০৯:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

সারাদেশে বিতর্কিত এমপি-নেতাদের তালিকা করতে কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু

  • আপডেট: ০৭:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৮০০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত বিএনপির সংসদ সদস্য ও নেতাদের বিষয়ে আর কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত দুই বছরে বিএনপি পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না—এমন বার্তা দলের উচ্চপর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ঢাকাটাইমসকে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক তারেক রহমান দলের ভাবমূর্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় দলের কিছু নেতা ও জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি ও সরকারের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হোক, তা তিনি চান না।

এ কারণে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যার ফলপ্রসূতে মিরপুরে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলে দলের হাইকমান্ড।

ঢাকার মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও-কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর, মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় জমি ও বাড়ি দখল চেষ্টাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় সরকারের পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভীতি দেখা দিয়েছে।

সরকারি সূত্রের ভাষ্য, বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি, দখল এবং সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগগুলো আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ করবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বালুমহাল, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও অন্যান্য স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিএনপির কিছু নেতা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এমন অভিযোগও সরকারের নজরে এসেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। কয়েকটি জেলা পরিষদের প্রশাসকের কর্মকাণ্ড নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ঘিরে বিরোধ, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব গ্রহণের অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও সরকারের নজরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে সংসদ সদস্য বা স্থানীয় নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে বিষয়গুলোও পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে।

সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, আগামী দিনগুলোতে কোনো ব্যক্তির দলীয় পরিচয় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। বিশেষ করে যাদের কর্মকাণ্ডে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আচরণ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্বাচন রয়েছে। এসব নির্বাচনের আগে দলের নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যাতে নতুন করে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম মহাসচিবসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হচ্ছে।

এ জন্য সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ে দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধপরিকর। বিএনপির পরিচয়ে কেউ কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’

দলীয় ও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা হলো—দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে কিংবা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যেসব কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে দলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কাজও চলছে।

সূত্রের দাবি, এ ক্ষেত্রে আর কোনো ‘ঢিলেঢালা’ অবস্থান রাখতে চান না বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি অংশও সরকারি দলের এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, দখল ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তারা এসব ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও দখলবাজির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান বা আলাদা যৌথবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা সরকারের নেই। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তরের ‘শুভারম্ভ ফলক’ উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ গুরুতর অপরাধ দমনে পুলিশ, বিজিবি, আনসার ব্যাটালিয়নসহ বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

সারাদেশে বিতর্কিত এমপি-নেতাদের তালিকা করতে কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু

আপডেট: ০৭:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত বিএনপির সংসদ সদস্য ও নেতাদের বিষয়ে আর কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত দুই বছরে বিএনপি পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না—এমন বার্তা দলের উচ্চপর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ঢাকাটাইমসকে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক তারেক রহমান দলের ভাবমূর্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় দলের কিছু নেতা ও জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি ও সরকারের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হোক, তা তিনি চান না।

এ কারণে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যার ফলপ্রসূতে মিরপুরে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলে দলের হাইকমান্ড।

ঢাকার মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও-কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর, মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় জমি ও বাড়ি দখল চেষ্টাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় সরকারের পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভীতি দেখা দিয়েছে।

সরকারি সূত্রের ভাষ্য, বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি, দখল এবং সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগগুলো আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ করবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বালুমহাল, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও অন্যান্য স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিএনপির কিছু নেতা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এমন অভিযোগও সরকারের নজরে এসেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। কয়েকটি জেলা পরিষদের প্রশাসকের কর্মকাণ্ড নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ঘিরে বিরোধ, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব গ্রহণের অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও সরকারের নজরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে সংসদ সদস্য বা স্থানীয় নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে বিষয়গুলোও পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে।

সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, আগামী দিনগুলোতে কোনো ব্যক্তির দলীয় পরিচয় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। বিশেষ করে যাদের কর্মকাণ্ডে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আচরণ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্বাচন রয়েছে। এসব নির্বাচনের আগে দলের নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যাতে নতুন করে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম মহাসচিবসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হচ্ছে।

এ জন্য সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ে দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধপরিকর। বিএনপির পরিচয়ে কেউ কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’

দলীয় ও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা হলো—দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে কিংবা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যেসব কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে দলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কাজও চলছে।

সূত্রের দাবি, এ ক্ষেত্রে আর কোনো ‘ঢিলেঢালা’ অবস্থান রাখতে চান না বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি অংশও সরকারি দলের এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিকের দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, দখল ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তারা এসব ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও দখলবাজির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান বা আলাদা যৌথবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা সরকারের নেই। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তরের ‘শুভারম্ভ ফলক’ উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ গুরুতর অপরাধ দমনে পুলিশ, বিজিবি, আনসার ব্যাটালিয়নসহ বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে।