সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রতিবাদে খুলনায় মানববন্ধন- প্রকল্প বাতিলের দাবি
- আপডেট: ০৬:২০:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮০১৪
পরিবেশ বিপর্যয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকা সংকটের আশঙ্কা; জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান।
বিশেষ প্রতিনিধি, খুলনাঃ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে খুলনায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে ‘আমরাই আগামী’, ‘ক্লাইমেট কানেক্টস’, ‘রিগ্লোবাল’, ‘প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম, খুলনা’, ‘ক্লিন’ এবং ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডেট’ (বিডাব্লিউজিইডি)-সহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এ বনাঞ্চল অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। এমন একটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল, অবকাঠামো স্থাপন এবং অন্যান্য কার্যক্রম সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এতে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের আয় ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁরা বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ মাছ ধরা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পরিবেশগত ক্ষতির কারণে এসব মানুষের কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এলএনজি আমদানিতে অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা
মানববন্ধনে দেশের জ্বালানি খাতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, এলএনজি আমদানিনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের ওঠানামা, টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বক্তাদের মতে, দেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, প্রকৃত চাহিদা এবং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাঁরা বলেন, জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশগত ক্ষতি এবং সম্ভাব্য আর্থিক দায় বিবেচনায় না নিয়ে কোনো বৃহৎ জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়।
জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের দাবি
মানববন্ধনে বক্তারা নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তাঁরা বলেন, দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, উপযুক্ত স্থানে সোলার পার্ক নির্মাণ এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব।
এলএনজি আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিবর্তে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে বক্তারা মত প্রকাশ করেন।
সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি
মানববন্ধন থেকে সরকারের প্রতি সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ বাতিল এবং নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা এবং জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।
বক্তারা আরও বলেন, উন্নয়নের নামে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সরকারের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।



















