০৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

দুর্নীতির নতুন রেকর্ড ভাঙলেন সার্ভেয়ার জহির: নেপথ্যে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা

  • আপডেট: ০৭:১৭:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০২৯

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজত্বের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে যেখানে সাধারণ ভূমি মালিক ও সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত চরম জিম্মি দশার শিকার হচ্ছেন। এই পুরো অনৈতিক নেটওয়ার্কের মূলে রয়েছে সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা । নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের এই ভূমি অধিগ্রহণ শাখাটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে যেন এক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ফাইলের গতিপ্রকৃতি ও ভাগ্য নির্ধারিত হয় ঘুষের টাকার অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে। পূর্বেকার কিছু কর্মচারী বা কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলেও বর্তমান সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সার্ভেয়ার জহির ও সার্ভেয়ার কাওছার, যাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ৩৮তম ব্যাচের বিতর্কিত কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার নাম। ফলে সাধারণ ভূমি মালিকরা তাদের বৈধ ক্ষতিপূরণের চেক বা ফাইল ছাড় করাতে গিয়ে পদে পদে চরম হয়রানি ও সর্বস্বান্ত হওয়ার মুখে পড়ছেন।
উল্লেখ্য যে, ৩৮তম ব্যাচের এই বিসিএস কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা ইতিপূর্বে গাজীপুরের কালীগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। কালীগঞ্জে এসি ল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নামজারি (মিউটেশন) ও মিসকেস সেবা প্রদানে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের জিম্মি করে রাখার অসংখ্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো সাধারণ কাজের জন্য তার কার্যালয়ে ফাইল জমা পড়লে তা দিনের পর দিন আটকে রেখে গ্রাহকদের চরম হয়রানির শিকার বানানো হতো। জনপ্রশাসন ও প্রশাসনের অন্দরে তাকে ৩৮তম ব্যাচের ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। কালীগঞ্জে থাকাকালীন জিম্মিকরণের সেই পুরনো দুর্নীতির অভ্যাস ও সিন্ডিকেট তৈরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার দায়িত্বে এসে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের সরাসরি মদদ দেওয়া শুরু করেছেন।
এদিকে, সার্ভেয়ার কাওছার আহমেদ এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান মুখ ও দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত, যিনি অতীতে দুর্নীতির দায়ে এবং চাঞ্চল্যকর ঘুষ বাণিজ্যের মামলায় দীর্ঘকাল কারাভোগ করার পরও অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে এবং ক্ষমতার জোরে পুনরায় ডিসি অফিসের অধিগ্রহণ শাখায় বীরদর্পে ফিরে আসেন এবং তার পূর্বের ধারাবাহিকতায় আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য যে, গত ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে কার্টনভর্তি নগদ ৪২ লাখ টাকাসহ তাকে ও তার সহযোগীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যা সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর জনসংযোগ কর্মকর্তা আক্তারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে তখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, ডিসি অফিসের সামনে থেকে কার্টনভর্তি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় দুদকের দায়ের করা সুনির্দিষ্ট মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির মামলায় কাওসারকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছিল। দুদক সূত্রে বিস্তারিত জানা গিয়েছিল যে, ১০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ রাত ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের প্রধান গেটের সামনে থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের তৎকালীন আউটসোর্সিং কর্মচারী জাহিদুল ইসলাম সুমনকে একটি সন্দেহজনক কার্টনসহ নিরাপত্তা কর্মীরা আটক করে ফেলেছিল, এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের সরাসরি নির্দেশে সেই সিলগালা করা কার্টন খুলে তার ভেতর থেকে নগদ ৪২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করে উদ্ধারকৃত বিশাল অঙ্কের টাকাগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিরাপদ কোষাগারে জমা রাখা হয়েছিল, কিন্তু জব্দকৃত ওই ৪২ লাখ টাকার সাথে সরকারি ভূমি অধিগ্রহণ খাতের দুর্নীতির ও ঘুষ বাণিজ্যের গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জোরালো ধারণা করে ১৪ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক স্বয়ং দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। এরই সূত্র ধরে ১৬ জানুয়ারি দুদক জেলা কার্যালয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় একটি শক্ত মামলা রুজু করা হয়, যেখানে জাহিদুল ইসলাম সুমন এবং মূল অভিযুক্ত সার্ভেয়ার কাওছার আহমেদকে সরাসরি এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছিল। সেই ঘুষ বাণিজ্যের বহুমুখী ও চাঞ্চল্যকর মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে কারাভোগ করার পর আইনি ফাঁকফোকর কিংবা অদৃশ্য শক্তির জোরে জামিনে মুক্ত হয়ে কাওছার পুনরায় ডিসি অফিসের অধিগ্রহণ শাখায় ফিরে আসেন এবং এসেই পূর্বের সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে পুনরায় ভূমি মালিকদের রক্ত চুষে খাওয়ার মহোৎসব শুরু করেন।
সার্ভেয়ার কাওছারের এই ফিরে আসার মধ্য দিয়ে এবং সার্ভেয়ার জহিরের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ডিসি অফিসের এলএ শাখাটি একটি দুর্নীতির দুর্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে তাদের দুজনের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা। লিমার ছত্রছায়া ও প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে এই সিন্ডিকেট পুরো জেলা প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছে। সার্ভেয়ার জহির বর্তমান সময়ে ডিসি অফিসে দুর্নীতির সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি অধিগ্রহণের ফাইল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ আদায় না করা পর্যন্ত কোনো ফাইল ওপরের টেবিলে বা অনুমোদনের জন্য পেশ করেন না। সাধারণ সেবাগ্রহীতারা নিজেদের ভিটেমাটি বা জমির সরকারি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য যখন দিনের পর দিন ডিসি অফিসের বারান্দায় ও এই দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ারদের টেবিলে ঘুরে বেড়ান, তখন তাদের নানা অজুহাতে আটকে রেখে চরম মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন চালানো হয়। সার্ভেয়ার জহির নিজেকে ডিসি অফিসের সর্বেসর্বা ও অঘোষিত হর্তাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখেন এবং তার ঘুষের পার্সেন্টেজ না দিলে ফাইল চিরতরে আটকে থাকবে কিংবা উধাও হয়ে যাবে এমন সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার জহির ও সার্ভেয়ার কাওছার একা নন, বরং তাদের এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং আইনি ঝুটঝামেলা থেকে রক্ষা করতে নেপথ্যে পূর্ণ সুরক্ষা ও প্রচ্ছদপটের আড়াল দিয়ে যাচ্ছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকার কারণেই এই দুই সার্ভেয়ার এত বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পান। সার্ভেয়ার জহিরের দুর্নীতির সাম্প্রতিক অভিনব কৌশলের মধ্যে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ও তাদের তহবিলে টাকা পাঠানোর কথা বলে সাধারণ অসহায় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অঙ্কের ঘুষ আদায় করা। কোনো সাধারণ মানুষ যদি এই সিন্ডিকেটের কোনো দুর্নীতির প্রতিবাদ করার সাহস দেখান, তবে তাকে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা, পুলিশি হয়রানি কিংবা অধিগ্রহণের ফাইল চিরতরে বাতিল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে শত শত ভুক্তভোগী পরিবার নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে নিজেদের কষ্টের অর্জিত টাকা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের মহৎ উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোও আজ সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। কারণ উন্নয়নের নামে অধিগ্রহণকৃত জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার সমন্বয়ে গঠিত এই ট্রায়ো সিন্ডিকেটের কারণে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অতীতে দুর্নীতির দায়ে কাওসারের মতো কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটে আসার পরও প্রশাসনের ভেতরে সংস্কার বা শুভবুদ্ধির উদয় না হয়ে বরং অপরাধের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে জাকিয়া সরওয়ার লিমার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এত বড় মাপের দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের জাল কখনো টিকতে পারে না। ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বারবার বলেছেন যে, কেবল কিছু কর্মচারীকে সাময়িক বদলি করা বা আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাচে ঝুলিয়ে রাখা এই গভীর সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, বরং প্রয়োজন হলো এই পুরো সিন্ডিকেটের শিকড় কেটে ফেলা। তাই অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্তকারী সংস্থাকে মাঠে নেমে সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত প্রতিটি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অবৈধভাবে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব খতিয়ান বের করে তা কঠোর হাতে বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডিসি অফিসের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থায় এসে আর কখনো কোনো সার্ভেয়ার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দুর্নীতির শিকার হয়ে নিঃস্ব না হয় এবং সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

দুর্নীতির নতুন রেকর্ড ভাঙলেন সার্ভেয়ার জহির: নেপথ্যে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা

আপডেট: ০৭:১৭:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজত্বের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে যেখানে সাধারণ ভূমি মালিক ও সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত চরম জিম্মি দশার শিকার হচ্ছেন। এই পুরো অনৈতিক নেটওয়ার্কের মূলে রয়েছে সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা । নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের এই ভূমি অধিগ্রহণ শাখাটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে যেন এক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ফাইলের গতিপ্রকৃতি ও ভাগ্য নির্ধারিত হয় ঘুষের টাকার অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে। পূর্বেকার কিছু কর্মচারী বা কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলেও বর্তমান সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সার্ভেয়ার জহির ও সার্ভেয়ার কাওছার, যাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ৩৮তম ব্যাচের বিতর্কিত কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার নাম। ফলে সাধারণ ভূমি মালিকরা তাদের বৈধ ক্ষতিপূরণের চেক বা ফাইল ছাড় করাতে গিয়ে পদে পদে চরম হয়রানি ও সর্বস্বান্ত হওয়ার মুখে পড়ছেন।
উল্লেখ্য যে, ৩৮তম ব্যাচের এই বিসিএস কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা ইতিপূর্বে গাজীপুরের কালীগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। কালীগঞ্জে এসি ল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নামজারি (মিউটেশন) ও মিসকেস সেবা প্রদানে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের জিম্মি করে রাখার অসংখ্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো সাধারণ কাজের জন্য তার কার্যালয়ে ফাইল জমা পড়লে তা দিনের পর দিন আটকে রেখে গ্রাহকদের চরম হয়রানির শিকার বানানো হতো। জনপ্রশাসন ও প্রশাসনের অন্দরে তাকে ৩৮তম ব্যাচের ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। কালীগঞ্জে থাকাকালীন জিম্মিকরণের সেই পুরনো দুর্নীতির অভ্যাস ও সিন্ডিকেট তৈরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার দায়িত্বে এসে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের সরাসরি মদদ দেওয়া শুরু করেছেন।
এদিকে, সার্ভেয়ার কাওছার আহমেদ এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান মুখ ও দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত, যিনি অতীতে দুর্নীতির দায়ে এবং চাঞ্চল্যকর ঘুষ বাণিজ্যের মামলায় দীর্ঘকাল কারাভোগ করার পরও অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে এবং ক্ষমতার জোরে পুনরায় ডিসি অফিসের অধিগ্রহণ শাখায় বীরদর্পে ফিরে আসেন এবং তার পূর্বের ধারাবাহিকতায় আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য যে, গত ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে কার্টনভর্তি নগদ ৪২ লাখ টাকাসহ তাকে ও তার সহযোগীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যা সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর জনসংযোগ কর্মকর্তা আক্তারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে তখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, ডিসি অফিসের সামনে থেকে কার্টনভর্তি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় দুদকের দায়ের করা সুনির্দিষ্ট মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির মামলায় কাওসারকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছিল। দুদক সূত্রে বিস্তারিত জানা গিয়েছিল যে, ১০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ রাত ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের প্রধান গেটের সামনে থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের তৎকালীন আউটসোর্সিং কর্মচারী জাহিদুল ইসলাম সুমনকে একটি সন্দেহজনক কার্টনসহ নিরাপত্তা কর্মীরা আটক করে ফেলেছিল, এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের সরাসরি নির্দেশে সেই সিলগালা করা কার্টন খুলে তার ভেতর থেকে নগদ ৪২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করে উদ্ধারকৃত বিশাল অঙ্কের টাকাগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিরাপদ কোষাগারে জমা রাখা হয়েছিল, কিন্তু জব্দকৃত ওই ৪২ লাখ টাকার সাথে সরকারি ভূমি অধিগ্রহণ খাতের দুর্নীতির ও ঘুষ বাণিজ্যের গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জোরালো ধারণা করে ১৪ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক স্বয়ং দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। এরই সূত্র ধরে ১৬ জানুয়ারি দুদক জেলা কার্যালয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় একটি শক্ত মামলা রুজু করা হয়, যেখানে জাহিদুল ইসলাম সুমন এবং মূল অভিযুক্ত সার্ভেয়ার কাওছার আহমেদকে সরাসরি এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছিল। সেই ঘুষ বাণিজ্যের বহুমুখী ও চাঞ্চল্যকর মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে কারাভোগ করার পর আইনি ফাঁকফোকর কিংবা অদৃশ্য শক্তির জোরে জামিনে মুক্ত হয়ে কাওছার পুনরায় ডিসি অফিসের অধিগ্রহণ শাখায় ফিরে আসেন এবং এসেই পূর্বের সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে পুনরায় ভূমি মালিকদের রক্ত চুষে খাওয়ার মহোৎসব শুরু করেন।
সার্ভেয়ার কাওছারের এই ফিরে আসার মধ্য দিয়ে এবং সার্ভেয়ার জহিরের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ডিসি অফিসের এলএ শাখাটি একটি দুর্নীতির দুর্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে তাদের দুজনের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা। লিমার ছত্রছায়া ও প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে এই সিন্ডিকেট পুরো জেলা প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছে। সার্ভেয়ার জহির বর্তমান সময়ে ডিসি অফিসে দুর্নীতির সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি অধিগ্রহণের ফাইল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ আদায় না করা পর্যন্ত কোনো ফাইল ওপরের টেবিলে বা অনুমোদনের জন্য পেশ করেন না। সাধারণ সেবাগ্রহীতারা নিজেদের ভিটেমাটি বা জমির সরকারি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য যখন দিনের পর দিন ডিসি অফিসের বারান্দায় ও এই দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ারদের টেবিলে ঘুরে বেড়ান, তখন তাদের নানা অজুহাতে আটকে রেখে চরম মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন চালানো হয়। সার্ভেয়ার জহির নিজেকে ডিসি অফিসের সর্বেসর্বা ও অঘোষিত হর্তাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখেন এবং তার ঘুষের পার্সেন্টেজ না দিলে ফাইল চিরতরে আটকে থাকবে কিংবা উধাও হয়ে যাবে এমন সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার জহির ও সার্ভেয়ার কাওছার একা নন, বরং তাদের এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং আইনি ঝুটঝামেলা থেকে রক্ষা করতে নেপথ্যে পূর্ণ সুরক্ষা ও প্রচ্ছদপটের আড়াল দিয়ে যাচ্ছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমা। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকার কারণেই এই দুই সার্ভেয়ার এত বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পান। সার্ভেয়ার জহিরের দুর্নীতির সাম্প্রতিক অভিনব কৌশলের মধ্যে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ও তাদের তহবিলে টাকা পাঠানোর কথা বলে সাধারণ অসহায় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অঙ্কের ঘুষ আদায় করা। কোনো সাধারণ মানুষ যদি এই সিন্ডিকেটের কোনো দুর্নীতির প্রতিবাদ করার সাহস দেখান, তবে তাকে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা, পুলিশি হয়রানি কিংবা অধিগ্রহণের ফাইল চিরতরে বাতিল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে শত শত ভুক্তভোগী পরিবার নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে নিজেদের কষ্টের অর্জিত টাকা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের মহৎ উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোও আজ সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। কারণ উন্নয়নের নামে অধিগ্রহণকৃত জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার সমন্বয়ে গঠিত এই ট্রায়ো সিন্ডিকেটের কারণে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অতীতে দুর্নীতির দায়ে কাওসারের মতো কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটে আসার পরও প্রশাসনের ভেতরে সংস্কার বা শুভবুদ্ধির উদয় না হয়ে বরং অপরাধের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে জাকিয়া সরওয়ার লিমার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এত বড় মাপের দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের জাল কখনো টিকতে পারে না। ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বারবার বলেছেন যে, কেবল কিছু কর্মচারীকে সাময়িক বদলি করা বা আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাচে ঝুলিয়ে রাখা এই গভীর সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, বরং প্রয়োজন হলো এই পুরো সিন্ডিকেটের শিকড় কেটে ফেলা। তাই অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্তকারী সংস্থাকে মাঠে নেমে সার্ভেয়ার জহির, সার্ভেয়ার কাওছার এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জাকিয়া সরওয়ার লিমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত প্রতিটি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অবৈধভাবে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব খতিয়ান বের করে তা কঠোর হাতে বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডিসি অফিসের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থায় এসে আর কখনো কোনো সার্ভেয়ার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দুর্নীতির শিকার হয়ে নিঃস্ব না হয় এবং সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়।