যাঁদের রক্তে লেখা বীরত্বের ইতিহাস-তাঁদের নামেই এবার কোস্ট গার্ডের চার জাহাজ
- আপডেট: ০২:২৪:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৮০২৮
কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানে শান্তিরক্ষায় প্রাণদান, পশুর নদীতে জলদস্যুদের সঙ্গে সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু, আর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে নিখোঁজ। চার নৌবীরের আত্মত্যাগের ইতিহাস সামনে এনে পাঁচ জাহাজের নাম পরিবর্তন করল সরকার।
মোঃ মোসলেহ্ উদ্দিন তুহিন, স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তনের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চার সাহসী সদস্যের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। কেউ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন, কেউ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জলদস্যুদের সঙ্গে সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, আবার কেউ অধীনস্থ নাবিকদের সহায়তা করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদেরই চারজনের নামে কোস্ট গার্ডের চারটি জাহাজের নতুন নামকরণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত-৩ শাখা থেকে গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এক সরকারি পত্রে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি জাহাজের নাম রাখা হয়েছে ‘বিসিজিএস অদম্য বাংলা’। অপর চারটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে দেশের জন্য দায়িত্ব পালনকালে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চার সদস্যের নামে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের গণসংযোগ কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন দৈনিক সোনালী খবরের এই প্রতিবেদক।
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, বিসিজিএস জয় বাংলা (PC-208) জাহাজের নতুন নাম বিসিজিএস অদম্য বাংলা, বিসিজিএস সৈয়দ নজরুল (PL-71) জাহাজের নতুন নাম বিসিজিএস ফিরোজ কবির, বিসিজিএস তাজউদ্দীন (PL-72) জাহাজের নতুন নাম বিসিজিএস নুরুল ইসলাম, বিসিজিএস মনসুর আলী (PL-73) জাহাজের নতুন নাম বিসিজিএস এম হুমায়ুন কবির এবং বিসিজিএস কামরুজ্জামান (PL-74) জাহাজের নতুন নাম বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী।
নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও মতপার্থক্য থাকলেও নতুন নামকরণে স্থান পাওয়া চার নৌসদস্যের আত্মত্যাগের ইতিহাস অনেকের কাছেই অজানা। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, অসীম সাহসিকতা এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের ঘটনা।
কঙ্গোর রক্তাক্ত মাটিতে শান্তিরক্ষায় প্রাণ দেন নুরুল ইসলাম
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লিডিং সিম্যান (সিডি) এম নুরুল ইসলাম ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট BANBAT-2-এর সদস্য হিসেবে কঙ্গোতে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টহল পরিচালনাকালে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন। আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে জীবন উৎসর্গ করেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই সাহসী সদস্য।
তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ তাঁকে মরণোত্তর দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত করে।
তাঁর নামে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজের নামকরণ করা হলো বিসিজিএস নুরুল ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় আত্মত্যাগকারী এই নৌসদস্যের স্মৃতি নতুনভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেল।
উত্তাল বঙ্গোপসাগরে নাবিকদের বাঁচাতে গিয়ে হারিয়ে যান অধিনায়ক ফিরোজ কবির
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফিরোজ কবির ছিলেন বানৌজা শহীদ ফরিদ জাহাজের অধিনায়ক। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গোপসাগরে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর জাহাজ প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে অধীনস্থ নাবিকদের সহায়তা করতে গিয়ে তিনি বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে সমুদ্রে ভেসে যান। নিখোঁজ অধিনায়ককে উদ্ধারে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সমুদ্রে একজন অধিনায়কের দায়িত্ব শুধু জাহাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সংকটময় মুহূর্তে অধীনস্থ নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। ফিরোজ কবিরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সেই দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের এক বেদনাদায়ক স্মৃতি।
তাঁর স্মরণে কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে বিসিজিএস ফিরোজ কবির।
পশুর নদীর রক্তাক্ত রাত- জলদস্যুদের সঙ্গে সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হুমায়ুন কবির
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যোগাযোগ শাখার পেটি অফিসার এম হুমায়ুন কবির ছিলেন একজন সাহসী ও কর্তব্যনিষ্ঠ নৌসদস্য। মৃত্যুর সময় তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনী থেকে প্রেষণে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডে কর্মরত ছিলেন। প্রাপ্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করা তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বাগেরহাটের মোংলা এলাকার পশুর নদীতে বাঁজুয়া সংলগ্ন এলাকায় জলদস্যুদের বিরুদ্ধে রাতের অভিযানে অংশ নেন তিনি।
অভিযান চলাকালে সশস্ত্র জলদস্যুদের সঙ্গে কোস্ট গার্ড সদস্যদের সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। ওই বন্দুকযুদ্ধে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় পেটি অফিসার এম হুমায়ুন কবির নিহত হন।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জলদস্যুতা দমন, বাণিজ্যিক নৌযান ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। মোংলা বন্দর ও পশুর নদী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক অঞ্চল। এই নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োজিত সদস্যদের প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। এমনই একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে জীবন হারান হুমায়ুন কবির। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য হিসেবে কোস্ট গার্ডে প্রেষণে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর এই আত্মত্যাগ দুই বাহিনীর ইতিহাসেই বিশেষভাবে স্মরণীয়।তাঁর নামে বিসিজিএস এম হুমায়ুন কবির নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই নামকরণ জলদস্যু দমনে জীবন উৎসর্গকারী একজন নৌসদস্যের সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের নিদর্শন।
দক্ষিণ সুদানে শান্তিরক্ষার দায়িত্বে নিহত আশরাফ সিদ্দিকী
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিক্ষা শাখার ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম আশরাফ সিদ্দিকী ছিলেন একজন দায়িত্বশীল নৌকর্মকর্তা।
তিনি জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান শান্তিরক্ষা মিশন UNMISS-এ মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
২০১৮ সালের ২৬ জুন দক্ষিণ সুদানের ইয়েই শহরের কাছে জাতিসংঘের একটি গাড়িবহরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় তিনি নিহত হন।
আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন বাংলাদেশি নৌকর্মকর্তার এমন মৃত্যু জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের আত্মত্যাগের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।
তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পর ঢাকা সেনানিবাসে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ তাঁকে মরণোত্তর দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত করে।



















