উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক ও মেম্বার আশরাফ সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি গণপূর্ত অধিদপ্তর
- আপডেট: ০৭:০২:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮০০৪
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির শেকড় কতখানি গভীর, তা প্রকাশ পাচ্ছে এর প্রধান কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারীদের অসাধু কর্মকাণ্ড ও সমন্বিত সিন্ডিকেটের নানা খতিয়ানে। জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক, মেম্বার (সদস্য) আশরাফ হোসেন যুগ্ম সচিব, অফিস সহায়ক (ডিসপার্স) সোহেল এবং সহকারী হিসাব রক্ষক ইমরানের বিরুদ্ধে একচ্ছত্র অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাটের বিস্তর অভিযোগ উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সিন্ডিকেটের অশুভ চক্রে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ক্রমাগত হয়রানি ও অনিয়মের শিকার হচ্ছেন। এই দুর্নীতির জাল এতটাই বিস্তৃত যে শীর্ষ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেনের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক, সোহেল ও ইমরানের সমন্বয়ে একটি শক্ত বলয় গড়ে উঠেছে, যা পুরো কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে ঘিরে স্বায়ত্তশাসিত অসাধু সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
এই চক্রের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত সদস্য আশরাফ হোসেনের অনিয়মের ইতিহাস বেশ পুরোনো ও চাঞ্চল্যকর। সরকারি চালচিত্র ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আগেও কোতোয়ালির সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড থাকাকালীন আশরাফ হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান নিজেই সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর ঘুষ ও দুর্নীতির সরাসরি প্রমাণ পান এবং এর ভিত্তিতে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে চিহ্নিত এই ঘুষখোর আশরাফ হোসেনের ক্ষমতার পেছনে বড় ভিত্তি ছিল তাঁর পারিবারিক যোগাযোগ। তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব শাহ কামালের ভাতিজি জামাই। মামা-শ্বশুরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার পরও আশরাফ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার এমন অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তিনি জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদে নিজের অবস্থান তৈরি করেন এবং পূর্বের অভিজ্ঞতায় অর্জিত ঘুষ বাণিজ্যের অপকৌশলগুলো এখানেও প্রয়োগ করতে শুরু করেন।
উল্লেখ্য, আশরাফের পেছনে থাকা সেই সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব শাহ কামাল নিজেই সম্প্রতি বড় ধরনের দুর্নীতি ও অর্থপাচার মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে শাহ কামালের বাসায় অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নজিরবিহীনভাবে ৩ কোটি ১ লাখ নগদ টাকা এবং আনুমানিক ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করে, যার মধ্যে ছিল মার্কিন ডলার, রিয়াল, মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, সিঙ্গাপুরি ডলার, অস্ট্রেলিয়ান ডলার, কোরিয়ান ইয়ান ও চাইনিজ ইয়ান। পরবর্তীকালে মহাখালীর ডিওএইচএস থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার সময় ডিবি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালে উন্নয়ন প্রকল্প, বদলি ও কেনাকাটার নামে শাহ কামাল অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ে তোলেন। সেই শাহ কামালের ক্ষমতার জোরেই আশরাফ হোসেন একের পর এক অনিয়ম করে পার পেয়ে গেছেন এবং গৃহায়ন অধিদপ্তরে নিজের বলয় তৈরি করেছেন। জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে আশরাফ হোসেনের ছত্রচ্ছায়ায় উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক, সোহেল ও ইমরান মিলে কীভাবে দুর্নীতির বাজার বসিয়েছেন, তার অন্যতম বড় প্রমাণ মেলে ডিক্লারেশন অব হেবা/দান/হস্তান্তর/সংশোধিত হস্তান্তর/নামজারির অনুমতি প্রক্রিয়ায়। গৃহায়নের বিভিন্ন প্রকল্পের প্লট হস্তান্তরের সময় ক্রেতা ও বিক্রেতাকে অঞ্চলভিত্তিক উপস্থিতি বা হাজিরা দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী হাজিরা দিয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফাইল এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। ক্রেতা ও বিক্রেতা হাজিরা দিতে আসলেই সিন্ডিকেটের সদস্য সোহেল তাদের উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হকের কক্ষে পাঠান। সেই কক্ষেই সরাসরি ঘুষের দরদাম বা রেট নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত ঘুষের দরদামে মিল না হলে বা দাবিকৃত টাকা না দিলে উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক নিজেই ফাইল আটকে দেন এবং বছরের পর বছর গ্রাহকদের ঘোরাতে থাকেন। সহকারী হিসাব রক্ষক ইমরান ও অফিস সহায়ক সোহেল এই প্রক্রিয়ায় দালাল ও ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাদের মাধ্যমেই লেনদেনের চুক্তি হয় এবং টাকা উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক ও আশরাফের কাছে পৌঁছায়।
এছাড়াও জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন আবাসন প্রকল্প, প্লট বরাদ্দ, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, এবং সরকারি ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিটি খাতে দুর্নীতির এক বিশাল জাল বিছানো রয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা যখন আবাসন বা প্লটের নথি অনুমোদন, নামজারি কিংবা কোনো সংশোধনের জন্য এই কার্যালয়ে আসেন, তখন পদে পদে অর্থ লেনদেনের শিকার হতে হয়। উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হকের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ফাইলের ফাইল ক্যাবিনেট থেকে বের হওয়া অসম্ভব। কোনো ফাইল টেবিলে গেলেই ইমরান তা আটকে দেন আর্থিক বিনিময়ের অপেক্ষায়, আর অফিস সহায়ক সোহেল সরাসরি সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে রফা করে এবং কত টাকা ঘুষ দিতে হবে তার চুক্তি করে। নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ পৌঁছানোর পর কেবল ফাইল উপপরিচালক-১ এর টেবিলে সইয়ের জন্য উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ঘুষের সিস্টেমে না দিলে ফাইল আটকে রাখা, অনাকাঙ্ক্ষিত অডিট আপত্তি তোলা এবং বছরের পর বছর গ্রাহকদের ঘোরানোর মতো হেনস্তা করা হয়।
ভবন সংস্কার, মোটরযানের জ্বালানি খাত, অফিসের আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং মোটর মেরামত কাজের ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে অসাধু উপায়ে সরকারি তহবিল তছরুপের প্রক্রিয়ায়ও ইমরান ও সোহেলের জোরালো ভূমিকা রয়েছে। ছোট ছোট কাজকে বড় বাজেট দেখিয়ে এবং দরপত্রের নিয়মকানুন শিথিল করে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। বদলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেওয়া হয়, যা সুনির্দিষ্ট ভাগে উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক, আশরাফ এবং তাদের সহযোগীদের মধ্যে বণ্টন হয়। ভুয়া প্রকল্প ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের বিল পাস করিয়ে প্রতি মাসেই লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে, যা জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্বিক কর্ম পরিবেশকে চরমভাবে কলঙ্কিত করেছে। অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক-১ মাহবুবুল হক ও মেম্বার আশরাফ হোসেনকে বারবার ফোন করে জানতে চাইলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি বিধায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
পরিশেষে, একজন সাজাপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত সাবেক বিতর্কিত কর্মকর্তা কিভাবে পুনরায় এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসে আসীন হয় এবং তৎকালীন সচিব শাহ কামালের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন দুর্নীতি চালিয়ে যেতে পারে, তা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে। মাহবুবুল হক, আশরাফ হোসেন, সোহেল এবং ইমরানের এই অসাধু চক্রটির অপকর্ম দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই চক্রটির অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, হাজিরাসহ সকল খাতের ভুয়া বিলের অডিট এবং অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ সেবাগ্রহীতারা হয়রানি থেকে মুক্তি পান এবং সরকারি সম্পদ লুটপাট বন্ধ হয়।



















