ঘুষখোর এসিল্যান্ড রেফাঈ’র খুটির জোর কোথায়
- আপডেট: ০৯:২৭:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
- / ১৮০০৩
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
প্রজাতন্ত্রের আইন ও সেবামূলক বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলকে একচ্ছত্র লুণ্ঠনের চারণভূমিতে পরিণত করেছেন ৩৮তম ব্যাচের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ রেফাঈ আবিদ। যার যোগদানের পর থেকেই পুরো কার্যালয়টি সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। বর্তমান প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই এসিল্যান্ড প্রতিটি দাপ্তরিক ফাইলের জন্য টেবিল মেপে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণ করেছেন। যেখানে বৈধ নথিপত্রের কোনো মূল্য নেই এবং আবিদের মুখের কথাই অঘোষিত চূড়ান্ত আইন হিসেবে বলবৎ রয়েছে। এই চরম অরাজকতার মূল হোতা এসিল্যান্ড আবিদের প্রত্যক্ষ আশকারায় মতিঝিল ও ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস দুটিকে গ্রাস করেছে একদল বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদার। যারা পুরো অঞ্চলটিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে ফেলেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসটি এখন পুরোপুরি বহিরাগত দালাল কথিত ওমেদারদের নিয়ন্ত্রণে। যেখানে এসিল্যান্ডের ঘুষের মিশন সফল করতে মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক ও হাসানের মতো চক্র। একইভাবে ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও রাজত্ব চালাচ্ছে হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশিরের মতো কথিত ওমেদারদের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট যাদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ ভূমি মালিকরা প্রতিনিয়ত মানসিক ও আর্থিক জুলুমের শিকার হচ্ছেন। এই বহিরাগত দালালরা এসিল্যান্ডের ব্যক্তিগত ক্যাডার বাহিনীর মতো কাজ করে এবং প্রতিদিন সেবাপ্রত্যাশীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করে সরাসরি এসিল্যান্ড আবিদের টেবিলে পৌঁছে দেয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে বছরের পর বছর ভুমি অফিসে কর্মকর্তা বদলি হয়ে আসলেও কথিত এই দালাল পরিবর্তন হয়না। এরা আসলেই ভুমি অফিসের কে? তা জানতে চায় সেবা প্রত্যাশিরা। এই সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও অর্থলোভের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি কেসের একটি চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনায়। যেখানে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে সম্পূর্ণ নিঃসন্তান দেখিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের কোনো প্রকার সাকসেশন (উত্তরাধিকার) সার্টিফিকেট ছাড়াই মাত্র একজন ওয়ারিশান দাঁড় করিয়ে বিশাল জালিয়াতির ছক কষা হয়। প্রথমে আইনি জটিলতা ও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এই ফাইলটি একাধিকবার নামঞ্জুর করা হলেও পরবর্তীতে পর্দার আড়ালে ৫ লক্ষ টাকা মোটা অঙ্কের ঘুষের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই বিতর্কিত ও অবৈধ এই নামজারিটি রাতারাতি অনুমোদন করে দেন এই অর্থলোভী এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদ যা তার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। এই পুরো সার্কেলের ঘুষের লেনদেন ও অভ্যন্তরীণ ফাইল নিয়ন্ত্রণের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে এসিল্যান্ডের পরম বিশ্বস্ত অফিস সহকারী রাকিব, যার সবুজ সংকেত ছাড়া কার্যালয়ের কোনো ফাইলে হাত দেওয়ার দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারে না। এই চক্রের মাঠপর্যায়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন নামজারি সহকারী খাদিজা, মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান এবং সঞ্জীব ধনিয়া, যারা ‘লাইন’ নামক একটি সুসংগঠিত চ্যানেলের মাধ্যমে সেবাপ্রত্যাশীদের পকেট কেটে চলছেন। দিনের বেলা এই কার্যালয়ে সরকারি নিয়মের নাটক চললেও আসল কর্মযজ্ঞ শুরু হয় দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পর, যখন বাইরে থেকে অফিস বন্ধ মনে হলেও ভেতরে গভীর রাত পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে চলে ফাইলের স্তূপ আর অবৈধ টাকার বান্ডিল গোনার মহোৎসব। এই সমস্ত অপরাধের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ আড়াল করতে কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সুকৌশলে ঘুরিয়ে রাখা হয়। এসিল্যান্ডের এই ঘুষ সাম্রাজ্যের জাল এতটাই বিস্তৃত যে সম্প্রতি ভূমি সেবা মেলায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের নামে অতিরিক্ত অর্থ ও অবৈধ ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা সদ্য পদোন্নতি পাওয়া সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান, কানুনগো নাজমুল (যিনি নিজের অবৈধ আয়ের ধারা সচল রাখতে ও এই সার্কেলে বদলি ঠেকাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে)। তাছাড়া নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একটি উন্মুক্ত ও জনমুখী সরকারি মেলায় তার বিশ্বস্ত সহযোগীরা হাতেনাতে ধরা পড়লেও মূল হোতা এসিল্যান্ড আবিদ তার নিজস্ব পোষ্য সন্ত্রাসী কিরণ ও নোয়াখালীর হাসানকে দিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে একাধিক ‘ঘুষ কালেকশন পয়েন্ট’ সচল রেখে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে এসিল্যান্ড আবিদের নিজস্ব তৈরি একটি গোপন ‘ঘুষের রেট চার্ট’ পাওয়া গেছে, যেখানে ‘খ’ তফসিলভুক্ত ফাইলের জন্য ৩০,০০০ টাকা (যার ১৪,০০০ টাকা সরাসরি আবিদের পকেটে যায়), ‘পার্ট এলএ’ ও ‘পার্ট খাস’ জমির অনুমোদনে ১৬,০০০ টাকা (এসিল্যান্ডের ভাগ ৭,০০০ টাকা), এবং সাধারণ নামজারিতে ৮,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে যা জমির পরিমাণ ১০ শতকের বেশি হলেই জ্যামিতিক হারে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এছাড়া শ্যামপুর এলাকার শিল্প প্লটের জন্য এককালীন ২০,০০০ টাকা এবং ছোটখাটো সাধারণ আবেদনেও ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা ঘুষ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং এই ঘুষের টাকা নিশ্চিত করতে ফাইলে একটি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা ‘বিশেষ চিহ্ন ব্যবস্থা’ ব্যবহার করা হয়, যা না থাকলে ফাইলটি কোনো কারণ ছাড়াই বাতিল করে দেওয়া হয়। এই ভয়ংকর দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে ইতিপূর্বে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর এবং ২০২৬ সালের ২১ জুন দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘সোনালী খবর’-এর প্রথম পাতায় দুটি তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও উচ্চতর প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই কর্মকর্তা আরও বেশি বেপরোয়া ও অহংকারী হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে চরম প্রভাবশালী দাবি করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন এবং দম্ভ করে বলছেন যে, তার বিরুদ্ধে পুনরায় সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাংবাদিককে এমন জায়গায় গায়েব করে দেবেন যে তার লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না। একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী হয়ে রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল সংস্থাগুলোর নাম ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার এই দুঃসাহস তিনি কোথা থেকে পাচ্ছেন তা নিয়ে সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেবাপ্রত্যাশীরা জানতে চান তার এই অজানা খুঁটির জোর আসলে কোথায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে এসিল্যান্ড আবিদ নিজেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও তার বাবার বন্ধু বলে পরিচয় দিয়ে বেড়ান। এই রাজনৈতিক প্রভাবের মিথ্যা বুলি আউড়ে মন্ত্রিপরিষদের অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছেন। তার পারিবারিক ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, তার বাবাও বিগত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন যিনি নানা অনিয়ম ও অনৈতিকতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কর্মজীবনের শেষ মুহূর্তে এসে সচিব পদমর্যাদায় পদোন্নতি না পেয়েই চরম গ্লানি নিয়ে চাকরি থেকে অবসরে যান এবং পিতার সেই কলঙ্কিত উত্তরাধিকার বহন করেই পুত্র সৈয়দ রেফাঈ আবিদ আজ মতিঝিলের জনগণের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছেন। সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে যেখানে ফাইল গায়েব বা বাতিল করে দেওয়া হয়, আর টাকা দিলে সমস্ত অবৈধ কাজ মাত্র একদিনে সম্পন্ন হয়, সেই লুণ্ঠন ও জিম্মিদশার অবসান ঘটাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারের সর্বোচ্চ মহলের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ, জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন এবং এসিল্যান্ড আবিদসহ এই চক্রের প্রতিটি সদস্যের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চালিয়ে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।



















