ঘুষখোর এসিল্যান্ড রেফাঈ’র খুটির জোর কোথায়
- আপডেট: ০৭:০৯:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- / ১৮০০৭
নামজারি ও মিসকেসে বিভেদ তৈরি করে ঘুষ আদায় , নিজের ইচ্ছেমত দালাল কথিত ওমেদার নিয়োগ , প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম চালানো
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল এখন আর কোনো সাধারণ সরকারি সেবা কেন্দ্র নেই বরং এটি রূপ নিয়েছে একচ্ছত্র ও ভয়াবহ এক ঘুষ সাম্রাজ্যে যেখানে প্রজাতন্ত্রের আইন, বিধি ও সেবার নূন্যতম বালাই নেই। এই পুরো অন্ধকার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ৩৮তম ব্যাচের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ রেফাঈ আবিদ। যিনি যোগদানের পর থেকেই পুরো প্রশাসনিক ক্ষমতাকে নিজের ব্যক্তিগত আয়ের একচেটিয়া হাতিয়ার বানিয়ে তুলেছেন। বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই কর্মকর্তা মতিঝিল ভূমি অফিসে গড়ে তুলেছেন এক সমান্তরাল রাজত্ব যেখানে প্রতিটি ফাইলের জন্য টেবিল মেপে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারিত। এই দুর্নীতিবাজ এসিল্যান্ডের মুখের কথাই সেখানে অঘোষিত ও চূড়ান্ত আইন হিসেবে গণ্য হয়। এই রাজত্বে সাধারণ জনগণের জমিজমার অধিকার বা বৈধ কাগজপত্র কোনো মূল্য বহন করে না বরং সেখানে বিক্রি হয় কেবল আবিদের আশীর্বাদ। এই আশীর্বাদ ধন্য হতে হলে সেবাপ্রত্যাশীদের গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। সরকারি নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এবং তার পরম আশ্রয়ে পুরো কার্যালয়টিকে নিজেদের পৈতিৃক সম্পত্তিতে পরিনত করেছে একদল বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদার যাদের মধ্যে আজিজ, সোহেল, রাব্বি, দবির এবং ফারুকের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই চক্রটিই মূলত পুরো মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলকে সাধারণ মানুষের জন্য এক জিম্মিদশার আখড়ায় রূপান্তর করেছে। এই বহিরাগত চক্রটি এসিল্যান্ডের আশকারা পেয়ে এতটাই বেপরোয়া যে তারা প্রতিদিন শত শত মানুষের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও জোরপূর্বক টাকা আদায় করে সরাসরি এসিল্যান্ড সৈয়দ রেফাঈ আবিদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে সাধারণ নাগরিকদের ওপর চালাচ্ছে মানসিক জুলুম ও হয়রানি। এসিল্যান্ড আবিদ এই ঘুষ লেনদেনের পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে ও গোপনীয়ভাবে পরিচালনা করেন। তিনি অফিসের ভেতরে তার জন্য নির্ধারিত খাস কামরায় বসে নির্দেশ দেন কার ফাইল পাস হবে আর কার ফাইল মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হবে। দিনের বেলা অফিস কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃত খেলা শুরু হয় অফিসের দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পর। যখন বাইরে থেকে মনে হয় অফিস সম্পূর্ণ বন্ধ কিন্তু ভেতরে লাইট জ্বালিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে ফাইলের স্তূপ আর অবৈধ টাকার বান্ডিল গোনার মহোৎসব। এই দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ আড়াল করতে কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পরিকল্পিতভাবে ঘুরিয়ে রাখা হয় যেন কোনো ভিডিও ফুটেজ বা অপরাধের চিহ্ন রেকর্ডেড না থাকে। এই বিশাল ঘুষ বাণিজ্যের অর্থ সংগ্রহের জন্য এসিল্যান্ড আবিদ তাঁর নিজস্ব একটি ক্যাডার ও দালাল বাহিনী লালন-পালন করেন যার মধ্যে তাঁর পোষ্য সন্ত্রাসী কিরণ এবং নোয়াখালীর হাসান নামের দালালরা নিয়মিতভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে সরাসরি এসিল্যান্ডের টেবিলে পৌঁছে দেয়। অফিসের ভেতরে এই ঘুষের টাকার লেনদেনের সার্বিক তদারকি নিশ্চিত করেন আবিদের সবচেয়ে বিশেষ বিশ্বস্ত লোক অফিস সহকারী রাকিব যার অনুমতি ছাড়া এই কার্যালয়ের কোনো ফাইলে হাত দেওয়ার দুঃসাহসও কেউ দেখায় না। এই সিন্ডিকেটের জাল এতটাই বিস্তৃত যে নামজারি সহকারী রাকিব ও খাদিজা এবং মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান ও সঞ্জীব ধনিয়া এই পুরো প্রক্রিয়ার মাঠ পর্যায়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। তারা ‘লাইন’ নামক একটি সুসংগঠিত চ্যানেলের মাধ্যমে সেবা নিতে আসা সাধারণ ভূমি মালিকদের পকেট কাটছেন। এই চক্রের অর্থলিপ্সা এবং এসিল্যান্ড আবিদের প্রশ্রয় কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা প্রমাণিত হয় সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রশাসনিক অ্যাকশনে। যেখানে ভূমি সেবা মেলায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যে অতিরিক্ত অর্থ ও অবৈধ ঘুষ গ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এসিল্যান্ডের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন তিন কর্মকর্তা সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান (যিনি এই অনিয়মের মধ্যেই সদ্য পদোন্নতি পেয়েছেন), কানুনগো নাজমুল (যিনি নিজের অবৈধ আয়ের ধারা সচল রাখতে এবং এই সার্কেলে নিজের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তদবিরের মাধ্যমে এখানেই রয়ে গিয়েছিলেন) এবং নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ভূমি মেলার মতো একটি উন্মুক্ত ও জনমুখী সরকারি আয়োজনেও এসিল্যান্ড আবিদের এই বিশ্বস্ত সহযোগীরা যেভাবে সাধারণ মানুষকে লুণ্ঠন করেছে তা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে চুনকালি লেপ্টে দিয়েছে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো মূল হোতা এসিল্যান্ড আবিদ এখনো বহাল তবিয়তে তার লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে এসিল্যান্ড সৈয়দ রেফাঈ আবিদের নিজের হাতে তৈরি করা একটি সুনির্দিষ্ট ও লিখিত গোপন ঘুষের রেট চার্টের সন্ধান মিলেছে যা তার অফিসে অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। এই রেট চার্ট অনুযায়ী ‘খ’ তফসিলভুক্ত যেকোনো ফাইলের জন্য নির্ধারিত ঘুষের পরিমাণ ৩০,০০০ টাকা যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১৪,০০০ টাকা সরাসরি চলে যায় এসিল্যান্ড আবিদের পকেটে। এছাড়া ‘পার্ট এলএ’ ও ‘পার্ট খাস’ জমির ফাইলের অনুমোদন পেতে হলে গুনতে হয় ১৬,০০০ টাকা যার মধ্যে ৭,০০০ টাকা এসিল্যান্ডের জন্য অবধারিতভাবে বরাদ্দ থাকে এবং সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষের হার ৮,৫০০ টাকা ধার্য করা হলেও জমির পরিমাণ ১০ শতকের বেশি হলেই এই ঘুষের অংক মুহূর্তের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়। যেকোনো সাধারণ বা ছোটখাটো আবেদনের জন্য সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা দিতে হয় যার মধ্যে মাত্র ১০ শতক জমির জন্য এসিল্যান্ডের নিজস্ব ভাগ ২,০০০ টাকা এবং ১০ শতকের বেশি হলে তাঁর ভাগের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। শিল্পসমৃদ্ধ শ্যামপুর এলাকার শিল্প প্লটের ফাইলের অনুমোদন দেওয়ার জন্য কেবল এসিল্যান্ড আবিদকেই দিতে হয় এককালীন ২০,০০০ টাকা এবং কোনো মিসকেসের ফাইল উত্থাপিত হলেই তার ধরণ ও গুরুত্ব বিবেচনা করে ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়। ঘুষ লেনদেনের এই সমস্ত ভয়ংকর প্রমাণ গোপন রাখতে এবং কারা টাকা দিয়েছে তা নিশ্চিত করতে এসিল্যান্ড আবিদ ফাইলে একটি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা ‘বিশেষ চিহ্ন ব্যবস্থা’ ব্যবহার করেন। যে সমস্ত ফাইলে বা আবেদনে এই সুনির্দিষ্ট চিহ্নটি অনুপস্থিত থাকে সেগুলো কোনো কারণ ছাড়াই সরাসরি নামঞ্জুর করে দেওয়া হয়। এই অর্থলোভী কর্মকর্তার চাহিদামতো পর্যাপ্ত ঘুষের টাকা না দেওয়ায় এবং নির্ধারিত রেটের চেয়ে কম টাকা প্রস্তাব করায় নামজারি কেস নং ৪৮৩৮ ও ৪২৮৮ (২৫/২৬) এবং ১২৩৫/২৫-২৬ নম্বর কেসটি যা সিটি নামজারি থেকে নামজারি কর্তন হওয়ার কথা ছিল তা নামঞ্জুর করে দেন এই ঘুষখোর এসিল্যান্ড। এই ভয়ংকর দুর্নীতির খবর ও এসিল্যান্ড আবিদের নজিরবিহীন ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে এর আগে গত ১২ নভেম্বর ২০২৫ এবং ২১ জুন ২০২৬ইং তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘সোনালী খবর’-এর প্রথম পাতায় ২টি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও উচ্চতর প্রশাসন থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এই কর্মকর্তা এখন আরও বেপরোয়া ও অহংকারী হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের ও গুমের হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলেছেন যে তার বিরুদ্ধে পুনরায় সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে প্রতিবেদককে তুলে নিয়ে গিয়ে এমন জায়গায় গায়েব করে দেবেন যে কেউ তার খোঁজ পাবে না। প্রজাতন্ত্রের একজন সাধারণ বেতনভোগী কর্মচারী হয়ে সরকারের একাধিক সংবেদনশীল সংস্থাকে ব্যবহার করে একজন সাংবাদিককে গায়েব করার এই দুঃসাহস তিনি কোথা থেকে পাচ্ছেন তা নিয়ে সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাধারণ সেবাপ্রত্যাশিরা এখন জানতে চান যে এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদের এই অজানা খুটির জোর আসলে কোথায়। অনুসন্ধানে এর উত্তরও বেরিয়ে এসেছে যে এসিল্যান্ড আবিদ নিজেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের আত্মীয় ও তার বাবার বন্ধু বলে পরিচয় দিয়ে বেড়ান। এই প্রভাব খাটিয়েই তিনি সমস্ত অপকর্ম নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয় বর্তমান সরকার যখন দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান দেখাচ্ছে ঠিক সেই সময়েও আবিদ রেফাঈ মন্ত্রিপরিষদের অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করে চলেছেন। অনুসন্ধানে তার পারিবারিক ইতিহাস জানা যায় যে তার বাবাও বিগত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন কিন্তু নানা অনিয়ম, অনৈতিকতার অভিযোগের কারণে চাকরী জীবনের শেষ মুহুর্তে এসেও সচিব পদমর্যাদার পদে পদোন্নতি না পেয়েই চাকুরী থেকে অবসরে চলে যান। পিতার সেই কলঙ্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত উত্তরাধিকার বহন করেই পুত্র সৈয়দ রেফাঈ আবিদ আজ মতিঝিলের জনসাধারণের জন্য এক দুঃস্বপ্ন ও মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন। সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এই অর্থলোভী এসিল্যান্ডকে মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে ফাইল গায়েব হয়ে যায় বা বাতিল করে দেওয়া হয়, আর টাকা দিলেই সমস্ত অবৈধ কাজ মাত্র একদিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়। সরকারি সেবা যেখানে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা সেখানে এই মতিঝিল ভূমি অফিসটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক শোষণের উৎসে পরিণত হয়েছে। এই প্রশাসনিক দানব সৈয়দ রেফাঈ আবিদের বেপরোয়া ও জিম্মিদশার কারণে সরকারের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রকাশ্য লুণ্ঠনের অবসান ঘটিয়ে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং দেশের ভূমি সেবা খাতকে রক্ষা করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন এবং এসিল্যান্ড আবিদসহ এই চক্রের সাথে জড়িত প্রতিটি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চালিয়ে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তোভোগিরা।



















