১০:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সার্ভেয়ার মোনারুলের দুর্নীতির সাতকাহন

  • আপডেট: ০৮:৪৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০৪

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

রাজধানীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-২ এর সার্ভেয়ার মোনারুলকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ, প্রশ্ন ও অসন্তোষ সামনে এসেছে। ক্ষতিপূরণ ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, অভিযোগকৃত ঘুষ বাণিজ্য, প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিতর্কিত ক্ষতিপূরণ বণ্টনের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এলএ শাখা-২-এর এই সার্ভেয়ার মোনারুলের নাম। ভুক্তভোগী একাধিক ভূমি মালিক ও সেবাপ্রত্যাশীর অভিযোগ এলএ শাখা-২-এর গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল কার্যত সার্ভেয়ার মোনারুলের পর্যবেক্ষণ ও মতামতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও অনেক ক্ষতিপূরণ ফাইল দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। ফলে ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশীরা বারবার অফিসে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। অভিযোগকারীরা দাবি করেন সরকারি সেবার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে যার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য সেবা পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ যেসব ভূমি মালিক মোনারুলের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেছেন তারাই ক্ষতিপূরণ বিল দ্রুত পাচ্ছেন। অন্যদিকে যারা তা করতে পারেননি তাদের ফাইল দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন ডিসি অফিসের এলএ শাখায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির সংস্কৃতি এখন অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট হিসেবে পরিচিত। অতীতেও এ ধরনের অভিযোগে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে বলিয়ারপুর মৌজার এলএ কেস নং-২০২০/২০২১-এর কয়েকটি ক্ষতিপূরণ ফাইল দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি তাদের। একইসঙ্গে বলিয়ারপুর মৌজার বিআরএস রেকর্ডভুক্ত ৩০১৪, ৩০১৫ ও ৯০২ নম্বর দাগের ক্ষতিপূরণ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি প্রকৃত মালিকদের পরিবর্তে অন্যদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি সার্ভেয়ার মোনারুল নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন মহলে উপস্থাপন করেন এবং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তার বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রচার করেন। কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেছেন, তিনি জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে থাকেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে। যার কারণে তিনি কার্যত শাখাটির অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীরের সময় থেকেই তিনি বিশেষ প্রশ্রয় পেয়ে আসছেন এবং সেই সুযোগে নিজের প্রভাব ও কর্তৃত্ব আরও বিস্তৃত করেছেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রভাবের কারণে অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ফাইল কার্যক্রমে তার মতামত ও নির্দেশনাই প্রধান হয়ে উঠেছে।
তাছাড়া বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাবের মাধ্যমে মোনারুল নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে রেখেছেন। ভুক্তভোগী ভূমি মালিকদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই প্রভাববলয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগেরও কার্যকর তদন্ত হচ্ছে না। ফলে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অভিযোগ ক্ষতিপূরণ বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা বিদ্যমান। তাদের দাবি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেককে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন ভুক্তভোগী প্রশ্ন তুলেছেন, আর কত শতাংশ কমিশন বা অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষতিপূরণ বিতরণে অনিয়ম এবং সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির অভিযোগ এনে একাধিক ভুক্তভোগী ভূমি মালিক ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে দাবি করেছেন। অভিযোগকারীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে এবং দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভুক্তভোগীদের মতে এলএ শাখায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা না হলে সাধারণ মানুষ ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, মোনারুলের নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি আমিনবাজার, সাভার, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখযোগ্য সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীরা মনে করেন এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। গত ২ জুন ও ৩ জুন ২০২৬ ইং তারিখে দৈনিক সোনালী খবর পত্রিকায় দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে ২ টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর পত্রিকার কার্যালয়ে বিভিন্ন ভুক্তোভোগী ভুমি মালিকগণ মোনারুলের দুর্নীতির তথ্য লিখিত অভিযোগ পাঠাতে শুরু করেছেন। অভিযোগপত্রগুলোতে এলএ শাখার কার্যক্রম, ক্ষতিপূরণ ফাইলের জটিলতা, হয়রানি এবং সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীদের তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলএ শাখার সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কানুনগো আতিকুল এবং সার্ভেয়ার শহিদুলসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা। তাদের মতে অতীতের ক্ষতিপূরণ বিতরণ, ফাইল নিষ্পত্তির সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী সার্ভেয়ার মোনারুলের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেন, অতীতে তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ঢাকা ডিসি অফিসে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পর্কের কারণে প্রশাসনিক অঙ্গনে তিনি সুবিধা পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য এলএ শাখা-২ বর্তমানে এমন একটি পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে সাধারণ আবেদনকারীরা নিজেদের অসহায় মনে করেন। ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তারা মনে করেন পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হলে আবেদনকারীরা অনলাইনে নিজেদের ফাইলের অবস্থা জানতে পারবেন এবং হয়রানি কমবে। দৈনিক সোনালী খবরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর একাধিক ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে, ভুমি মন্ত্রনালয়ে ও ভুমি সংস্কার বোর্ডে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তারা আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে। তাদের মতে, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিতরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি খাত। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জমি হারানো মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থই অনেক সময় নতুনভাবে জীবন গঠনের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষক ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা বলছেন ফাইল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ সংরক্ষণ, অনলাইন মনিটরিং এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তিদের দাবি বিতর্কিত ক্ষতিপূরণ ফাইলগুলো পুনরায় যাচাই করা হোক, প্রকৃত মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হোক এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মতে এলএ শাখা-২ ঘিরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করবে। দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের দুর্নীতি নিয়ে আজ প্রকাশ হলো ৩য় পর্ব। পরবর্তী পর্বে তার অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত প্রকাশিত হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

সার্ভেয়ার মোনারুলের দুর্নীতির সাতকাহন

আপডেট: ০৮:৪৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

রাজধানীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-২ এর সার্ভেয়ার মোনারুলকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ, প্রশ্ন ও অসন্তোষ সামনে এসেছে। ক্ষতিপূরণ ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, অভিযোগকৃত ঘুষ বাণিজ্য, প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিতর্কিত ক্ষতিপূরণ বণ্টনের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এলএ শাখা-২-এর এই সার্ভেয়ার মোনারুলের নাম। ভুক্তভোগী একাধিক ভূমি মালিক ও সেবাপ্রত্যাশীর অভিযোগ এলএ শাখা-২-এর গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল কার্যত সার্ভেয়ার মোনারুলের পর্যবেক্ষণ ও মতামতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও অনেক ক্ষতিপূরণ ফাইল দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। ফলে ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশীরা বারবার অফিসে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। অভিযোগকারীরা দাবি করেন সরকারি সেবার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে যার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য সেবা পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ যেসব ভূমি মালিক মোনারুলের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেছেন তারাই ক্ষতিপূরণ বিল দ্রুত পাচ্ছেন। অন্যদিকে যারা তা করতে পারেননি তাদের ফাইল দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন ডিসি অফিসের এলএ শাখায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির সংস্কৃতি এখন অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট হিসেবে পরিচিত। অতীতেও এ ধরনের অভিযোগে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে বলিয়ারপুর মৌজার এলএ কেস নং-২০২০/২০২১-এর কয়েকটি ক্ষতিপূরণ ফাইল দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি তাদের। একইসঙ্গে বলিয়ারপুর মৌজার বিআরএস রেকর্ডভুক্ত ৩০১৪, ৩০১৫ ও ৯০২ নম্বর দাগের ক্ষতিপূরণ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি প্রকৃত মালিকদের পরিবর্তে অন্যদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি সার্ভেয়ার মোনারুল নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন মহলে উপস্থাপন করেন এবং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তার বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রচার করেন। কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেছেন, তিনি জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে থাকেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে। যার কারণে তিনি কার্যত শাখাটির অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীরের সময় থেকেই তিনি বিশেষ প্রশ্রয় পেয়ে আসছেন এবং সেই সুযোগে নিজের প্রভাব ও কর্তৃত্ব আরও বিস্তৃত করেছেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রভাবের কারণে অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ফাইল কার্যক্রমে তার মতামত ও নির্দেশনাই প্রধান হয়ে উঠেছে।
তাছাড়া বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাবের মাধ্যমে মোনারুল নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে রেখেছেন। ভুক্তভোগী ভূমি মালিকদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই প্রভাববলয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগেরও কার্যকর তদন্ত হচ্ছে না। ফলে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অভিযোগ ক্ষতিপূরণ বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা বিদ্যমান। তাদের দাবি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেককে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন ভুক্তভোগী প্রশ্ন তুলেছেন, আর কত শতাংশ কমিশন বা অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষতিপূরণ বিতরণে অনিয়ম এবং সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির অভিযোগ এনে একাধিক ভুক্তভোগী ভূমি মালিক ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে দাবি করেছেন। অভিযোগকারীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে এবং দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভুক্তভোগীদের মতে এলএ শাখায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা না হলে সাধারণ মানুষ ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, মোনারুলের নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি আমিনবাজার, সাভার, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখযোগ্য সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীরা মনে করেন এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। গত ২ জুন ও ৩ জুন ২০২৬ ইং তারিখে দৈনিক সোনালী খবর পত্রিকায় দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে ২ টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর পত্রিকার কার্যালয়ে বিভিন্ন ভুক্তোভোগী ভুমি মালিকগণ মোনারুলের দুর্নীতির তথ্য লিখিত অভিযোগ পাঠাতে শুরু করেছেন। অভিযোগপত্রগুলোতে এলএ শাখার কার্যক্রম, ক্ষতিপূরণ ফাইলের জটিলতা, হয়রানি এবং সার্ভেয়ার মোনারুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীদের তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলএ শাখার সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কানুনগো আতিকুল এবং সার্ভেয়ার শহিদুলসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা। তাদের মতে অতীতের ক্ষতিপূরণ বিতরণ, ফাইল নিষ্পত্তির সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী সার্ভেয়ার মোনারুলের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেন, অতীতে তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ঢাকা ডিসি অফিসে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পর্কের কারণে প্রশাসনিক অঙ্গনে তিনি সুবিধা পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য এলএ শাখা-২ বর্তমানে এমন একটি পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে সাধারণ আবেদনকারীরা নিজেদের অসহায় মনে করেন। ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তারা মনে করেন পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হলে আবেদনকারীরা অনলাইনে নিজেদের ফাইলের অবস্থা জানতে পারবেন এবং হয়রানি কমবে। দৈনিক সোনালী খবরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর একাধিক ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে, ভুমি মন্ত্রনালয়ে ও ভুমি সংস্কার বোর্ডে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তারা আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে। তাদের মতে, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিতরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি খাত। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জমি হারানো মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থই অনেক সময় নতুনভাবে জীবন গঠনের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষক ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা বলছেন ফাইল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ সংরক্ষণ, অনলাইন মনিটরিং এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তিদের দাবি বিতর্কিত ক্ষতিপূরণ ফাইলগুলো পুনরায় যাচাই করা হোক, প্রকৃত মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হোক এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মতে এলএ শাখা-২ ঘিরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করবে। দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মোনারুলের দুর্নীতি নিয়ে আজ প্রকাশ হলো ৩য় পর্ব। পরবর্তী পর্বে তার অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত প্রকাশিত হবে।