১১:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬

ঢাকার ডিসি অফিসের এলএ শাখা-২ এর স্বঘোষিত ঘুষের বাদশা সার্ভেয়ার মোনারুল

  • আপডেট: ০৭:৩৪:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০৯

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

দুর্নীতি যখন প্রশাসনের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারও পরিণত হয় দুর্ভোগের গল্পে। সরকারি অফিসে সেবা পাওয়ার বদলে যদি ঘুষ, তদবির ও প্রভাবের কাছে মানুষকে জিম্মি হতে হয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজধানী ঢাকার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-২ নিয়ে সম্প্রতি এমনই নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে এলএ শাখা-২-এর সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ প্রদানে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে সার্ভেয়ার মোনারুল এলএ শাখা-২-এ একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন যেখানে তার অনুমোদন বা সম্মতি ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এগোয় না। সেবা প্রত্যাশীদের একাংশের দাবি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে গেলেও তাদের নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। আর এই হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে বাধ্য হয়ে অনেককে অবৈধ অর্থ লেনদেনের পথে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী ঢাকার বিরুলিয়া মৌজার বিআরএস রেকর্ডভুক্ত ৩০১৪, ৩০১৫ ও ৯০২ নম্বর দাগ সংশ্লিষ্ট ভূমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগে বলা হয় প্রকৃত রেকর্ডভুক্ত মালিকদের ক্ষতিপূরণের বিল প্রদান না করে সংশ্লিষ্ট আদালতের মামলার রায়ের অজুহাত দেখিয়ে বহিরাগত কিছু ব্যক্তির নামে ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড় করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায় যে আদালতের রায় তামিল না করেই মোনারুল চক্র এই ক্ষতিপূরন তড়িঘড়ি প্রদান করে দেন যেখান থেকে তিনি ৩৫%-৪০% টাকা ঘুষ অগ্রিম গ্রহন করেছে বলে অভিযোগে জানা যায়। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল যারা মোট অর্থের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ দাবি করত। এই চক্রের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতেন সার্ভেয়ার মোনারুল এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কানুনগো আতিকুল, অফিস সহকারী নাজমুল, সার্ভেয়ার শহিদুল। তাদের নেতৃত্বেই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর বিপরীতে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ বিল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রকৃত মালিকদের হাতে না গিয়ে অন্যদের কাছে পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত ভূমি মালিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও তারা কোনো প্রতিকার পাননি। বরং অভিযোগ করার কারণে আরও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অনেকের ভাষ্য এলএ শাখা-২-এ একটি অঘোষিত নিয়ম চালু রয়েছে যেখানে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। ফলে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হয়, অথচ প্রভাবশালী মহল ও অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগীরা দ্রুত সেবা পেয়ে যান।
এদিকে মোনারুলের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি তার নামে ও বেনামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া মোনারুল নিজেকে জেলা প্রশাসকের কাছের মানুষ ও ভুমি মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতন অফিসারদের নাম ভাঙ্গিয়ে এই অবৈধ কর্মকান্ড করে বেড়ান বলে নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ বণ্টন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য অনিয়মও প্রকৃত মালিকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত হওয়া জরুরি। বিশেষ করে আদালতের নির্দেশনার নামে প্রকৃত মালিকদের বঞ্চিত করে অন্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং একটি গুরুতর দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভুক্তভোগীরা সার্ভেয়ার মোনারুল, কানুনগো আতিকুল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা প্রশাসন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে।

 

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

ঢাকার ডিসি অফিসের এলএ শাখা-২ এর স্বঘোষিত ঘুষের বাদশা সার্ভেয়ার মোনারুল

আপডেট: ০৭:৩৪:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

দুর্নীতি যখন প্রশাসনের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারও পরিণত হয় দুর্ভোগের গল্পে। সরকারি অফিসে সেবা পাওয়ার বদলে যদি ঘুষ, তদবির ও প্রভাবের কাছে মানুষকে জিম্মি হতে হয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজধানী ঢাকার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-২ নিয়ে সম্প্রতি এমনই নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে এলএ শাখা-২-এর সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ প্রদানে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে সার্ভেয়ার মোনারুল এলএ শাখা-২-এ একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন যেখানে তার অনুমোদন বা সম্মতি ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এগোয় না। সেবা প্রত্যাশীদের একাংশের দাবি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে গেলেও তাদের নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। আর এই হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে বাধ্য হয়ে অনেককে অবৈধ অর্থ লেনদেনের পথে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী ঢাকার বিরুলিয়া মৌজার বিআরএস রেকর্ডভুক্ত ৩০১৪, ৩০১৫ ও ৯০২ নম্বর দাগ সংশ্লিষ্ট ভূমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগে বলা হয় প্রকৃত রেকর্ডভুক্ত মালিকদের ক্ষতিপূরণের বিল প্রদান না করে সংশ্লিষ্ট আদালতের মামলার রায়ের অজুহাত দেখিয়ে বহিরাগত কিছু ব্যক্তির নামে ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড় করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায় যে আদালতের রায় তামিল না করেই মোনারুল চক্র এই ক্ষতিপূরন তড়িঘড়ি প্রদান করে দেন যেখান থেকে তিনি ৩৫%-৪০% টাকা ঘুষ অগ্রিম গ্রহন করেছে বলে অভিযোগে জানা যায়। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল যারা মোট অর্থের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ দাবি করত। এই চক্রের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতেন সার্ভেয়ার মোনারুল এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কানুনগো আতিকুল, অফিস সহকারী নাজমুল, সার্ভেয়ার শহিদুল। তাদের নেতৃত্বেই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর বিপরীতে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ বিল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রকৃত মালিকদের হাতে না গিয়ে অন্যদের কাছে পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত ভূমি মালিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও তারা কোনো প্রতিকার পাননি। বরং অভিযোগ করার কারণে আরও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অনেকের ভাষ্য এলএ শাখা-২-এ একটি অঘোষিত নিয়ম চালু রয়েছে যেখানে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। ফলে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হয়, অথচ প্রভাবশালী মহল ও অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগীরা দ্রুত সেবা পেয়ে যান।
এদিকে মোনারুলের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি তার নামে ও বেনামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া মোনারুল নিজেকে জেলা প্রশাসকের কাছের মানুষ ও ভুমি মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতন অফিসারদের নাম ভাঙ্গিয়ে এই অবৈধ কর্মকান্ড করে বেড়ান বলে নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ বণ্টন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য অনিয়মও প্রকৃত মালিকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত হওয়া জরুরি। বিশেষ করে আদালতের নির্দেশনার নামে প্রকৃত মালিকদের বঞ্চিত করে অন্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং একটি গুরুতর দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভুক্তভোগীরা সার্ভেয়ার মোনারুল, কানুনগো আতিকুল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা প্রশাসন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে।