০৮:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

ভূমি সেবার আড়ালে ৫ বছরের সীমাহীন লুটপাট, এক নাজমুলেই স্থবির মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল

  • আপডেট: ০৭:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০৪

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

রাজধানীর মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন আর স্বাভাবিক জায়গায় নেই। তা রূপ নিয়েছে তীব্র আতঙ্ক, অন্তহীন ভোগান্তি আর সরাসরি জিম্মিদশার এক অন্ধকার অধ্যায়ে। সরকারি সকল বিধিমালা, প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন ও তোয়াক্কা না করে এই দপ্তরটিকে ঘুষ ও লুণ্ঠনের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে। এই পুরো দুর্নীতির নেটওয়ার্কের মূলে রয়েছেন কানুনগো নাজমুল। যিনি বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই সার্কেলে বহাল তবিয়তে থেকে নিজের একক প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্দিষ্ট একটি দপ্তরে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ঊর্ধ্বতন মহলে আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে রয়েছেন। সাবেক ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের ভুমি মন্ত্রীর এপিএসের সাথে কানুনগো নাজমুল এর ছিল গভীর সখ্যতা। যার প্রভাবে নাজমুল এত এত দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে চেয়ার আকড়ে ধরে রেখেছেন। এমনকি বদলি ঠেকাতে এবং একই চেয়ার ধরে রাখতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পেছনে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময় করেছেন বলেও মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। বদলি না হয়ে একই দপ্তরে পদোন্নতি পেয়ে পুনরায় একই আসনে আসীন হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের অধীনস্থ দুটি প্রধান ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ক্ষমতার বলয়। পুরো কার্যালয়টিকে সচল রাখতে ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুষের অর্থ সংগ্রহ করতে কানুনগো নাজমুল তাঁর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ২২ জনের একটি শক্তিশালী বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদার বাহিনী গড়ে তুলেছেন। এই বহিরাগত চক্রটি পুরো দপ্তরের স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভূমি মালিকদের জিম্মি করে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। সেবাপ্রত্যাশীরা জমিজমার নামজারি কিংবা কোনো কারণে সৃষ্ট মিস কেস নিষ্পত্তির জন্য এলেই পদে পদে কৃত্রিম জটিলতার সম্মুখীন হন। সাধারণ একটি ফাইলকে জটিল বানিয়ে তোলা, অহেতুক বিভেদ তৈরি করা এবং পরবর্তীতে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে নির্দিষ্ট হারে ঘুষের টাকা নির্ধারণ করে দেয় এই চক্রটি। নির্ধারিত টাকা না দিলে বা ঘুষের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভূমির মালিকদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, এমনকি অনেক সময় কারণ ছাড়াই ফাইল উধাও করে দেওয়া হয়। ঘুষের টাকা হাতে পেলেই কেবল ফাইলের গতি ফেরে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন মেলে। এই ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপ্তি নিয়ে কানুনগো নাজমুলের নিজের ভাষ্যও অত্যন্ত বিস্ময়কর। বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী নাজমুল নিজেই দাবি করেন যে এই ঘুষের অর্থ কেবল তাঁর পকেটেই যায় না বরং রাজস্ব প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই তাঁকে এই পুরো রাজত্ব চালাতে হয়। ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কোনো সুরাহা না পেয়ে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং চক্রটির বেঁধে দেওয়া রেট অনুযায়ীই বাধ্য হয়ে ঘুষ গুনে যাচ্ছেন। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের এই বিশাল দুর্নীতি সাম্রাজ্যে কেবল নাজমুল একা নন, তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থাকা এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। দপ্তরের অভ্যন্তরে সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান এবং সদ্য পদোন্নতি পাওয়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নাজমুলের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডে সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়ে আসছেন। এদের পাশাপাশি নামজারি প্রক্রিয়ার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন নামজারি সহকারী খাদিজা। খাদিজা বিগত সরকার আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ রেখে সম্পূর্ণ দপ্তরটি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিতর্কিত সাবেক কমিশনার মানিকের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি অফিসে একক প্রভাব খাটাতেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত আছেন অফিস সহকারী রাকিব, যাকে দপ্তরের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে সবাই চেনে। রাকিবের সবুজ সংকেত কিংবা অনুমতি ছাড়া টেবিলে থাকা কোনো নথিপত্র এক ইঞ্চিও নড়ে না। একই সঙ্গে স্থানীয় ভূমিদস্যু, জালিয়াত চক্র ও দালালদের সঙ্গে রাকিবের রয়েছে নিবিড় ও