নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা যেন দুর্নীতির আখড়া: জিম্মি সেবাগ্রহীতারা
- আপডেট: ০৬:৪৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৮০২৬
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজত্বের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার একাধিক মৌজার সরকারি অধিগ্রহণকৃত কোটি কোটি টাকার জমি গোপন রেখে ও ভুয়া নথিপত্র বানিয়ে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলএ শাখা কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভূমি সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহ। যদিও এই অভিযুক্তরা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিস থেকে বদলি হয়ে অন্য জায়গায় কর্মরত রয়েছেন, তবুও তারা জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখায় থাকাকালীন যে অনিয়ম ও দুর্নীতির নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ ভূমি মালিক। তাদের গড়া সেই বিষাক্ত সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে বহু জমির মালিক সরকারের দেওয়া অধিগ্রহণের সঠিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বদলে উল্টো সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে উঠে আসে এল এ কেস নং-২০/৪৯-৫০ সংক্রান্ত চরম অনিয়মের তথ্য। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ কর্তৃক পূর্বে অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমি কেন্দ্রিক এই দুর্নীতির ডালপালা বিস্তৃত ছিল। যেসব ভূমি ইতিপূর্বেই সরকার জনস্বার্থে অধিগ্রহণ করে আইনানুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেছিল, সেসব জমির নথিপত্র চালাচালি করেই মূলত এই চক্রটি সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে। বিশেষ করে দিঘী-বরাব, খাদুন, আড়িয়াব, বরপা, ভুলতা এবং কেশরাব মৌজার অন্তর্ভুক্ত বহু সম্পত্তি এই সিন্ডিকেটের অবৈধ উপার্জনের বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার দিঘী-বরাব মৌজার সি.এস দাগ ১৯৬, ১৯৭ ও আর.এস দাগ ১০২ এ সওজ কর্তৃক পূর্বে অধিগ্রহণকৃত ভূমির পরিমাণ ০.১০০৭ একর। একইভাবে একই মৌজার সি.এস দাগ ১৯৮, ২০০ ও আর.এস দাগ ১০৩ এর ০.০৪৭৭ একর; সি.এস দাগ ২০০ ও আর.এস দাগ ১০৪ এর ০.০৩৮৬ একর; সি.এস দাগ ২০৩ ও আর.এস দাগ ১০৫ এর ০.০১৪৭ একর এবং সি.এস দাগ ২০১ ও আর.এস দাগ ১১১ এর ০.০৫১৯ একর জমি সওজ বিভাগ অনেক আগেই নিজেদের নামে অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এই চার কারিগর মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহ এসব জমির ফাইলপত্রে কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করেন। একই কায়দায় খাদুন মৌজার সি.এস দাগ ৩৭২, ৩৭৮ ও আর.এস দাগ ৪৩২ এর ০.১২৮৩ একর; সি.এস দাগ ৩৭৫ ও আর.এস দাগ ৪৩৩ এর সম্পূর্ণ অংশ; সি.এস দাগ ৩৭৭ ও আর.এস দাগ ৪৩৫ এর ০.০৬১৬ একর এবং সি.এস দাগ ৩ ৯০ ও আর.এস দাগ ৪৩৬ এর ০.০৩৫৩ একর জমির সরকারি তথ্য গোপন রেখে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়। দুর্নীতির এই জাল রূপগঞ্জের আড়িয়াব ও বরপা মৌজাতেও একইভাবে ছড়ানো হয়। আড়িয়াব মৌজার সি.এস দাগ ৬৫ ও আর.এস দাগ ১০৪ এর ০.০১৯৭ একর; সি.এস দাগ ৬২ ও আর.এস দাগ ১০৫ এর ০.০৫৪৭ একর; সি.এস দাগ ৬৩ ও আর.এস দাগ ১০৬ এর ০.০৮৮৯ একর; সি.এস দাগ ৬৪ ও আর.এস দাগ ১০৭ এর ০.০১৮৩ একর এবং সি.এস দাগ ১৭৪ ও আর.এস দাগ ১৯৬ এর ০.০২১৬ একর জমিতে ভুয়া দাবিদার দাঁড় করানো কিংবা প্রকৃত মালিকদের ফাইল আটকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বরপা মৌজার সি.এস দাগ ৪১৩ ও আর.এস দাগ ৩৯১ এর ০.০৭৬৬ একর; সি.এস দাগ ৪২১ ও আর.এস দাগ ৭৭২ এর ০.০৩৩৩ একর; সি.এস দাগ ৪২০ ও আর.এস দাগ ৭৭৩ এর ০.০২২৭ একর; সি.এস দাগ ৪১৯ ও আর.এস দাগ ৭৭৪ এর সম্পূর্ণ অংশ; সি.এস দাগ ৫১৫, ৫১৬ ও আর.এস দাগ ৭৭৬ এর ০.১৭৮ একর এবং সি.এস দাগ ৫১৫ ও আর.এস দাগ ৭৭৭ এর ০.০১৮৪ একর জমির নথিতে চরম অনিয়ম করা হয়। সওজ কর্তৃক পূর্বে অধিগ্রহণ করা এই বিশাল ভূখণ্ডকে নতুন করে অধিগ্রহণের নথিতে ঢুকিয়ে কিংবা মালিকানা ঝুলিয়ে রেখে সেবাগ্রহীতাদের বাধ্য করা হতো ঘুষের টাকা তুলে দিতে।
সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় কোপটি পড়েছিল বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভুলতা ও কেশরাব মৌজায়। ভুলতা মৌজার সি.এস দাগ ৯১৬, ৯১৭ ও আর.এস দাগ ১৬৫৪ এর ০.০৭৫৮ একর; সি.এস দাগ ৯১৮, ৯১৯ ও আর.এস দাগ ১৬৫৫ এর ০.০৬২১ একর; সি.এস দাগ ৯১৮, ৯২০ ও আর.এস দাগ ১৬৫৬ এর ০.০২৯২ একর; সি.এস দাগ ৯২০, ৯২১ ও আর.এস দাগ ১৬৫৭ এর ০.০০৩৭ একর; সি.এস দাগ ৯২২ ও আর.এস দাগ ১৬৫৮ এর ০.০৭৫৯ একর; সি.এস দাগ ৯২৪ ও আর.এস দাগ ১৬৫৯ এর ০.১৭৫২ একর এবং সি.এস দাগ ৯৩৪ ও আর.এস দাগ ১৬৬০ এর সম্পূর্ণ জমি ছিল সওজের আওতাধীন। এছাড়া কেশরাব মৌজার সি.এস দাগ ৯৭৯ ও আর.এস দাগ ১৪২৪ এর ০.০৩৩৭ একর এবং সি.এস দাগ ৯৮৪, ৯৮৫ ও আর.এস দাগ ১৪২৮ এর ০.০৬৮৪ একর ভূমিও পূর্বের অধিগ্রহণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব মৌজার সরকারি অধিগ্রহণকৃত ভূমির তথ্য গোপন রেখে তা সাধারণ মানুষের জমি হিসেবে দেখিয়ে জাল কাগজপত্র বানিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের টাকা অবৈধ পন্থায় ছাড় করানো হতো। যার বড় একটি অংশ সরাসরি পকেটে পুরেছেন মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহ।
এই চারজন কর্মচারী বা কানুনগো কিন্তু একা এই রামরাজত্ব চালাতে পারতেন না। ঘটনার গভীরে তদন্ত করতে গিয়ে একাধিক ভুক্তভোগী ও ডিসি অফিসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা যায়, তৎকালিন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (অধিগ্রহণ) এবং খোদ জেলা প্রশাসকদের একটি প্রভাবশালী অংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রচ্ছায়াতেই তারা এসব অপকর্ম নিশ্চিন্তে চালিয়ে গেছেন। প্রশাসনিক বড় বড় কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় ও সুরক্ষা থাকার কারণে সামান্য ভুলত্রুটির অজুহাতে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো। কোনো সাধারণ মানুষ যদি তাদের অন্যায্য দাবির প্রতিবাদ করতেন, তবে তাকে সরাসরি ভুয়া মামলার ভয় দেখানো অথবা ফাইল চিরতরে ধামাচাপা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। দিনের পর দিন ডিসি অফিসের দরজায় ঘুরে বাধ্য হয়ে মানুষ শত হাজার থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে দিত এই চক্রটির হাতে।
সহজ কথায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখা ছিল এই দুর্নীতির মূল প্রজনন কেন্দ্র। মামুনের হিসাবপত্র তৈরি, শরীফের ফাইলিং কারচুপি, বশিরুল্লাহর দালাল ব্যবস্থাপনা এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহর সরেজমিন ভুয়া ফিল্ড রিপোর্ট—এই চার উপাদানে মিলে তৈরি হয়েছিল এক অজেয় দুর্নীতির দুর্গ। তারা ওপর তলার কর্মকর্তাদের নিয়মিত মোটা অঙ্কের কমিশন পৌঁছে দিতেন, যার বিনিময়ে পেয়ে যেতেন ধরাছোঁয়ার বাইরের এক অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়। অধিগ্রহণ শাখাকে ঘিরে গড়ে তোলা এই অদৃশ্য জিম্মিদশায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জিত সম্পত্তি শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজদের পকেট ভরার মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এসে মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহ বিভিন্ন সময়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ডিসি অফিসে তাদের রেখে যাওয়া দুর্নীতির ক্ষতচিহ্ন আজও শুকায়নি। আজও কোনো সাধারণ ভূমি মালিক ক্ষতিপূরণের আবেদন নিয়ে ডিসি অফিসে গেলে এই সিন্ডিকেটের রেখে যাওয়া জটিলতা ও জটলা মোকাবিলা করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। কারন বর্তমানে মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ এবং কানুনগো হাবিবুল্লাহ এর উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন সার্ভেয়ার জহির। বর্তমানে আবির্ভুত দানব সার্ভেয়ার জহির পূর্বের উত্তরসূরিদের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছেন দুর্নীতিতে। প্রতিটি ফাইল থেকে জহির ৩৫-৪০% পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেন। সার্ভেযার জহির স্বয়ং ভুমি অধিগ্রহন কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রসাশক (অদিগ্রহন) এবং জেলাপ্রশাসক এর ছত্রছায়ায় নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সার্ভেয়ার জহিরের নিয়ন্ত্রনে পুরো ডিসি অফিস ও এল এ শাখা। তার আধিপত্যে অতিষ্ঠ সাধারন ভুমি সেবাপ্রত্যাশিরা। সার্ভেয়ার জহিরের দুর্নীতির নতুন কৌশল হচ্ছে জনপ্রশান মন্ত্রণালয, ভুমি অধিদপ্তর সহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ঘুষ আদায় করা। জহিরের ঘুষ পার্সেন্ট ছাড়া কোন ফাইলই উপরের টেবিলে যায় না। জহির নিজেকে ডিসি অফিসের সর্বেসবা হিসেবে তুলে ধরেন ভুমি সেবাপ্রত্যাশিদের কাছে।
সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কেবল স্থানান্তরিত বা বদলি হওয়াই চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না। এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আবারও একই ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মাধ্যমে রূপগঞ্জের উল্লিখিত দিঘী-বরাব, খাদুন, আড়িয়াব, বরপা, ভুলতা ও কেশরাব মৌজায় এল এ কেস নং-২০/৪৯-৫০ সংক্রান্ত ফাইলগুলোর ফরেনসিক ও সরেজমিন পুনর্নিরীক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে অভিযুক্ত মামুন, শরীফ, বশিরুল্লাহ, কানুনগো হাবিবুল্লাহসহ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (অধিগ্রহণ) ও জেলা প্রশাসকদের দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অবৈধ সম্পদের হিসাব বের করে তা বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদেরকে কঠোর আইনি সাজার মুখোমুখি করার দাবি দিনে দিনে আরও জোরালো হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করে সাধারণ জনগণের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সময়ের মূল দাবি।



















