয়।
এ সিদ্ধান্তের পর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যে অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে চাকুরীচ্যুতির মতো সর্বোচ্চ প্রশাসনিক শাস্তির আলোচনা হয়েছিল, সেগুলোর পরিণতি কীভাবে তুলনামূলক লঘু শাস্তিতে সীমাবদ্ধ হলো?
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
বিমানের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তদন্তের ফলাফল, পুনঃতদন্তের যৌক্তিকতা এবং শাস্তি কমানোর কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।

তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে একই ধরনের অভিযোগে সবার জন্য সমান মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহল পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়ন এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।