প্রত্যক্ষ মেলবন্ধন। মাঠপর্যায়ে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়াটি চালনা করেন মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান এবং ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা সঞ্জীব। তাঁরা ‘লাইন’ নামক বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ পকেটস্থ করছেন। অন্যদিকে পুরো দপ্তরে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার জন্য নিয়োজিত রাখা হয়েছে ওমেদার ও দালালদের সুবিশাল নেটওয়ার্ক। মতিঝিল অফিসে সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান এবং ধনিয়া অফিসে হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির নামের দালালরা প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে মানুষকে জিম্মি করছে এবং টাকা আদায় করছে। সার্কেলটির কাজের ধরন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও উদ্বেগজনক। দিনে লোকদেখানো দাপ্তরিক কার্যক্রমের মহড়া পরিচালিত হলেও মূলত প্রকৃত অপকর্ম শুরু হয় রাতের অন্ধকারে। কার্যালয় ছুটির পর বাতি জ্বালিয়ে চলে নথিপত্র গোপন করা, জাল কাগজ তৈরি এবং অনৈতিক অর্থ লেনদেনের রমরমা উৎসব। যাতে এসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা ফুটেজ অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য আগেই পুরো দপ্তরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। অতি সম্প্রতি মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি নথিতে জালিয়াতির এক বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে। সেখানে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে কোনো প্রকার বৈধ ও আইনি উত্তরাধিকার সনদ ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ‘নিঃসন্তান’ দেখিয়ে ভুয়া দলিলপত্র প্রস্তুত করা হয়। প্রথমদিকে আইনি ঝামেলার দোহাই দিয়ে ফাইলটি আটকে রাখা হলেও পরবর্তীতে ৫ লক্ষ টাকা ঘুসের বিনিময়ে তা দ্রুত মঞ্জুর ও অনুমোদন দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ভূমি সেবা মেলায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নাজির নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও সার্কেলে ঘুস বাণিজ্য বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্যাডার কিরণ এবং নোয়াখালীর হাসানের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভেতরে ও বাইরে একাধিক ‘কালেকশন পয়েন্ট’ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ঘুসের নির্ধারিত টাকা জমা হলে ফাইলে একটি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড বসিয়ে দেওয়া হয়, যার অর্থ ফাইলটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এই কোড বা চিহ্ন না থাকলে যে কোনো বৈধ আবেদনও কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গায়েব বা বিনষ্ট করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নামজারি বাণিজ্য, জালিয়াতি ও নথিপত্র উধাও করার মাধ্যমে কানুনগো নাজমুল অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। নিজের এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা লুকানোর জন্য তিনি অত্যন্ত চতুর ও জালিয়াতিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছেন। রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে ভৈরবের বিশিষ্ট শিল্পপতি হাজী ফুল মিয়ার একটি সুবিশাল ও বিলাসবহুল বাড়ি এককালীন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পরিশোধ করে নিজের নামে কিনে নিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, প্রশাসনের নজর এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বাবুবাজার ব্রিজের কাছাকাছি এলাকায় নিজের সহোদর বোনের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যমানের এক বহুতল ভবন। এই চক্রের বিশদ অনুসন্ধানী খতিয়ান দৈনিক ‘সোনালী খবর’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলেও সিন্ডিকেটটি তাদের বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করেনি। উল্টো ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও নিজেদের আড়াল করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারি নিয়মকানুন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে এখন ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন সাধারণ ভূমি মালিক ও ভুক্তভোগীরা। এমন চরম দুর্নীতির প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ সেবাপ্রত্যাশী ও স্থানীয় জনগণ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি সংস্কার বোর্ড এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সমন্বয়ে এক জরুরি যৌথ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সচেতন মহল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও দুদকের মতো তদারকি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একই স্থানে থেকে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া নাজমুল সহ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের অবৈধ সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান এবং দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ শাস্তির জোর দাবি প্রকাশ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

