০৭:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

সাজছে খুলনা, কাদা-খানাখন্দে শিপইয়ার্ড সড়ক-মায়ের স্মৃতিবিজড়িত আসনে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি চান এলাকাবাসী

  • আপডেট: ০৭:১৩:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০০০

খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক-এআই

 

দুর্নীতির তদন্ত ও মামলার পরও অচল সড়ক – খালেদা জিয়ার সাবেক আসনে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি।

মোঃ মোসলেহ্ উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার | দৈনিক সোনালী খবর, খুলনা | ৪ নভেম্বর ২০২৬।

আগামীকাল ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও নতুন সাজে সাজানোর ব্যাপক প্রস্তুতি। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও আশপাশের এলাকায় নতুন রং, দেয়াললিখন এবং পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে খুলনাকে নতুন রূপে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালেই বছরের পর বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে নগরীর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক। ট্রাফিক মোড় থেকে রূপসা খানজাহান আলী সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক এখন এলাকাবাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজার হাজার মানুষ।

খুলনার লবণচরা শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথ নয়, বরং নগরীর শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এসআরবি সদর দপ্তর, অক্সিজেন কোম্পানি, অটোরাইস মিল, সিমেন্ট কারখানা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি, অসমাপ্ত নির্মাণকাজ, বড় বড় গর্ত এবং খানাখন্দের কারণে সড়কটি কার্যত বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সড়কে ইতোমধ্যে একাধিক দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অসংখ্য মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন বলেও তাঁদের দাবি। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল এবং ছোট যানবাহনের জন্য সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও উঁচু-নিচু মাটির স্তূপ, আবার কোথাও কাদা ও জমে থাকা পানির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অটোরিকশাচালকদের জন্য যাত্রী নিয়ে এই সড়ক অতিক্রম করা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে যানবাহন উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সংশ্লিষ্ট থানা ও হাসপাতালের নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

বর্ষা মৌসুমে সড়কটির দুরবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে পানি জমে সড়ক ও গর্ত একাকার হয়ে যায়। কোথায় রাস্তা আর কোথায় গভীর খানাখন্দ, তা বোঝার উপায় থাকে না। অনেক সময় পানিতে ডুবে থাকা সড়ক দেখে মনে হয়, এটি কোনো রাস্তা নয়, যেন একটি নদী। পানি জমে থাকায় চালকেরা গর্তের গভীরতা বুঝতে পারেন না। ফলে যানবাহন গর্তে আটকে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পথচারীদেরও কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও কোমলমতি স্কুলশিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।

এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী অন্তত সাময়িকভাবে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার জোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকাজ শেষ করতে আরও সময় লাগলেও অবিলম্বে সড়কের বড় বড় গর্ত ভরাট, উঁচু-নিচু অংশ সমান এবং উপযুক্ত মাটি ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে খানাখন্দ সংস্কার করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হোক। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। শুধু মাটি ফেলে গর্ত ভরাট করলে বৃষ্টিতে আবার কাদা তৈরি হতে পারে। তাই প্রকৌশলসম্মতভাবে উপযুক্ত খোয়া, বালু ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে সড়কটি সাময়িকভাবে নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সড়কের উন্নয়নের জন্য বিগত সরকারের আমলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ২৮০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০১৩ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটি দীর্ঘ ১৩ বছরেও শেষ না হওয়ায় সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও জনগণ কেন একটি নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ জুন ২০২৬ একনেক সভায় খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং বাস্তবায়নে ব্যর্থতার বিষয় অনুসন্ধান করে। পরবর্তী সময়ে ৪০৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয় বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তদন্ত-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের কথা উঠে আসে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিল অনুমোদন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়।

এদিকে, শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন গত ২৫ অক্টোবর দুটি মামলা দায়ের করেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একটি মামলায় কাজ সম্পন্ন না করেই প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল প্রদানের অভিযোগ এবং অপর মামলায় কাজ শেষ দেখিয়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা উত্তোলন ও অনুমোদন ছাড়া এফডিআর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় কেডিএর ছয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই প্রতিনিধিকে আসামি করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিভাগীয় তদন্তে আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ থাকলেও দুদকের প্রাথমিক মামলায় তাঁদের নাম না থাকায় তদন্তের পরিধি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এত বড় একটি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থছাড়, বিল অনুমোদন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং প্রকল্পের সার্বিক তদারকির সিদ্ধান্ত কি শুধু কয়েকজন প্রকৌশলীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে? প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা কতটুকু ছিল? বিভাগীয় তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা দুদকের তদন্তে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অবশ্য বিভাগীয় তদন্তে অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যথাযথ পথ।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং দুদকের মামলা দায়েরের পরও সড়কটির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় জনমনে হতাশা তৈরি হয়েছে। একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলতে পারে, মামলা চলতে পারে, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য উপেক্ষিত থাকতে পারে না। দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার যেমন জরুরি, তেমনি সড়কটি দ্রুত চলাচলের উপযোগী করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চললেও লবণচরা শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি অবহেলিত থাকায় উন্নয়নের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ কতটুকু নেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি নগরীর প্রকৃত উন্নয়ন শুধু দেয়ালে নতুন রং, সড়কের পাশে পরিচ্ছন্নতা কিংবা বাহ্যিক সাজসজ্জায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল, শিল্পকারখানার নির্বিঘ্ন পরিবহন এবং জনদুর্ভোগ নিরসনই হওয়া উচিত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিশেষ করে খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক ও রূপসা খানজাহান আলী সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ককে ঘিরে প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ও মানুষ চলাচল করেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সড়কটির ভাঙাচোরা অবস্থা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, বরং শিল্পাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ধুলাবালি, কাদা-পানি ও দীর্ঘ যানজটের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন খুলনা সফরকে সামনে রেখে দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা তাঁর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে যে প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং নির্মাণকাজ শেষ করার বাস্তব পরিকল্পনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাইবেন।

এলাকাবাসীর দাবি, দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও সড়ক সংস্কারের জরুরি কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। অবিলম্বে সড়কের গর্ত ও খানাখন্দ ভরাট, অসমান অংশ সমতলকরণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, তাঁর সফর শুধু নগরীর সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত মানুষের দুর্ভোগ নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শিপইয়ার্ড সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জনগণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

খুলনাবাসীর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত হয়েছে, অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে, দুদকের মামলা হয়েছে, কিন্তু যে সড়কে মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন, সেই সড়কটি চলাচলের উপযোগী হবে কবে?

প্রধানমন্ত্রীর আগমনে নতুন সাজে সাজছে খুলনা। কিন্তু সেই সাজসজ্জার আড়ালে শিপইয়ার্ড সড়কের খানাখন্দ, জমে থাকা কাদা-পানি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ যেন ঢাকা না পড়ে, এটাই দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা। তাঁদের দাবি, পুরো প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগলেও অন্তত এখনই সড়কটি সমান করে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে নতুন রঙে সাজানো শহরের চেয়েও বেশি জরুরি একটি নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

সাজছে খুলনা, কাদা-খানাখন্দে শিপইয়ার্ড সড়ক-মায়ের স্মৃতিবিজড়িত আসনে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি চান এলাকাবাসী

আপডেট: ০৭:১৩:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

 

দুর্নীতির তদন্ত ও মামলার পরও অচল সড়ক – খালেদা জিয়ার সাবেক আসনে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি।

মোঃ মোসলেহ্ উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার | দৈনিক সোনালী খবর, খুলনা | ৪ নভেম্বর ২০২৬।

আগামীকাল ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও নতুন সাজে সাজানোর ব্যাপক প্রস্তুতি। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও আশপাশের এলাকায় নতুন রং, দেয়াললিখন এবং পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে খুলনাকে নতুন রূপে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালেই বছরের পর বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে নগরীর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক। ট্রাফিক মোড় থেকে রূপসা খানজাহান আলী সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক এখন এলাকাবাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজার হাজার মানুষ।

খুলনার লবণচরা শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথ নয়, বরং নগরীর শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এসআরবি সদর দপ্তর, অক্সিজেন কোম্পানি, অটোরাইস মিল, সিমেন্ট কারখানা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি, অসমাপ্ত নির্মাণকাজ, বড় বড় গর্ত এবং খানাখন্দের কারণে সড়কটি কার্যত বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সড়কে ইতোমধ্যে একাধিক দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অসংখ্য মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন বলেও তাঁদের দাবি। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল এবং ছোট যানবাহনের জন্য সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও উঁচু-নিচু মাটির স্তূপ, আবার কোথাও কাদা ও জমে থাকা পানির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অটোরিকশাচালকদের জন্য যাত্রী নিয়ে এই সড়ক অতিক্রম করা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে যানবাহন উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সংশ্লিষ্ট থানা ও হাসপাতালের নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

বর্ষা মৌসুমে সড়কটির দুরবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে পানি জমে সড়ক ও গর্ত একাকার হয়ে যায়। কোথায় রাস্তা আর কোথায় গভীর খানাখন্দ, তা বোঝার উপায় থাকে না। অনেক সময় পানিতে ডুবে থাকা সড়ক দেখে মনে হয়, এটি কোনো রাস্তা নয়, যেন একটি নদী। পানি জমে থাকায় চালকেরা গর্তের গভীরতা বুঝতে পারেন না। ফলে যানবাহন গর্তে আটকে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পথচারীদেরও কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও কোমলমতি স্কুলশিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।

এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী অন্তত সাময়িকভাবে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার জোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকাজ শেষ করতে আরও সময় লাগলেও অবিলম্বে সড়কের বড় বড় গর্ত ভরাট, উঁচু-নিচু অংশ সমান এবং উপযুক্ত মাটি ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে খানাখন্দ সংস্কার করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হোক। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। শুধু মাটি ফেলে গর্ত ভরাট করলে বৃষ্টিতে আবার কাদা তৈরি হতে পারে। তাই প্রকৌশলসম্মতভাবে উপযুক্ত খোয়া, বালু ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে সড়কটি সাময়িকভাবে নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সড়কের উন্নয়নের জন্য বিগত সরকারের আমলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ২৮০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০১৩ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটি দীর্ঘ ১৩ বছরেও শেষ না হওয়ায় সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও জনগণ কেন একটি নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ জুন ২০২৬ একনেক সভায় খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং বাস্তবায়নে ব্যর্থতার বিষয় অনুসন্ধান করে। পরবর্তী সময়ে ৪০৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয় বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তদন্ত-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের কথা উঠে আসে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিল অনুমোদন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়।

এদিকে, শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন গত ২৫ অক্টোবর দুটি মামলা দায়ের করেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একটি মামলায় কাজ সম্পন্ন না করেই প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল প্রদানের অভিযোগ এবং অপর মামলায় কাজ শেষ দেখিয়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা উত্তোলন ও অনুমোদন ছাড়া এফডিআর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় কেডিএর ছয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই প্রতিনিধিকে আসামি করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিভাগীয় তদন্তে আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ থাকলেও দুদকের প্রাথমিক মামলায় তাঁদের নাম না থাকায় তদন্তের পরিধি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এত বড় একটি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থছাড়, বিল অনুমোদন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং প্রকল্পের সার্বিক তদারকির সিদ্ধান্ত কি শুধু কয়েকজন প্রকৌশলীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে? প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা কতটুকু ছিল? বিভাগীয় তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা দুদকের তদন্তে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অবশ্য বিভাগীয় তদন্তে অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যথাযথ পথ।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং দুদকের মামলা দায়েরের পরও সড়কটির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় জনমনে হতাশা তৈরি হয়েছে। একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলতে পারে, মামলা চলতে পারে, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য উপেক্ষিত থাকতে পারে না। দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার যেমন জরুরি, তেমনি সড়কটি দ্রুত চলাচলের উপযোগী করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চললেও লবণচরা শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি অবহেলিত থাকায় উন্নয়নের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ কতটুকু নেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি নগরীর প্রকৃত উন্নয়ন শুধু দেয়ালে নতুন রং, সড়কের পাশে পরিচ্ছন্নতা কিংবা বাহ্যিক সাজসজ্জায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল, শিল্পকারখানার নির্বিঘ্ন পরিবহন এবং জনদুর্ভোগ নিরসনই হওয়া উচিত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিশেষ করে খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক ও রূপসা খানজাহান আলী সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ককে ঘিরে প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ও মানুষ চলাচল করেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সড়কটির ভাঙাচোরা অবস্থা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, বরং শিল্পাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ধুলাবালি, কাদা-পানি ও দীর্ঘ যানজটের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন খুলনা সফরকে সামনে রেখে দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা তাঁর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে যে প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং নির্মাণকাজ শেষ করার বাস্তব পরিকল্পনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাইবেন।

এলাকাবাসীর দাবি, দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও সড়ক সংস্কারের জরুরি কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। অবিলম্বে সড়কের গর্ত ও খানাখন্দ ভরাট, অসমান অংশ সমতলকরণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, তাঁর সফর শুধু নগরীর সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত মানুষের দুর্ভোগ নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শিপইয়ার্ড সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জনগণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

খুলনাবাসীর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত হয়েছে, অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে, দুদকের মামলা হয়েছে, কিন্তু যে সড়কে মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন, সেই সড়কটি চলাচলের উপযোগী হবে কবে?

প্রধানমন্ত্রীর আগমনে নতুন সাজে সাজছে খুলনা। কিন্তু সেই সাজসজ্জার আড়ালে শিপইয়ার্ড সড়কের খানাখন্দ, জমে থাকা কাদা-পানি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ যেন ঢাকা না পড়ে, এটাই দক্ষিণ লবণচরা শিল্পাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা। তাঁদের দাবি, পুরো প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগলেও অন্তত এখনই সড়কটি সমান করে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে নতুন রঙে সাজানো শহরের চেয়েও বেশি জরুরি একটি নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক।