‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আ. লীগের পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয়েছে’:ডিএমপি কমিশনার
- আপডেট: ০১:০৩:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
- / ১৮০০৮
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত করে বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করার পরিকল্পনা করেছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন,তাদের এই পরিকল্পনা নস্মাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসাইনী দালান ইমামবাড়া আয়োজিত ‘পবিত্র আশুরা উদযাপন ও তাজিয়া শোক মিছিল উপলক্ষে,ডিএমপি আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব বলেন তিনি।
মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, আজকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার গোয়েন্দা রিপোর্ট আমাদের কাছে ছিল। সেই অনুযায়ী আমরা গত তিনদিন থেকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ঢাকার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট জোরদার করেছি, পিকেট, মোবাইল পেট্রোল, ফুট পেট্রোলের সংখ্যা বাড়িয়েছি। সাদা পোশাকে ডিউটি ও টহল বাড়িয়েছি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কর্মী বা সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় জড় হয়ে মিছিল বা জমায়েতের সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় রেখে আমরা প্রত্যেকটি সন্দেহজনক জায়গা, যেমন- মেস, হোটেল এবং বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি করেছি এবং আমরা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছি। আমাদের মনে হয়েছে, তারা আজকে মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার মাধ্যম সরকারকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে চায়। ডিএমপির সদস্যরা তাদের এই পরিকল্পনাকে এখন পর্যন্ত নস্মাৎ করে দিয়েছে এবং আশা করি, আর যতটুকু য় আছে, এই সময়ের মধ্যেও তারা কোথাও মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হতে পারবে না।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে আমরা সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং আমরা সেই মিছিল থেকে ও মিছিল পরবর্তী সময় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি। ককটেল বিস্ফোরণ থেকে একটি বিষয় আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে যে, যেকোন ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা তাদের কাছে থাকতে পারে। আমাদের এটা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। তবে যেহেতু তারা মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণ করেছে, তাতে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত যে সুযোগ পেলে তারা নাশকতা করতে পারে। তাই ঢাকার বাইরে থেকে যাতে কেউ ঢাকা শহরে প্রবেশ করে এই ধরনের নাশকতা বা কোন ধরনের মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হতে না পারে এজন্য আমাদের নজরদারী অব্যাহত থাকবে।
৫ আগস্ট কারাগার থেকে অনেক অপরাধী পালিয়ে গেছে। আশুরা ও তাজিয়া মিছিলে নাশকতার শঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এই বছর এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোন আলামত আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। কোন যেকোন ধরনের নাশকতা, যে কোন ধরনের পরিকল্পনা নস্মাৎ করে দেওয়ার জন্য আমাদের সব সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।
এসময় আশুরা ও তাজিয়া মিছিল উপলক্ষে ডিএমপির গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন শোক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
ডিএমপি কমিশনার জানান, এবারের পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বিভাগ (লালবাগ, ওয়ারী, রমনা, তেজগাঁও, মতিঝিল ও মিরপুর) থেকে মোট ২৮টি ইমামবাড়া কর্তৃক ১ থেকে ৭ মহররম পর্যন্ত মোট ৬৩ টি তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি তাজিয়া মিছিলের রুট নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি তাজিয়া মিছিল ও প্রধান প্রধান সমাবেশস্থলকে কেন্দ্র করে আমরা ব্যারিকেড (Barricade), পিকেট (Picket), লাইনিং (Lining) এবং রুফটপ (Rooftop) বা ছাদ-নজরদারি ডিউটি মোতায়েন রয়েছে। হোসাইনী দালান ইমামবাড়াসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ইমামবাড়া ও সমাবেশস্থলগুলোকে ড্রোন ক্যামেরা ও সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে । যেকোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB), র্যা ব (RAB) এবং সিটিটিসি (CTTC)-এর ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্বারা প্রতিটি ভেন্যু ও রুট সুইপিং (Sweeping) বা তল্লাশি করা হবে । ইমামবাড়া বা সমাবেশস্থলগুলোতে আর্চওয়ে (Archway) গেট এবং মেটাল ডিটেক্টরের (Metal Detector) মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল তল্লাশি এবং ম্যানুয়াল চেকিং নিশ্চিত করা হবে । হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায় একটি অস্থায়ী সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। হোসাইনী দালান ইমামবাড়া, আঞ্জুমান হায়দারী, বড়কাটারা ইমামবাড়া, শিয়া মসজিদ, বিবিকা রওজা এবং মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানসমূহকে পুলিশের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে । গুরুত্বপূর্ণ ইমামবাড়াগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সোয়াট (SWAT), বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড (K9), ক্রাইম সিন টিম এবং ডিবিসহ অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটসমূহ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।
তাজিয়া মিছিলের বিশেষ রুট ও ট্রাফিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী ২৬ জুন সকাল ১০টায় হোসাইনী দালান ইমামবাড়ার উত্তর গেট , হোসাইনী দালান মোড় , বকশীবাজার লেন , আলিয়া মাদ্রাসা মোড় , বকশীবাজার (কলপাড়) মোড় , উমেশ দত্ত রোড , উর্দু রোড মোড় , হরনাথ ঘোষ রোড , লালবাগ চৌরাস্তা মোড় , গৌর-এ-শহীদ মাজার মোড় , এতিমখানা মোড় , আজিমপুর চৌরাস্তা মোড় , ইডেন মহিলা কলেজ , নীলক্ষেত মোড় , মিরপুর রোড , ঢাকা কলেজ , সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় , ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২নং রোড , বিজিবি ৪নং গেট , সাত মসজিদ রোড (জিগাতলা) হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্য ধানমন্ডি লেক (কারবালা)-এ গিয়ে মিলিত হবে। এই রুটগুলোতে সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে। মিছিল চলাকালীন তীব্র যানজট এড়াতে নগরবাসীকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেন তিনি।
তাজিয়া মিছিলের দীর্ঘ পথ ও জমায়েতের কথা বিবেচনা করে আপদকালীন সময়ে ফায়ার ফাইটার বা ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হবে। পাশাপাশি, ধানমন্ডি লেক কারবালা সংলগ্ন জলাশয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দক্ষ ডুবুরি দল মোতায়েন থাকবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার।
আয়োজক কমিটির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, প্রতিটি আয়োজক কমিটিকে তাদের নিজস্ব পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (আইডি কার্ড বা নির্দিষ্ট পোশাকসহ) মিছিলে ও ইমামবাড়ায় মোতায়েন রাখতে হবে, যারা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে শৃঙ্খলা বজায় রাখবে । পাইক মিছিল সংক্রান্তে বিদ্যমান সকল নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। কোনো প্রকার ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা, ব্যাগ, পোটলা বা সুটকেস নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া আগত ব্যক্তিদের ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা, কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট বা বক্সসহ প্রবেশে বাধা প্রদান করতে হবে। উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা পিএ সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো প্রকার ঢাক-ঢোল বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আতশবাজি বা যেকোনো ধরনের পটকা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
২৬ জুন সকাল ১০টা থেকে তাজিয়া মিছিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত রুটগুলোতে ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে। তীব্র যানজট এড়াতে ও মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা মহানগরীর চালক ও সাধারণ জনগণকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করার জন্য যানবাহন চালকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
অনলাইন গুজব প্রতিরোধে বিশেষ বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা সাইবার পেট্রোলিং এবং সোস্যাল মিডিয়া মনিটরিংকার্যক্রম চলমান থাকবে। কোনো ইমামবাড়া বা মিছিলের রুটে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ব্যাগ পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তব্যরত পুলিশ কিংবা ডিএমপির ট্রাফিক কন্ট্রোলরুম– ০১৭১১০০০৯৯০, ০১৭১১০০০৯৯১, পুলিশ কন্ট্রোলরুম-০১৩২০০৩৭৮৪৫, ০১৩২০০৩৭৮৪৬ ও জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানান ডিএমপি কমিশনার।



















