নোয়াখালীতে বাজার ইজারা নিয়ে বিএনপি নেতাদের সমঝোতা বাণিজ্য! রাজস্ব বঞ্চিত সরকার
- আপডেট: ০৩:২৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬
- / ১৮০০১
নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর
নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় হাট-বাজার ইজারা নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে। সাধারণ দরপত্র ক্রেতাদের ইজারায় অংশ নিতে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সর্বোচ্চ দরদাতার ব্যাংক ড্রাফট খুলে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে কবিরহাট উপজেলার ২৭টি হাট-বাজার ইজারার জন্য গত ২৯ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুদম পুষ্প চাকমা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের আমিন বাজারের নির্ধারিত সরকারি মূল্য ছিল ৮ লাখ ৬১ হাজার ৭৭ টাকা। অথচ পূর্ববর্তী ১৪৩২ বঙ্গাব্দে বাজারটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায়।
চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে এই বাজারের জন্য ৬৪টি দরপত্র ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৬টি। জমাকৃত দরপত্রের মধ্যে আবদুল হাকিম সুজন ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, কামরুল হাসান আকাশ ৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং জলিলুর রহমান মানিক ৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা দর প্রস্তাব করেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দরপত্র ক্রেতারা অভিযোগ করেন, ফরম জমা দেওয়ার আগেই স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা সিন্ডিকেট গঠন করে সব বাজার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন। এতে সাধারণ দরদাতাদের ভয়ভীতি দেখানো, দরপত্রে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া এবং জমা দেওয়া ব্যাংক ড্রাফট ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কম মূল্যে বাজার ইজারা নিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আমিন বাজারের সর্বোচ্চ দরদাতা আবদুল হাকিম সুজন জানান, সমঝোতার নামে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুল হুদা চৌধুরী লিটন, সদস্য সচিব সৌরভ হোসেন কামাল, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য গোলাম মোমিত ফয়সাল, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জুসহ ৮ নেতা দরপত্র ক্রেতাদের ডেকে বৈঠক করেন। সেখানে আমিন বাজারের তিনজন দরদাতার মধ্যে সমন্বয়ের শর্তে অতিরিক্ত ১৫ লাখ টাকা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, নেতাদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি ব্যাংক ড্রাফটসহ দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নেতার কাছে দেন। কিন্তু দরপত্র খোলার সময় দেখা যায়, তারসহ কয়েকজনের ব্যাংক ড্রাফট অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরে জানতে পারেন, সমঝোতার অংশ হিসেবে অন্যদের ব্যাংক ড্রাফট খুলে নেন বিএনপি নেতা গোলাম মোমিত ফয়সাল।
সুজন আরও বলেন, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা যদি সমঝোতায় না যেতাম, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সরকার বেশি রাজস্ব পেত।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য গোলাম মোমিত ফয়সাল ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে পৌর বিএনপির সদস্য সচিব বেলায়েত হোসেন খোকন সমঝোতার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয়ের জন্য বাজারগুলো সমঝোতার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। দরপত্রের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থাপনার স্বার্থে।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুল হুদা চৌধুরী লিটনও সমঝোতার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, অধিকসংখ্যক দরপত্র ক্রেতাকে সমন্বয় করতে একজনের নামে বাজার নিয়ে তিনজনের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে অন্যদের ম্যানেজ করা হয়েছে। তবে ওই অর্থ তিনি গ্রহণ করেননি বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুদম পুষ্প চাকমা বলেন, দরপত্রের বাইরে কোনো অনিয়ম বা ব্যাংক ড্রাফট খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটলে তা আমাদের অফিসের বাইরে হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনেই ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সরকারি রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে।
















