১১:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জিয়া পরিবারের তিন অধ্যায়ঃ একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

  • আপডেট: ১১:০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০০১

মোহাম্মদ আব্দুল হালিম

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক ইতিহাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন শীতল যুদ্ধ, উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বৈষম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। পরবর্তী চার দশকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে—কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে।

মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের বক্তব্যে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি আপোষহীন নেত্রী ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ১৯৯৩, ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালের বক্তব্যে পানি, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সংস্কার, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকারের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।

২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে এই ঐতিহাসিক ধারার একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়। তাঁর বক্তব্যে সংঘাত নিরসনে কূটনীতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ফিলিস্তিন, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, প্রযুক্তি, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের বিষয় উঠে আসে। “জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্ম” কথাটি আক্ষরিক বংশগত অর্থে ব্যবহার করলেও তা প্রাসঙ্গিক এবং এটিকে বাংলাদেশের জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক কূটনীতিতে তিনটি রাজনৈতিক সময়পর্ব ও তিনটি নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা অধিকতর গবেষণাসঙ্গত।

জিয়াউর রহমান: নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার

১৯৮০ সালের আগস্ট। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র নয় বছর হয়েছে। রাষ্ট্রটি তখনও অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও ছিল শীতল যুদ্ধের দ্বন্দ্বে বিভক্ত। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন যে পূর্ববর্তী বিশেষ অধিবেশনগুলোর পরও এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক অবস্থান ছিল। কারণ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, খাদ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ব্যাপক দারিদ্র্যের মধ্যে রাষ্ট্রকে উন্নয়ন করতে হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অসমতা বাংলাদেশের জন্য নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছিল না। এটি ছিল উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জিয়াউর রহমানের সময়ের কূটনৈতিক চিন্তাকে তাই তিনটি স্তরে পড়া যায়: প্রথমত, রাষ্ট্রের সার্বভৌম অস্তিত্ব ও স্বার্থ। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অধিকার। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস। এখানে জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়—এমন ধারণা সামনে আসে।
খালেদা জিয়া: জাতীয় স্বার্থের কূটনীতিতে পানি, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ের পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। নদীর পানি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘের বক্তব্যগুলোর মধ্যে ১৯৯৫ সালের বক্তব্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জাতিসংঘের সংস্কার, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা এবং গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নকে একই কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনেন। তিনি বাংলাদেশের গঙ্গার পানির অংশের প্রশ্নটিকে কেবল ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; এর সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে যুক্ত করেছেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্যে ফারাক্কা ও পানির প্রবাহের ফলে খরা, বন্যা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রভাবের বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা দেখা যায়: জাতীয় স্বার্থ → আন্তর্জাতিক আইন → বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও কাঠামোকে ব্যবহার করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়। তিনি একই বক্তব্যে জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা জোরদারের পক্ষে অবস্থান নেন। এই অবস্থানকে বাংলাদেশের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক যুক্তি পাওয়া যায়: শক্তির ভারসাম্য যেখানে অসম, সেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান ছোট রাষ্ট্রের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।

খালেদা জিয়ার ২০০৫: উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ ও জাতিসংঘ সংস্কারের বিস্তৃত এজেন্ডা

২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আবার পরিবর্তিত হয়েছিল। ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ২০০৫ সালের সাধারণ পরিষদ ভাষণে জাতিসংঘ সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের বিষয় গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘের সরকারি রেকর্ডে তিনি বলেন যে বিশ্বায়নের যুগে সমস্যাগুলো জাতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে এবং জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে ১৯৮০-এর দশকের তুলনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাষার একটি বিস্তার দেখা যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রধান প্রশ্ন ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও উন্নয়ন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ২০০৫ সালের বক্তব্যে সেই উন্নয়ন-চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়: সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, মানবাধিকার, পরিবেশ, জাতিসংঘ সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোচনাও অর্থনৈতিক প্রশ্ন থেকে বহুমাত্রিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দিকে বিস্তৃত হয়।
২০২৬: তারেক রহমান এবং তৃতীয় রাজনৈতিক অধ্যায়
২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম সাধারণ পরিষদ ভাষণ এবং তাঁর পিতা ও মায়ের পর পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য। এবারের আন্তর্জাতিক পরিবেশ ১৯৮০ কিংবা ২০০৫ সালের তুলনায় ভিন্ন। বিশ্ব রাজনীতিতে একদিকে যুদ্ধ ও সংঘাত, অন্যদিকে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তারেক রহমানের ভাষণেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। একই সঙ্গে তিনি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার কথা তুলে ধরেন। এখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণার সঙ্গে একটি বিষয়গত ধারাবাহিকতা দেখা যায়—তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত।

রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রোহিঙ্গা সংকট। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং এই সংকট বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর বক্তব্যে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে সংকটের সমাধানের কেন্দ্রীয় উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি একটি ধারাবাহিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯০-এর দশক থেকে মিয়ানমার-উৎপত্তি বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৬ সালে এসে এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়; মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই রোহিঙ্গা প্রশ্নটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ব—দুই দৃষ্টিকোণেই উপস্থাপিত হয়েছে।

ফিলিস্তিন, নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তিরক্ষা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এই অবস্থানের ঐতিহাসিক শিকড় বাংলাদেশের আগের কূটনৈতিক অবস্থানেও পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮০ সালেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে জাতিসংঘের নথিতে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার ও একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান সংরক্ষিত আছে। এখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান বিভিন্ন সরকারের সময়ে ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তিত হলেও আত্মনিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সমাধানের সমর্থন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়।

জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন শতাব্দীর জাতীয় স্বার্থ
বাংলাদেশের কূটনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন গত কয়েক দশকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অবস্থানের কূটনৈতিক যুক্তি হলো: বাংলাদেশের বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে—এমন দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে জলবায়ু কূটনীতি এখন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের একটি নতুন ক্ষেত্র। যেখানে একসময় গঙ্গার পানি ছিল জাতীয় স্বার্থের বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্ন, সেখানে এখন নদী, সমুদ্র, জলবায়ু, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশ পরস্পর সংযুক্ত।

অর্থনৈতিক কূটনীতি থেকে প্রযুক্তি কূটনীতি:

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে সেই অর্থনৈতিক প্রশ্ন নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রশ্ন তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন যে বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাজনে পরিণত না হয়। এখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন দেখা যায়। ১৯৮০-এর দশকে প্রশ্ন ছিল: উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে ন্যায্য সুযোগ পাবে? ২০২৬ সালে প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত: উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে প্রযুক্তিগত বিপ্লব থেকে পিছিয়ে না পড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পুরোনো প্রশ্নটি প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

নারী, যুবসমাজ ও মানবসম্পদ:

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের আরেকটি পরিবর্তিত ক্ষেত্র হলো নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, যুব কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণকেও তিনি ‘Women, Peace and Security’ এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি দেখায় যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় এখন শুধু “উন্নয়নশীল দেশ” বা “শান্তিরক্ষী দেশ” হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; মানবসম্পদ, নারী ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়ও বৈশ্বিক কূটনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
তিন সময়পর্বের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার প্রধান প্রেক্ষাপট ছিল শীতল যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত স্বার্থ তাঁর সময়ের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির প্রশ্নও গুরুত্ব পায়।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় যুক্ত হয় বিশ্বায়ন, জাতিসংঘ সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ ও উন্নয়নের মতো বিষয়। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে পানি, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশী সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইনকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়। দারিদ্র্য, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও পরিবেশের বিষয়ও তাঁর কূটনৈতিক আলোচনায় স্থান পায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি ও অর্থনীতি এতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সংঘাত সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতি, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নারী ও যুব ক্ষমতায়নের বিষয়ও উঠে এসেছে।
তিন সময়পর্বের মধ্যে মূল ধারাবাহিকতা হলো—জাতীয় স্বার্থ, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি গুরুত্ব। তবে সময়ের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও বদলেছে: জিয়াউর রহমানের সময়ে অর্থনৈতিক ন্যায়, খালেদা জিয়ার সময়ে পানি ও আন্তর্জাতিক আইন, আর বর্তমান পর্যায়ে রোহিঙ্গা, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন বৈশ্বিক ইস্যু সামনে এসেছে। এভাবে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন দেশের পরিবর্তিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, তিনটি সময়পর্বে বিষয়বস্তুর পরিবর্তন থাকলেও একটি কেন্দ্রীয় ধারণা বারবার ফিরে আসে—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা।

উত্তরাধিকার: ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিসংঘের মঞ্চে একই পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে সরাসরি তাঁর পিতা ও মায়ের জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করেছেন। কাল ভাষণের পাঠে তিনি বলেন যে এই বিশ্বমঞ্চে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে দাঁড়িয়েছেন। বক্তব্যের বিষয়বস্তু শুধু পারিবারিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এতে বাংলাদেশের সমকালীন রাষ্ট্রীয় স্বার্থ—রোহিঙ্গা, জলবায়ু, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও অর্থনীতি—একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। জাতিসংঘের মঞ্চে একই পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতি একটি ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছে।

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের দ্বৈততা:

তিনটি সময়পর্বের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তন একই সঙ্গে বিদ্যমান। জাতীয় স্বার্থের ওপর জোর, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে সমর্থন, উন্নয়ন ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষনে ধারাবাহিকতা ছিল। আবার ১৯৮০ এ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ১৯৯০-এর দশকে পানি ও আন্তর্জাতিক আইন, ২০০৫ এ সন্ত্রাসবাদ, উন্নয়ন ও জাতিসংঘ সংস্কার এবং ২০২৬ এ রোহিঙ্গা, জলবায়ু, AI, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও মানবিক নিরাপত্তা জোড়ালো বিষয় ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের কূটনৈতিক এজেন্ডা স্থির নয়; আন্তর্জাতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে তা নতুন বিষয় গ্রহণ করেছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, এবং খালেদা জিয়া থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এই তিন রাজনৈতিক অধ্যায়কে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের মৌলিক কিছু প্রশ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলেও সেগুলোর আন্তর্জাতিক ভাষা পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় প্রশ্ন ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশীদারিত্বের; পরে প্রশ্ন হয়েছে পানি ও আন্তর্জাতিক আইনের; আর আজকের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু, বাস্তুচ্যুতি, প্রযুক্তি ও মানবিক নিরাপত্তা। এই অর্থে জাতিসংঘের মঞ্চে জিয়া পরিবারের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পারিবারিক অধ্যায় হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বিবর্তন পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা।

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জিয়া পরিবারের তিন অধ্যায়ঃ একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

আপডেট: ১১:০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোহাম্মদ আব্দুল হালিম

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক ইতিহাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন শীতল যুদ্ধ, উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বৈষম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। পরবর্তী চার দশকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে—কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে।

মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের বক্তব্যে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি আপোষহীন নেত্রী ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ১৯৯৩, ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালের বক্তব্যে পানি, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সংস্কার, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকারের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।

২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে এই ঐতিহাসিক ধারার একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়। তাঁর বক্তব্যে সংঘাত নিরসনে কূটনীতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ফিলিস্তিন, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, প্রযুক্তি, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের বিষয় উঠে আসে। “জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্ম” কথাটি আক্ষরিক বংশগত অর্থে ব্যবহার করলেও তা প্রাসঙ্গিক এবং এটিকে বাংলাদেশের জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক কূটনীতিতে তিনটি রাজনৈতিক সময়পর্ব ও তিনটি নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা অধিকতর গবেষণাসঙ্গত।

জিয়াউর রহমান: নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার

১৯৮০ সালের আগস্ট। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র নয় বছর হয়েছে। রাষ্ট্রটি তখনও অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও ছিল শীতল যুদ্ধের দ্বন্দ্বে বিভক্ত। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন যে পূর্ববর্তী বিশেষ অধিবেশনগুলোর পরও এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক অবস্থান ছিল। কারণ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, খাদ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ব্যাপক দারিদ্র্যের মধ্যে রাষ্ট্রকে উন্নয়ন করতে হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অসমতা বাংলাদেশের জন্য নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছিল না। এটি ছিল উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জিয়াউর রহমানের সময়ের কূটনৈতিক চিন্তাকে তাই তিনটি স্তরে পড়া যায়: প্রথমত, রাষ্ট্রের সার্বভৌম অস্তিত্ব ও স্বার্থ। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অধিকার। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস। এখানে জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়—এমন ধারণা সামনে আসে।
খালেদা জিয়া: জাতীয় স্বার্থের কূটনীতিতে পানি, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ের পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। নদীর পানি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘের বক্তব্যগুলোর মধ্যে ১৯৯৫ সালের বক্তব্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জাতিসংঘের সংস্কার, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা এবং গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নকে একই কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনেন। তিনি বাংলাদেশের গঙ্গার পানির অংশের প্রশ্নটিকে কেবল ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; এর সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে যুক্ত করেছেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্যে ফারাক্কা ও পানির প্রবাহের ফলে খরা, বন্যা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রভাবের বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা দেখা যায়: জাতীয় স্বার্থ → আন্তর্জাতিক আইন → বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও কাঠামোকে ব্যবহার করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়। তিনি একই বক্তব্যে জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা জোরদারের পক্ষে অবস্থান নেন। এই অবস্থানকে বাংলাদেশের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক যুক্তি পাওয়া যায়: শক্তির ভারসাম্য যেখানে অসম, সেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান ছোট রাষ্ট্রের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।

খালেদা জিয়ার ২০০৫: উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ ও জাতিসংঘ সংস্কারের বিস্তৃত এজেন্ডা

২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আবার পরিবর্তিত হয়েছিল। ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ২০০৫ সালের সাধারণ পরিষদ ভাষণে জাতিসংঘ সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের বিষয় গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘের সরকারি রেকর্ডে তিনি বলেন যে বিশ্বায়নের যুগে সমস্যাগুলো জাতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে এবং জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে ১৯৮০-এর দশকের তুলনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাষার একটি বিস্তার দেখা যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রধান প্রশ্ন ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও উন্নয়ন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ২০০৫ সালের বক্তব্যে সেই উন্নয়ন-চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়: সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, মানবাধিকার, পরিবেশ, জাতিসংঘ সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোচনাও অর্থনৈতিক প্রশ্ন থেকে বহুমাত্রিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দিকে বিস্তৃত হয়।
২০২৬: তারেক রহমান এবং তৃতীয় রাজনৈতিক অধ্যায়
২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম সাধারণ পরিষদ ভাষণ এবং তাঁর পিতা ও মায়ের পর পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য। এবারের আন্তর্জাতিক পরিবেশ ১৯৮০ কিংবা ২০০৫ সালের তুলনায় ভিন্ন। বিশ্ব রাজনীতিতে একদিকে যুদ্ধ ও সংঘাত, অন্যদিকে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তারেক রহমানের ভাষণেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। একই সঙ্গে তিনি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার কথা তুলে ধরেন। এখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণার সঙ্গে একটি বিষয়গত ধারাবাহিকতা দেখা যায়—তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত।

রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রোহিঙ্গা সংকট। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং এই সংকট বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর বক্তব্যে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে সংকটের সমাধানের কেন্দ্রীয় উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি একটি ধারাবাহিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯০-এর দশক থেকে মিয়ানমার-উৎপত্তি বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৬ সালে এসে এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়; মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই রোহিঙ্গা প্রশ্নটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ব—দুই দৃষ্টিকোণেই উপস্থাপিত হয়েছে।

ফিলিস্তিন, নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তিরক্ষা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এই অবস্থানের ঐতিহাসিক শিকড় বাংলাদেশের আগের কূটনৈতিক অবস্থানেও পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮০ সালেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে জাতিসংঘের নথিতে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার ও একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান সংরক্ষিত আছে। এখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান বিভিন্ন সরকারের সময়ে ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তিত হলেও আত্মনিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সমাধানের সমর্থন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়।

জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন শতাব্দীর জাতীয় স্বার্থ
বাংলাদেশের কূটনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন গত কয়েক দশকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অবস্থানের কূটনৈতিক যুক্তি হলো: বাংলাদেশের বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে—এমন দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে জলবায়ু কূটনীতি এখন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের একটি নতুন ক্ষেত্র। যেখানে একসময় গঙ্গার পানি ছিল জাতীয় স্বার্থের বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্ন, সেখানে এখন নদী, সমুদ্র, জলবায়ু, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশ পরস্পর সংযুক্ত।

অর্থনৈতিক কূটনীতি থেকে প্রযুক্তি কূটনীতি:

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে সেই অর্থনৈতিক প্রশ্ন নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রশ্ন তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন যে বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাজনে পরিণত না হয়। এখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন দেখা যায়। ১৯৮০-এর দশকে প্রশ্ন ছিল: উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে ন্যায্য সুযোগ পাবে? ২০২৬ সালে প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত: উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে প্রযুক্তিগত বিপ্লব থেকে পিছিয়ে না পড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পুরোনো প্রশ্নটি প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

নারী, যুবসমাজ ও মানবসম্পদ:

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের আরেকটি পরিবর্তিত ক্ষেত্র হলো নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, যুব কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণকেও তিনি ‘Women, Peace and Security’ এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি দেখায় যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় এখন শুধু “উন্নয়নশীল দেশ” বা “শান্তিরক্ষী দেশ” হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; মানবসম্পদ, নারী ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়ও বৈশ্বিক কূটনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
তিন সময়পর্বের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার প্রধান প্রেক্ষাপট ছিল শীতল যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত স্বার্থ তাঁর সময়ের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির প্রশ্নও গুরুত্ব পায়।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় যুক্ত হয় বিশ্বায়ন, জাতিসংঘ সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ ও উন্নয়নের মতো বিষয়। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে পানি, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশী সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইনকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়। দারিদ্র্য, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও পরিবেশের বিষয়ও তাঁর কূটনৈতিক আলোচনায় স্থান পায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০২৬ সালের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি ও অর্থনীতি এতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সংঘাত সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতি, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নারী ও যুব ক্ষমতায়নের বিষয়ও উঠে এসেছে।
তিন সময়পর্বের মধ্যে মূল ধারাবাহিকতা হলো—জাতীয় স্বার্থ, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি গুরুত্ব। তবে সময়ের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও বদলেছে: জিয়াউর রহমানের সময়ে অর্থনৈতিক ন্যায়, খালেদা জিয়ার সময়ে পানি ও আন্তর্জাতিক আইন, আর বর্তমান পর্যায়ে রোহিঙ্গা, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন বৈশ্বিক ইস্যু সামনে এসেছে। এভাবে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন দেশের পরিবর্তিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, তিনটি সময়পর্বে বিষয়বস্তুর পরিবর্তন থাকলেও একটি কেন্দ্রীয় ধারণা বারবার ফিরে আসে—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা।

উত্তরাধিকার: ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিসংঘের মঞ্চে একই পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে সরাসরি তাঁর পিতা ও মায়ের জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করেছেন। কাল ভাষণের পাঠে তিনি বলেন যে এই বিশ্বমঞ্চে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে দাঁড়িয়েছেন। বক্তব্যের বিষয়বস্তু শুধু পারিবারিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এতে বাংলাদেশের সমকালীন রাষ্ট্রীয় স্বার্থ—রোহিঙ্গা, জলবায়ু, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও অর্থনীতি—একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। জাতিসংঘের মঞ্চে একই পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতি একটি ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছে।

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের দ্বৈততা:

তিনটি সময়পর্বের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তন একই সঙ্গে বিদ্যমান। জাতীয় স্বার্থের ওপর জোর, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে সমর্থন, উন্নয়ন ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষনে ধারাবাহিকতা ছিল। আবার ১৯৮০ এ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ১৯৯০-এর দশকে পানি ও আন্তর্জাতিক আইন, ২০০৫ এ সন্ত্রাসবাদ, উন্নয়ন ও জাতিসংঘ সংস্কার এবং ২০২৬ এ রোহিঙ্গা, জলবায়ু, AI, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও মানবিক নিরাপত্তা জোড়ালো বিষয় ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের কূটনৈতিক এজেন্ডা স্থির নয়; আন্তর্জাতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে তা নতুন বিষয় গ্রহণ করেছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, এবং খালেদা জিয়া থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এই তিন রাজনৈতিক অধ্যায়কে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের মৌলিক কিছু প্রশ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলেও সেগুলোর আন্তর্জাতিক ভাষা পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় প্রশ্ন ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশীদারিত্বের; পরে প্রশ্ন হয়েছে পানি ও আন্তর্জাতিক আইনের; আর আজকের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু, বাস্তুচ্যুতি, প্রযুক্তি ও মানবিক নিরাপত্তা। এই অর্থে জাতিসংঘের মঞ্চে জিয়া পরিবারের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পারিবারিক অধ্যায় হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বিবর্তন পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা।

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস।