মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে দুর্নীতির একচ্ছত্র রাজত্ব কানুনগো নাজমুলের
- আপডেট: ০৭:৫০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৮০০৪
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
রাজধানীর মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল এখন সাধারণ ভূমি সেবাপ্রত্যাশীদের জন্য ভয়াবহ হয়রানি ও আতঙ্কের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি বিধিমালাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই দপ্তরটিকে লুণ্ঠনের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে একটি শক্তিশালী চক্র, যার সর্বেসর্বা ও নেপথ্যের মূল কারিগর কানুনগো নাজমুল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি বিধিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তিন বছরের বেশি সময় একই দপ্তরে অবস্থান করতে পারবেন না। কিন্তু ক্ষমতার দাপট ও অনৈতিক প্রশাসনিক প্রভাবে নাজমুল দীর্ঘ ৫ বছর ধরে একই জায়গায় বহাল তবিয়তে টিকে আছেন। এই দীর্ঘ ৫ বছরে নিজের অনিয়মের সাম্রাজ্য নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ও অনৈতিক লেনদেন নির্বিঘ্ন করতে তিনি একের পর এক ওমেদার ও কথিত বহিরাগত দালালদের দপ্তরে নিয়োগ দিয়ে গেছেন যা সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য চরম নজিরবিহীন। জালিয়াতি, নথিপত্র গায়েব ও বেপরোয়া নামজারি বাণিজ্যের মাধ্যমে কানুনগো নাজমুল গড়ে তুলেছেন অঢেল ও অবৈধ সম্পদের বিশাল পাহাড়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজের অর্জিত কালো টাকা লুকাতে তিনি চরম চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে ভৈরবের খ্যাতনামা শিল্পপতি হাজী ফুল মিয়ার বিলাসবহুল বাড়িটি এককালীন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থে নিজের নামে কিনেছেন তিনি। এছাড়া প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে বাবুবাজার ব্রিজের কাছে সহোদর বোনের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের এক বহুতল ভবন। অদৃশ্য কোনো শক্তির ছত্রছায়ায় এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে একই স্থানে পদোন্নতি পেয়ে পুনরায় একই চেয়ারে বহাল থেকেছেন নাজমুল। প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিজের বদলি ঠেকাতে ও অবৈধ আয়ের পথ সুগম রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চাকরি বিধির তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর তার এমন আঁকড়ে থাকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে নাজমুলের এই বিশাল সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে এক সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী। সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান এবং নতুন পদোন্নতিপ্রাপ্ত একাধিক কর্মকর্তা কানুনগো নাজমুলের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য পরিচালনায় প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। এই চক্রের অন্যতম চালিকাশক্তি নামজারি সহকারী খাদিজা, যিনি বিগত সরকার আমলে আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে দপ্তরটি নিজের হাতের মুঠোয় রাখেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিতর্কিত সাবেক কমিশনার মানিকের ঘনিষ্ঠ এই খাদিজার সাথে যুক্ত আছেন অফিস সহকারী রাকিব। কার্যালয়ের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ খ্যাত রাকিবের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো ফাইলই টেবিলে নড়ে না; তার সাথে গভীর যোগাযোগ রয়েছে এলাকার ভূমিদস্যু ও জালিয়াত চক্রের। মাঠপর্যায়ে টাকা তোলার কলকাঠি নাড়ছেন মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান এবং ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সঞ্জীব। ‘লাইন’ নামক সুসংগঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবাপ্রত্যাশীদের পকেট কাটছেন তারা। পাশাপাশি কানুনগো নাজমুলের আশীর্বাদপুষ্ট ওমেদার ও দালালদের এক বিশাল বাহিনী পুরো দপ্তরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। মতিঝিল অফিসে সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান এবং ধনিয়া অফিসে হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির নামের দালালরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
সার্কেলটির অনিয়মের ধরনও বেশ উদ্বেগজনক। দিনে নিয়মমাফিক কাজের মহড়া চললেও মূল অপকর্ম শুরু হয় রাতের আঁধারে। অফিস ছুটির পর বাতি জ্বালিয়ে চলে ফাইল গোপন ও অনৈতিক লেনদেনের উৎসব; প্রমান মোছাতে সিসিটিভি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে রাখা হয়। সম্প্রতি মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি নথিতে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে কোনো আইনি উত্তরাধিকার সনদ ছাড়াই নিঃসন্তান দেখিয়ে ভুয়া কাগজ বানানো হয়। শুরুতে আইনি জটিলতার অজুহাতে আটকে রাখা হলেও পরবর্তীতে ৫ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নামজারিটি অনুমোদন পায়। এছাড়া সম্প্রতি ভূমি সেবা মেলায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের দায়ে নাজির নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও থামেনি অনৈতিক বাণিজ্য। ক্যাডার কিরণ ও নোয়াখালীর হাসানের মাধ্যমে ভেতরে-বাইরে গড়ে তোলা কালেকশন পয়েন্টে টাকা পরিশোধ হলে ফাইলে পড়ে বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন—যা না থাকলে ফাইল কোনো কারণ ছাড়াই গায়েব করে দেওয়া হয়।
দৈনিক ‘সোনালী খবর’-এ এই চক্রের বিস্তারিত খতিয়ান প্রকাশ হলেও দমে যায়নি সিন্ডিকেটটি। বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংস্থার ভয় দেখিয়ে ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চক্রান্ত চলছে। সরকারি আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো মূল হোতা নাজমুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। এই প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর মাধ্যমে আইন অমান্য করে ৫ বছর একই স্থানে থাকা এমন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানসহ কঠোর শাস্তির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহল।



















