০৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মূল্য পুনর্বিবেচনার দাবী

  • আপডেট: ০৬:০৯:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০২

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তামাকবিরোধী নারী সংসদ সদস্য ফোরামের সদস্যরা। সোমবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট-পরবর্তী আলোচনা’ সভায় নারী সংসদ সদস্যরা এ মতামত ব্যক্ত করেন।

বক্তারা বলেন, “বর্তমান সরকার জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য পূরণে তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও করহার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ তামাক ব্যবহারের হার কমাতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে কার্যকর কর বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও পরীক্ষিত পন্থা।”

সভায় জানানো হয়, জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে কর আহরণ সহজীকরণের জন্য বাজারে বিদ্যমান সিগারেটের স্তর চারটি থেকে নামিয়ে তিনটিতে এনে মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। কারন নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম কাছাকাছি হওয়ায় একটি স্তরের দাম বৃদ্ধি পেলে ভোক্তা কাছাকাছি নিম্ন স্তরের সিগারেট বেছে নেয়ার সুযোগ পায়। তাই এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো। সেই সাথে সকল স্তরের সিগারেটের উপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যকেটে ৪ টাকা হারে নির্দিষ্ট করারোপ করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিলো।

কিন্তু বাজেট প্রস্তাবে সরকার কেবল সিগারেটের যৎসামান্য মূল্য বাড়িয়েছে। সিগারেটের ১০ শলাকার মূল্য নিম্ন স্তরে ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে। বাজারে সিগারেটের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিক্রি হয় নিম্ন স্তরের সিগারেট। এই স্তরের মূল্য মাত্র ২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ৬২ টাকা, প্রতি শলাকা ৬.২ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সারা দেশের দোকানে এই সিগারেট একক শলাকায় আগে থেকেই ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তামাক কোম্পানি যদি আগের দামেও বিক্রি করে তবুও তাদের প্রতি শলাকায় ০.৮ টাকা লাভ হবে। যার পুরোটাই থেকে যাবে করমুক্ত।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে শুধু নিম্নস্তরের সিগারেট বিক্রি হয়েছিল ৬৮.৮৯ বিলিয়ন শলাকা। এই বিপুল পরিমাণের বিপরীতে প্রতিটি শলাকায় ০.৮ টাকা লাভ হিসাব করলে দাঁড়ায় ৫,৫১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার এই বড় অঙ্কের টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট করারোপ বাদ দেয়া হয়েছে। সম্পুরক শুল্ক ৬৭% বহাল রেখে যদি সুনির্দিষ্ট করারোপ করা না হয় তাহলেও তামাক কোম্পানি মোটা অংকের মুনাফা ঘরে তোলার সুযোগ পাবে।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারের অধিক রাজস্ব আহরনের পরিবর্তে উল্টো তামাক কোম্পানির মুনাফা লাভের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে তরুন ও স্বল্প আয়ের ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুকি বহুগুনে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে।

সভায় আরো জানানো হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস-এর মূল্য নির্ধারণ এবং এর ওপর সম্পূরক কর আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক কর আরোপ করা হয়েছে। বাজেটে এসব পন্যের উপর করারোপ করার অর্থ হলো এসব পণ্যকে বৈধতা দেয়া। এর ফলে এসব নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে আসক্তি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।

তাই জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব আমলে নিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

তামাকবিরোধী নারী সংসদ সদস্য ফোরামের সহ-সভাপতি রাশেদা বেগম হীরা’র সভাপতিত্বে সভায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত নেওয়াজ হালিমা আরলী, হেলেন জেরিন খান, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমীন, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, ফেরদৌসী আহমেদ, জহরত আদিব চৌধুরী, শওকত আরা আক্তার, রেজেকা সুলতানা, নাদিয়া পাঠান পাপন, মমতাজ আলো, সেলিনা সুলতানাএবং সুরাইয়া জারিন। আরও উপস্থিত ছিলেন নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচাল শাহীন আক্তার ডলি। তারা সকলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক কোম্পানির মুনাফা বন্ধে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবী জানান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মূল্য পুনর্বিবেচনার দাবী

আপডেট: ০৬:০৯:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তামাকবিরোধী নারী সংসদ সদস্য ফোরামের সদস্যরা। সোমবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট-পরবর্তী আলোচনা’ সভায় নারী সংসদ সদস্যরা এ মতামত ব্যক্ত করেন।

বক্তারা বলেন, “বর্তমান সরকার জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য পূরণে তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও করহার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ তামাক ব্যবহারের হার কমাতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে কার্যকর কর বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও পরীক্ষিত পন্থা।”

সভায় জানানো হয়, জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে কর আহরণ সহজীকরণের জন্য বাজারে বিদ্যমান সিগারেটের স্তর চারটি থেকে নামিয়ে তিনটিতে এনে মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। কারন নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম কাছাকাছি হওয়ায় একটি স্তরের দাম বৃদ্ধি পেলে ভোক্তা কাছাকাছি নিম্ন স্তরের সিগারেট বেছে নেয়ার সুযোগ পায়। তাই এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো। সেই সাথে সকল স্তরের সিগারেটের উপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যকেটে ৪ টাকা হারে নির্দিষ্ট করারোপ করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিলো।

কিন্তু বাজেট প্রস্তাবে সরকার কেবল সিগারেটের যৎসামান্য মূল্য বাড়িয়েছে। সিগারেটের ১০ শলাকার মূল্য নিম্ন স্তরে ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে। বাজারে সিগারেটের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিক্রি হয় নিম্ন স্তরের সিগারেট। এই স্তরের মূল্য মাত্র ২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ৬২ টাকা, প্রতি শলাকা ৬.২ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সারা দেশের দোকানে এই সিগারেট একক শলাকায় আগে থেকেই ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তামাক কোম্পানি যদি আগের দামেও বিক্রি করে তবুও তাদের প্রতি শলাকায় ০.৮ টাকা লাভ হবে। যার পুরোটাই থেকে যাবে করমুক্ত।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে শুধু নিম্নস্তরের সিগারেট বিক্রি হয়েছিল ৬৮.৮৯ বিলিয়ন শলাকা। এই বিপুল পরিমাণের বিপরীতে প্রতিটি শলাকায় ০.৮ টাকা লাভ হিসাব করলে দাঁড়ায় ৫,৫১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার এই বড় অঙ্কের টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট করারোপ বাদ দেয়া হয়েছে। সম্পুরক শুল্ক ৬৭% বহাল রেখে যদি সুনির্দিষ্ট করারোপ করা না হয় তাহলেও তামাক কোম্পানি মোটা অংকের মুনাফা ঘরে তোলার সুযোগ পাবে।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারের অধিক রাজস্ব আহরনের পরিবর্তে উল্টো তামাক কোম্পানির মুনাফা লাভের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে তরুন ও স্বল্প আয়ের ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুকি বহুগুনে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে।

সভায় আরো জানানো হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস-এর মূল্য নির্ধারণ এবং এর ওপর সম্পূরক কর আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক কর আরোপ করা হয়েছে। বাজেটে এসব পন্যের উপর করারোপ করার অর্থ হলো এসব পণ্যকে বৈধতা দেয়া। এর ফলে এসব নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে আসক্তি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।

তাই জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব আমলে নিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

তামাকবিরোধী নারী সংসদ সদস্য ফোরামের সহ-সভাপতি রাশেদা বেগম হীরা’র সভাপতিত্বে সভায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত নেওয়াজ হালিমা আরলী, হেলেন জেরিন খান, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমীন, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, ফেরদৌসী আহমেদ, জহরত আদিব চৌধুরী, শওকত আরা আক্তার, রেজেকা সুলতানা, নাদিয়া পাঠান পাপন, মমতাজ আলো, সেলিনা সুলতানাএবং সুরাইয়া জারিন। আরও উপস্থিত ছিলেন নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচাল শাহীন আক্তার ডলি। তারা সকলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক কোম্পানির মুনাফা বন্ধে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁযাবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবী জানান।