ভূমি সেবার আড়ালে ৫ বছরের সীমাহীন লুটপাট, এক নাজমুলেই স্থবির মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল

আপডেট: ০৭:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

রাজধানীর মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন আর স্বাভাবিক জায়গায় নেই। তা রূপ নিয়েছে তীব্র আতঙ্ক, অন্তহীন ভোগান্তি আর সরাসরি জিম্মিদশার এক অন্ধকার অধ্যায়ে। সরকারি সকল বিধিমালা, প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন ও তোয়াক্কা না করে এই দপ্তরটিকে ঘুষ ও লুণ্ঠনের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে। এই পুরো দুর্নীতির নেটওয়ার্কের মূলে রয়েছেন কানুনগো নাজমুল। যিনি বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই সার্কেলে বহাল তবিয়তে থেকে নিজের একক প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্দিষ্ট একটি দপ্তরে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ঊর্ধ্বতন মহলে আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে রয়েছেন। সাবেক ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের ভুমি মন্ত্রীর এপিএসের সাথে কানুনগো নাজমুল এর ছিল গভীর সখ্যতা। যার প্রভাবে নাজমুল এত এত দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে চেয়ার আকড়ে ধরে রেখেছেন। এমনকি বদলি ঠেকাতে এবং একই চেয়ার ধরে রাখতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পেছনে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময় করেছেন বলেও মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। বদলি না হয়ে একই দপ্তরে পদোন্নতি পেয়ে পুনরায় একই আসনে আসীন হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের অধীনস্থ দুটি প্রধান ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ক্ষমতার বলয়। পুরো কার্যালয়টিকে সচল রাখতে ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুষের অর্থ সংগ্রহ করতে কানুনগো নাজমুল তাঁর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ২২ জনের একটি শক্তিশালী বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদার বাহিনী গড়ে তুলেছেন। এই বহিরাগত চক্রটি পুরো দপ্তরের স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভূমি মালিকদের জিম্মি করে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। সেবাপ্রত্যাশীরা জমিজমার নামজারি কিংবা কোনো কারণে সৃষ্ট মিস কেস নিষ্পত্তির জন্য এলেই পদে পদে কৃত্রিম জটিলতার সম্মুখীন হন। সাধারণ একটি ফাইলকে জটিল বানিয়ে তোলা, অহেতুক বিভেদ তৈরি করা এবং পরবর্তীতে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে নির্দিষ্ট হারে ঘুষের টাকা নির্ধারণ করে দেয় এই চক্রটি। নির্ধারিত টাকা না দিলে বা ঘুষের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভূমির মালিকদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, এমনকি অনেক সময় কারণ ছাড়াই ফাইল উধাও করে দেওয়া হয়। ঘুষের টাকা হাতে পেলেই কেবল ফাইলের গতি ফেরে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন মেলে। এই ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপ্তি নিয়ে কানুনগো নাজমুলের নিজের ভাষ্যও অত্যন্ত বিস্ময়কর। বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী নাজমুল নিজেই দাবি করেন যে এই ঘুষের অর্থ কেবল তাঁর পকেটেই যায় না বরং রাজস্ব প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই তাঁকে এই পুরো রাজত্ব চালাতে হয়। ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কোনো সুরাহা না পেয়ে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং চক্রটির বেঁধে দেওয়া রেট অনুযায়ীই বাধ্য হয়ে ঘুষ গুনে যাচ্ছেন। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের এই বিশাল দুর্নীতি সাম্রাজ্যে কেবল নাজমুল একা নন, তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থাকা এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। দপ্তরের অভ্যন্তরে সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান এবং সদ্য পদোন্নতি পাওয়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নাজমুলের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডে সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়ে আসছেন। এদের পাশাপাশি নামজারি প্রক্রিয়ার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন নামজারি সহকারী খাদিজা। খাদিজা বিগত সরকার আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ রেখে সম্পূর্ণ দপ্তরটি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিতর্কিত সাবেক কমিশনার মানিকের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি অফিসে একক প্রভাব খাটাতেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত আছেন অফিস সহকারী রাকিব, যাকে দপ্তরের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে সবাই চেনে। রাকিবের সবুজ সংকেত কিংবা অনুমতি ছাড়া টেবিলে থাকা কোনো নথিপত্র এক ইঞ্চিও নড়ে না। একই সঙ্গে স্থানীয় ভূমিদস্যু, জালিয়াত চক্র ও দালালদের সঙ্গে রাকিবের রয়েছে নিবিড় ও প্রত্যক্ষ মেলবন্ধন। মাঠপর্যায়ে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়াটি চালনা করেন মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান এবং ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা সঞ্জীব। তাঁরা ‘লাইন’ নামক বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ পকেটস্থ করছেন। অন্যদিকে পুরো দপ্তরে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার জন্য নিয়োজিত রাখা হয়েছে ওমেদার ও দালালদের সুবিশাল নেটওয়ার্ক। মতিঝিল অফিসে সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান এবং ধনিয়া অফিসে হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির নামের দালালরা প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে মানুষকে জিম্মি করছে এবং টাকা আদায় করছে। সার্কেলটির কাজের ধরন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও উদ্বেগজনক। দিনে লোকদেখানো দাপ্তরিক কার্যক্রমের মহড়া পরিচালিত হলেও মূলত প্রকৃত অপকর্ম শুরু হয় রাতের অন্ধকারে। কার্যালয় ছুটির পর বাতি জ্বালিয়ে চলে নথিপত্র গোপন করা, জাল কাগজ তৈরি এবং অনৈতিক অর্থ লেনদেনের রমরমা উৎসব। যাতে এসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা ফুটেজ অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য আগেই পুরো দপ্তরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। অতি সম্প্রতি মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি নথিতে জালিয়াতির এক বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে। সেখানে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে কোনো প্রকার বৈধ ও আইনি উত্তরাধিকার সনদ ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ‘নিঃসন্তান’ দেখিয়ে ভুয়া দলিলপত্র প্রস্তুত করা হয়। প্রথমদিকে আইনি ঝামেলার দোহাই দিয়ে ফাইলটি আটকে রাখা হলেও পরবর্তীতে ৫ লক্ষ টাকা ঘুসের বিনিময়ে তা দ্রুত মঞ্জুর ও অনুমোদন দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ভূমি সেবা মেলায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নাজির নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও সার্কেলে ঘুস বাণিজ্য বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্যাডার কিরণ এবং নোয়াখালীর হাসানের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভেতরে ও বাইরে একাধিক ‘কালেকশন পয়েন্ট’ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ঘুসের নির্ধারিত টাকা জমা হলে ফাইলে একটি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড বসিয়ে দেওয়া হয়, যার অর্থ ফাইলটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এই কোড বা চিহ্ন না থাকলে যে কোনো বৈধ আবেদনও কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গায়েব বা বিনষ্ট করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নামজারি বাণিজ্য, জালিয়াতি ও নথিপত্র উধাও করার মাধ্যমে কানুনগো নাজমুল অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। নিজের এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা লুকানোর জন্য তিনি অত্যন্ত চতুর ও জালিয়াতিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছেন। রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে ভৈরবের বিশিষ্ট শিল্পপতি হাজী ফুল মিয়ার একটি সুবিশাল ও বিলাসবহুল বাড়ি এককালীন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পরিশোধ করে নিজের নামে কিনে নিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, প্রশাসনের নজর এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বাবুবাজার ব্রিজের কাছাকাছি এলাকায় নিজের সহোদর বোনের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যমানের এক বহুতল ভবন। এই চক্রের বিশদ অনুসন্ধানী খতিয়ান দৈনিক ‘সোনালী খবর’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলেও সিন্ডিকেটটি তাদের বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করেনি। উল্টো ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও নিজেদের আড়াল করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারি নিয়মকানুন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে এখন ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন সাধারণ ভূমি মালিক ও ভুক্তভোগীরা। এমন চরম দুর্নীতির প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ সেবাপ্রত্যাশী ও স্থানীয় জনগণ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি সংস্কার বোর্ড এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সমন্বয়ে এক জরুরি যৌথ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সচেতন মহল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও দুদকের মতো তদারকি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একই স্থানে থেকে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া নাজমুল সহ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের অবৈধ সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান এবং দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ শাস্তির জোর দাবি প্রকাশ করেছেন।