০৯:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬

শাহজালাল কার্গো অগ্নিকাণ্ড: নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

  • আপডেট: ০৮:১২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে একই সঙ্গে বারবার একই ধরনের ঘটনায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে কি না,সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

রবিবার (৭ জুন) বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ, ডিএইচএল এক্সপ্রেস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়ারুল হক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রাথমিক তদন্তে যা পাওয়া গেছে

বৈঠকে তদন্ত কমিটি জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত এখনো চলমান থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।

কমিটির সদস্যরা জানান, ঘটনাস্থল থেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজে আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই ব্যক্তির আচরণে তাৎক্ষণিক আতঙ্কের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির ভাষ্য, সব আলামত ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তুলে ধরা হবে।

বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি শর্ট সার্কিটই কারণ হয়, তাহলে তা বারবার কেন ঘটছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনেও শর্ট সার্কিটের কথা উল্লেখ ছিল। ফলে কোথাও না কোথাও গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

কার্গো ব্যবস্থাপনার নানা সংকট তুলে ধরলেন ব্যবসায়ীরা

বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা কার্গো ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তাঁদের অভিযোগ, কার্গো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা অপ্রতুল। আধুনিক গুদাম সুবিধা, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের জন্য পৃথক নিরাপদ সংরক্ষণ জোন, পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো এবং জরুরি প্রবেশপথের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া লোডিং-আনলোডিং সরঞ্জামের সংকট ও পণ্যজটের কারণে অনেক সময় কার্গো দীর্ঘ সময় গুদামে পড়ে থাকে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

তাঁদের মতে, শুধু আগুনের তাৎক্ষণিক কারণ শনাক্ত করলেই হবে না; পুরো কার্গো ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বৈঠকে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী উল্লেখ করেন, অতীতের কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও শর্ট সার্কিটের বিষয়টি সামনে এসেছিল। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা বলেন, বর্তমান পর্যবেক্ষণ কেবল প্রাথমিক। আগুনের প্রকৃত কারণ, দায়-দায়িত্ব এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ছিল কি না, তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও থাকবে।

গত শুক্রবার রাত ১১টা ২৫ মিনিটে বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের ৯ নম্বর গেটসংলগ্ন একটি কুরিয়ার কনটেইনারে আগুন লাগে। বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনার পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে বৈঠকে জানানো হয়েছে, এ ঘটনায় আগামীকাল সোমবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

শাহজালাল কার্গো অগ্নিকাণ্ড: নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

আপডেট: ০৮:১২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে একই সঙ্গে বারবার একই ধরনের ঘটনায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে কি না,সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

রবিবার (৭ জুন) বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ, ডিএইচএল এক্সপ্রেস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়ারুল হক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রাথমিক তদন্তে যা পাওয়া গেছে

বৈঠকে তদন্ত কমিটি জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত এখনো চলমান থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।

কমিটির সদস্যরা জানান, ঘটনাস্থল থেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজে আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই ব্যক্তির আচরণে তাৎক্ষণিক আতঙ্কের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির ভাষ্য, সব আলামত ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তুলে ধরা হবে।

বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি শর্ট সার্কিটই কারণ হয়, তাহলে তা বারবার কেন ঘটছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনেও শর্ট সার্কিটের কথা উল্লেখ ছিল। ফলে কোথাও না কোথাও গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

কার্গো ব্যবস্থাপনার নানা সংকট তুলে ধরলেন ব্যবসায়ীরা

বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা কার্গো ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তাঁদের অভিযোগ, কার্গো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা অপ্রতুল। আধুনিক গুদাম সুবিধা, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের জন্য পৃথক নিরাপদ সংরক্ষণ জোন, পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো এবং জরুরি প্রবেশপথের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া লোডিং-আনলোডিং সরঞ্জামের সংকট ও পণ্যজটের কারণে অনেক সময় কার্গো দীর্ঘ সময় গুদামে পড়ে থাকে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

তাঁদের মতে, শুধু আগুনের তাৎক্ষণিক কারণ শনাক্ত করলেই হবে না; পুরো কার্গো ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বৈঠকে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী উল্লেখ করেন, অতীতের কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও শর্ট সার্কিটের বিষয়টি সামনে এসেছিল। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা বলেন, বর্তমান পর্যবেক্ষণ কেবল প্রাথমিক। আগুনের প্রকৃত কারণ, দায়-দায়িত্ব এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ছিল কি না, তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও থাকবে।

গত শুক্রবার রাত ১১টা ২৫ মিনিটে বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের ৯ নম্বর গেটসংলগ্ন একটি কুরিয়ার কনটেইনারে আগুন লাগে। বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনার পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে বৈঠকে জানানো হয়েছে, এ ঘটনায় আগামীকাল সোমবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে।