প্রিজনভ্যান থেকে পালানো ‘পিচ্চি রাজার’ সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্ত্রী
- আপডেট: ০২:২৬:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮০০৭
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’র সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তার স্ত্রী খুশি। একই সঙ্গে তার স্বামীকে কারাগার থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ,ব্ল্যাকমেইল ও তাকে গুম করার অভিযোগ তুলেছেন কথিত সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন খুশি। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার স্বামীকে দ্রুত উদ্ধার এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
যেভাবে প্রিজনভ্যান থেকে পালান পিচ্চি রাজা
পুলিশ ও কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আদালতে হাজিরা শেষে গত ২৭ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যান রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা। প্রিজনভ্যানে থাকা অন্য ২৯ আসামিকে কারাগারে নেওয়া হলেও তিনি পালিয়ে যান।
কারা সূত্র জানায়, প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে শৌচাগারে নেওয়ার পর সুযোগ বুঝে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন উপপরিদর্শক (এসআই), তিনজন কনস্টেবল ও একজন নায়েক (চালক) রয়েছেন। ঘটনা তদন্তে কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
পিচ্চি রাজাকে পুনরায় গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
কে এই ‘পিচ্চি রাজা’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ অন্তত ২৫টি মামলার তথ্য রয়েছে। পুলিশ তাকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই সময় তার কাছ থেকে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। পরে চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে দেশে ফেরার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে স্ত্রীর অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে খুশি অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে কারামুক্ত করে দেওয়া এবং নতুন মামলায় না জড়ানোর আশ্বাস দিয়ে কথিত সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম তাদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন।
তার দাবি, নগদ, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এমনকি টাকা জোগাড় করতে তাদের গাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কারও বিক্রি করতে হয়েছে। পরে জেলগেট থেকে রাজাকে বের করে দেওয়ার কথা বলে আরও ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
খুশির ভাষ্য, এত টাকা দেওয়ার পরও তার স্বামী জামিনে মুক্তি পাননি। বরং তাকে একের পর এক নতুন মামলায় জড়ানো হয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও অনৈতিক সম্পর্কের জন্য চাপ দেওয়ারও অভিযোগ করেন খুশি।
তিনি বলেন, রাজাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হতো। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করলে তার স্বামীকে কখনো কারাগার থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলেও ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এসব অভিযোগের পক্ষে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনশট, বিকাশ লেনদেনের তথ্য ও কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
স্বামীকে ‘গুমের’ আশঙ্কা
খুশি আরও বলেন, আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে পিচ্চি রাজা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। তার দাবি, কারাগার ও আদালত প্রাঙ্গণেও জাহাঙ্গীর আলম তার স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্ল্যাকমেইল করতেন।
এ কারণে প্রিজনভ্যান থেকে পালানোর ঘটনার আড়ালে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।
তবে পুলিশ ও কারা সূত্রের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, পিচ্চি রাজা শৌচাগারে যাওয়ার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
‘মাফিয়া সাংবাদিক’ পরিচয়ের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে খুশি অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লোক ও ‘মাফিয়া সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রতারণার জাল তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদকের মামলা রয়েছে এবং তিনি নিজেও মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। এসব অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়ার কথা জানান খুশি।
তদন্ত ও উদ্ধারের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে খুশি বলেন, তার স্বামী পিচ্চি রাজা যেসব মামলায় কারাগারে ছিলেন, সেগুলোর পাশাপাশি প্রিজনভ্যান থেকে পালানোর ঘটনা এবং জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
তিনি নিখোঁজ স্বামীকে দ্রুত সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আত্মসাৎ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর কারণে তার পলায়নের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যের সাময়িক বরখাস্ত এবং তদন্ত কমিটি গঠন সেই ঘটনারই প্রাথমিক প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে খুশির সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।



















