০৯:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

পুলিশ প্রশাসনে অবসর আতঙ্ক, আলোচনায় ১৭৪ কর্মকর্তার নাম

  • আপডেট: ০৯:২৫:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০১

মো. দীন ইসলাম,ঢাকা

নির্ধারিত সময়ের আগেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তে পুলিশ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন,এ পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য সামনে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে পুরো পুলিশ প্রশাসনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

তৈরি হয়েছে তালিকা। সব মিলিয়ে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পর্যায়ে অন্তত ১৭৪ জন রয়েছেন অবসরের তালিকায়।

এতে রয়েছেন ১৫, ১৭, ১৮ ও ২০ ব্যাচের কর্মকর্তা, যাদের সংখ্যা প্রায় ৫৭ জন। এরই মধ্যে শুধু ২০ ব্যাচেরই রয়েছেন ৫৩। এ ছাড়াও রয়েছেন ওই আমলের বিতর্কিত ওসিদের নামও যাদের অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদায় বিভিন্ন স্থানে কর্মরত। এক কথায় বয়স ২৫ বছর হলেই বিতর্কিতরা আর চাকরিতে থাকছেন না স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

সূত্র মতে, ওই তালিকায় রয়েছেন ২০ ব্যাচের, মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, শাহ মিজান শাফিউর রহমান, মোহাম্মদ মিরাজ উদ্দিন আহমেদ, সঞ্জিত কুমার রায়, জাকির হোসেন খান, সাইদুর রহমান, সুব্রত কুমার হালদার, নূরে আলম মিনা, শাহ আবীদ হোসেন, আলমগীর কবির, মো. ইলিয়াস শরিফ, জিহাদুল কবির, আনোয়ার হোসেন খান, রাশিদুল হাসান, সাইফুল্লাহ আল মামুন, এটিএম মোজাহিদুল ইসলাম, শেখ রফিকুল ইসলাম, টুটল চক্রবর্তী, মাইনুল হক, মাহাবুবুর রহমান খান, মোহাম্মদ রেজোয়ান, সাইফুল ইসলাম, মো. মনিরুজ্জামান, বরকতউল্লাহ খান, মেহেদেুল করিম, মো. মনিরুজ্জামান (২), গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহম্মেদ, জামিল হাসান ও হামিদুল আলমসহ আরও অনেকে। এ ছাড়াও আবাসন কোম্পানির ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৫ ব্যাচের রানিং দুই অতিরিক্ত আইজিপিও রয়েছেন অবসরের তালিকায়। পাশাপাশি ১৭ ও ১৮ ব্যাচের আরও দুইজন রয়েছে ওই তালিকায়। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মুখ না খুললেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

একইভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অন্তত ১১৭ জন ওসিকেও বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদায় চাকরি করছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। ওইসব কর্মকর্তার অনেকের বয়স এখন ২৫ বছর পার হয়েছে। এ কারণে তাদেরও অবসর দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধেও সরকারবিরোধী গোপন তৎপরতার অভিযোগ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।

এদিকে পুলিশের ভেতরে একযোগে এত সংখ্যক সদস্যকে অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখছেন না অনেকে। তাদের দাবি, ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশেই তারা কাজ করেছেন। তখন যদি নির্দেশ মানা না হতো তাহলে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ওই সময়ও তাদের শাস্তির আওতায় আনা হতো। এ কারণে চাকরি বাঁচানোর জন্যই তারা সরকারের নির্দেশ মেনে কাজ করেছেন। তাছাড়া অনেক মেধাবী কর্মকর্তাও রয়েছেন তালিকায়। যারা যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হয়েছিলেন বিভিন্ন সেক্টরে। তারাও রয়েছেন ওই তালিকায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, বাধ্যতামূলক অবসর চাকরিবিধিতেই আছে। যখন চাকরিবিধিতে থাকে, তখন সেটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ কম। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক কিংবা কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধের ধরন বা সময়কাল যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তিনি বলেন, “অভিযোগের ধরন ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ যদি স্পষ্ট থাকে, তাহলে এ বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। অভিযোগের ধরন ও সম্পৃক্ততার প্রশ্নে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

তৌহিদুল হক আরও বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেই আবার আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চাকরি ফিরে পেয়েছেন।” এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ওই প্রক্রিয়া ও অভিযোগের ধরনের মধ্যে আইনগত ব্যত্যয় ছিল। কেউ যাতে কোনো রোষানলে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ থাকলে তার কৃতকর্মের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারেÑ এটা বিধানেই রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিগত রোষানলের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যায়ভাবে, জোরপূর্বকভাবে যেন কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরসহ কোনো ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়। গত ১৫ বছরে দেখা গেছে, বিরোধী মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে অনেকেই পদোন্নতি থেকে শুরু করে নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এই সংস্কৃতি কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না।”

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ডিআইজি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও দপ্তরে দায়িত্বরত ও সংযুক্ত ছিলেন।
জানা গেছে, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ও সংযুক্ত থাকা অবস্থায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা ‘সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক’, ‘তথ্য ফাঁস’ ও ‘রাজনৈতিক তৎপরতা’ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে। এ ধরনের তথ্য হাতে পাওয়ার পর কঠোর অবস্থানে গেছে সরকার। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা এখন আতঙ্কে আছেন।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর দিয়ে থাকে সরকার। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার ওই কর্মচারীকে ‘জনস্বার্থে’ যেকোনো সময় অবসরে পাঠাতে পারে। এ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী গত দেড় বছরে বেশকিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। আরও একাধিক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনেকে অতিউৎসাহী হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। এমনকি সরকারবিরোধী আন্দোলের সময় তারা বেপরোয়া হয়ে নিরীহ জনগণের ওপর হামলা ও গুলি চালান। পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও খুনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব অপকর্মের কারণে সরকার পতনের পর অনেকে পালিয়ে যান। আবার অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাসপেন্ড হন। কাউকে সংযুক্ত করে রাখা হয়। সে অবস্থায় থেকেও তারা বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সরকার পতনের পর অনেকের নামে খুনের মামলাও তদন্ত চলছে। সেখানে কারও নামে চার্জশিট হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “পুলিশের বর্তমান পরিস্থিতি আসলে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফল যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়েও এই প্রবণতা ছিল। তবে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে তা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে। ফলে এখন নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারাচ্ছেন। কারও ক্ষেত্রে তা ন্যায্য, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্যায়ও হতে পারে। তাই সরকারকে সতর্ক হতে হবে যাতে ‘অতিউৎসাহী’ পদক্ষেপে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

পুলিশ প্রশাসনে অবসর আতঙ্ক, আলোচনায় ১৭৪ কর্মকর্তার নাম

আপডেট: ০৯:২৫:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মো. দীন ইসলাম,ঢাকা

নির্ধারিত সময়ের আগেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তে পুলিশ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন,এ পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য সামনে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে পুরো পুলিশ প্রশাসনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

তৈরি হয়েছে তালিকা। সব মিলিয়ে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পর্যায়ে অন্তত ১৭৪ জন রয়েছেন অবসরের তালিকায়।

এতে রয়েছেন ১৫, ১৭, ১৮ ও ২০ ব্যাচের কর্মকর্তা, যাদের সংখ্যা প্রায় ৫৭ জন। এরই মধ্যে শুধু ২০ ব্যাচেরই রয়েছেন ৫৩। এ ছাড়াও রয়েছেন ওই আমলের বিতর্কিত ওসিদের নামও যাদের অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদায় বিভিন্ন স্থানে কর্মরত। এক কথায় বয়স ২৫ বছর হলেই বিতর্কিতরা আর চাকরিতে থাকছেন না স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

সূত্র মতে, ওই তালিকায় রয়েছেন ২০ ব্যাচের, মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, শাহ মিজান শাফিউর রহমান, মোহাম্মদ মিরাজ উদ্দিন আহমেদ, সঞ্জিত কুমার রায়, জাকির হোসেন খান, সাইদুর রহমান, সুব্রত কুমার হালদার, নূরে আলম মিনা, শাহ আবীদ হোসেন, আলমগীর কবির, মো. ইলিয়াস শরিফ, জিহাদুল কবির, আনোয়ার হোসেন খান, রাশিদুল হাসান, সাইফুল্লাহ আল মামুন, এটিএম মোজাহিদুল ইসলাম, শেখ রফিকুল ইসলাম, টুটল চক্রবর্তী, মাইনুল হক, মাহাবুবুর রহমান খান, মোহাম্মদ রেজোয়ান, সাইফুল ইসলাম, মো. মনিরুজ্জামান, বরকতউল্লাহ খান, মেহেদেুল করিম, মো. মনিরুজ্জামান (২), গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহম্মেদ, জামিল হাসান ও হামিদুল আলমসহ আরও অনেকে। এ ছাড়াও আবাসন কোম্পানির ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৫ ব্যাচের রানিং দুই অতিরিক্ত আইজিপিও রয়েছেন অবসরের তালিকায়। পাশাপাশি ১৭ ও ১৮ ব্যাচের আরও দুইজন রয়েছে ওই তালিকায়। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মুখ না খুললেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

একইভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অন্তত ১১৭ জন ওসিকেও বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদায় চাকরি করছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। ওইসব কর্মকর্তার অনেকের বয়স এখন ২৫ বছর পার হয়েছে। এ কারণে তাদেরও অবসর দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধেও সরকারবিরোধী গোপন তৎপরতার অভিযোগ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।

এদিকে পুলিশের ভেতরে একযোগে এত সংখ্যক সদস্যকে অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখছেন না অনেকে। তাদের দাবি, ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশেই তারা কাজ করেছেন। তখন যদি নির্দেশ মানা না হতো তাহলে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ওই সময়ও তাদের শাস্তির আওতায় আনা হতো। এ কারণে চাকরি বাঁচানোর জন্যই তারা সরকারের নির্দেশ মেনে কাজ করেছেন। তাছাড়া অনেক মেধাবী কর্মকর্তাও রয়েছেন তালিকায়। যারা যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হয়েছিলেন বিভিন্ন সেক্টরে। তারাও রয়েছেন ওই তালিকায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, বাধ্যতামূলক অবসর চাকরিবিধিতেই আছে। যখন চাকরিবিধিতে থাকে, তখন সেটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ কম। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক কিংবা কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধের ধরন বা সময়কাল যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তিনি বলেন, “অভিযোগের ধরন ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ যদি স্পষ্ট থাকে, তাহলে এ বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। অভিযোগের ধরন ও সম্পৃক্ততার প্রশ্নে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

তৌহিদুল হক আরও বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেই আবার আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চাকরি ফিরে পেয়েছেন।” এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ওই প্রক্রিয়া ও অভিযোগের ধরনের মধ্যে আইনগত ব্যত্যয় ছিল। কেউ যাতে কোনো রোষানলে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ থাকলে তার কৃতকর্মের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারেÑ এটা বিধানেই রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিগত রোষানলের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যায়ভাবে, জোরপূর্বকভাবে যেন কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরসহ কোনো ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়। গত ১৫ বছরে দেখা গেছে, বিরোধী মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে অনেকেই পদোন্নতি থেকে শুরু করে নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এই সংস্কৃতি কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না।”

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ডিআইজি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও দপ্তরে দায়িত্বরত ও সংযুক্ত ছিলেন।
জানা গেছে, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ও সংযুক্ত থাকা অবস্থায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা ‘সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক’, ‘তথ্য ফাঁস’ ও ‘রাজনৈতিক তৎপরতা’ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে। এ ধরনের তথ্য হাতে পাওয়ার পর কঠোর অবস্থানে গেছে সরকার। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা এখন আতঙ্কে আছেন।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর দিয়ে থাকে সরকার। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার ওই কর্মচারীকে ‘জনস্বার্থে’ যেকোনো সময় অবসরে পাঠাতে পারে। এ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী গত দেড় বছরে বেশকিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। আরও একাধিক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনেকে অতিউৎসাহী হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। এমনকি সরকারবিরোধী আন্দোলের সময় তারা বেপরোয়া হয়ে নিরীহ জনগণের ওপর হামলা ও গুলি চালান। পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও খুনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব অপকর্মের কারণে সরকার পতনের পর অনেকে পালিয়ে যান। আবার অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাসপেন্ড হন। কাউকে সংযুক্ত করে রাখা হয়। সে অবস্থায় থেকেও তারা বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সরকার পতনের পর অনেকের নামে খুনের মামলাও তদন্ত চলছে। সেখানে কারও নামে চার্জশিট হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “পুলিশের বর্তমান পরিস্থিতি আসলে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফল যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়েও এই প্রবণতা ছিল। তবে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে তা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে। ফলে এখন নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারাচ্ছেন। কারও ক্ষেত্রে তা ন্যায্য, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্যায়ও হতে পারে। তাই সরকারকে সতর্ক হতে হবে যাতে ‘অতিউৎসাহী’ পদক্ষেপে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।”