১১:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন দিগন্ত: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বে এনসিটি

  • আপডেট: ১০:০৯:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • / ১৮০০৩

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর

দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এনসিটি ২০১৭ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম শুরু করে। তবে বর্তমানে টার্মিনালটি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ৯৩ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন হলেও এনসিটিতে তা বর্তমানে ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।

সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে এনসিটিতে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি। ফলে জাহাজের গড় অবস্থানকাল দীর্ঘ হচ্ছে। এতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে এনসিটিতে অত্যাধুনিক টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা, স্মার্ট সফটওয়্যার এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর প্রযুক্তি যুক্ত হবে। একই সঙ্গে তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভ্যাসেল পাঠাতে আগ্রহী হবে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুযায়ী বন্দরের জমি, জেটি ও অবকাঠামোর মূল মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরিচালনার লাইসেন্স পাবে।

এছাড়া বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বহির্নোঙর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবহৃত প্রতিটি তথ্য ও সিসিটিভি ফিড তাৎক্ষণিকভাবে কাস্টমস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্সের উৎস। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। দুই দেশের বর্তমান ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব সফল হলে ভবিষ্যতে বে-টার্মিনাল বা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বৃহৎ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা আরও সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু একটি টার্মিনাল পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তর এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন দিগন্ত: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বে এনসিটি

আপডেট: ১০:০৯:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর

দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এনসিটি ২০১৭ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম শুরু করে। তবে বর্তমানে টার্মিনালটি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ৯৩ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন হলেও এনসিটিতে তা বর্তমানে ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।

সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে এনসিটিতে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি। ফলে জাহাজের গড় অবস্থানকাল দীর্ঘ হচ্ছে। এতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে এনসিটিতে অত্যাধুনিক টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা, স্মার্ট সফটওয়্যার এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর প্রযুক্তি যুক্ত হবে। একই সঙ্গে তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভ্যাসেল পাঠাতে আগ্রহী হবে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুযায়ী বন্দরের জমি, জেটি ও অবকাঠামোর মূল মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরিচালনার লাইসেন্স পাবে।

এছাড়া বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বহির্নোঙর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবহৃত প্রতিটি তথ্য ও সিসিটিভি ফিড তাৎক্ষণিকভাবে কাস্টমস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্সের উৎস। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। দুই দেশের বর্তমান ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব সফল হলে ভবিষ্যতে বে-টার্মিনাল বা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বৃহৎ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা আরও সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু একটি টার্মিনাল পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তর এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ।