০৭:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

পিলখানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন:পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ

  • আপডেট: ০৬:৩৩:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬
  • / ১৮০০৭

মো. শরিফুল ইসলাম

২৩০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম বাহিনীর সদর দপ্তর; এটি কেবল একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়,দেশপ্রেম, বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর অঙ্গীকার পূরণের এক জীবন্ত প্রাঙ্গন। এখানকার প্রাণবন্ত প্রকৃতি যেন ধারণ করে আছে জাতির সংকটকালের স্পন্দন।

সবুজ-শ্যামল বৃক্ষরাজিতে ভরপুর পিলখানার অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষের মাঝে একটি বিশেষ বটবৃক্ষ -যার সাথে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মার্চের দুঃসাহসিক বীরত্বগাঁথা, যার ইতিহাস বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেই বিস্মৃত ইতিহাসের অনুসন্ধানে:
২০২১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ‘স্পাইস’ নামের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অংশ হিসেবে পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে ‘অতন্দ্র: বিজয়ের ৫০’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে। প্রামাণ্যচিত্রটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়েই ‘স্পাইস’ টেলিভিশন তার যাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্যে পিলখানার অভ্যন্তরে শ্যুটিংয়ের অনুমতি চেয়ে টেলিভশন কর্তৃপক্ষ বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় মহাপরিচালক মহোদয় জনসংযোগ কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের নির্দেশ দেন। শ্যুটিংয়ের প্রস্তুতিকালে টেলিভশন কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫ মার্চের ঘটনার সময় পিলখানায় উপস্থিত ছিলেন এবং বর্তমানে জীবিত আছেন -এমন একজন তৎকালীন ইপিআর সদস্যের সাক্ষাৎকার তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিশ্চিত করতে জনসংযোগ কর্মকর্তা রেকর্ড উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৎকালীন ইপিআরের সিপাহী (পরবর্তীতে ল্যান্স নায়েক) আব্দুল মালেক, বীরপ্রতীক-এর সন্ধান পায় এবং আব্দুল মালেকের মোবাইল নাম্বার স্পাইস টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করে। টেলিভশন কর্তৃপক্ষ সিলেট থেকে বীর প্রতীক আব্দুল মালেককে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং পিলখানার অভ্যন্তরে টানা তিন রাত ধরে শ্যুটিং সম্পন্ন করে। ল্যান্স নায়েক বীরপ্রতীক আব্দুল মালেক-এর সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এক অসীম সাহসিকতার বীরত্বগাঁথা -১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে তৎকালীন ইপিআরের কতিপয় সাহসী ও অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পিলখানার বটবৃক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটায়। সাক্ষাৎকার শেষে ঘটনাটির বিস্তারিত জানতে চাইলে বীর প্রতীক আব্দুল মালেক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত ‘যুদ্ধদিনের আত্মস্মৃতি’ শীর্ষক একটি বই ধরিয়ে দেন, যা সেই সময়কার ঘটনাবলীর এক মূল্যবান দলিল।

বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের সাক্ষাৎকার এবং তাঁর বইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা অনুসন্ধানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে পিলখানায় বটবৃক্ষে পতাকা উত্তোলনের একটি সাদাকালো ছবি আবিষ্কার করা হয়। ছবির নিচে সংক্ষিপ্ত তথ্য -১৯৭১ সালের মার্চে পিলখানার এক গাছে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। তথ্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাৎপর্যে বিপুল। পরাধীন দেশে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের এই ঘটনা শুধু প্রতীকী সাহসিকতা নয়; এটি ছিলো পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ- মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ এবং স্বাধীনতার প্রত্যয়ে এক সুদৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ। বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও সে সময়ের বিজিবি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আর অগ্রসর হননি।

পরবর্তীতে বিজিবি দিবস উপলক্ষ্যে বাহিনীর ২৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ১৭৯৫ সালে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ থেকে শুরু করে কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে আজকের আধুনিক, ত্রিমাত্রিক ও সুশৃংখল ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আসালং বিদ্রোহ ও চাইনিজ আম্বানসহ বিভিন্ন বিদ্রোহে বাহিনীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ ‘ভাইসরয় কমেন্ডেশন’ ও ‘নিশান-ই-হায়দার’ এর মতো গৌরবময় পদক অর্জন এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের অবিস্মরণীয় অবদান ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিডিআর ও বর্তমান বিজিবির অবদান খুঁজতে গিয়ে আবারো সামনে আসে ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে তৎকালীন ইপিআরের অকুতোভয় সাহসী সৈনিকদের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের বীরত্বগাঁথা। এই পতাকা উত্তোলনের ছবি থেকে মেজর রইসুল আজম মনির তত্ত্বাবধানে শিল্পী মনোজ পালের দক্ষ হাতের সুনিপুন কারুকার্যে তামার তারে গড়ে ওঠে পতাকা উত্তোলিত সেই প্রতীকী বটবৃক্ষের অবয়ব।

বিজিবির বর্তমান মহাপরিচালককে তার বিজিবিতে যোগদানের অব্যবহিত পরেই তামার তারে নির্মিত একটি প্রতীকী বটবৃক্ষ দেখিয়ে এর পেছনে তৎকালীন ইপিআর সদস্যদের বীরত্বগাঁথা বর্ণনা করা হলে মহাপরিচালক মহোদয় ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, বটবৃক্ষের অবস্থান এবং পতাকা উত্তোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দেন। শুরু হয় বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধান। পুরোনো পত্রিকা, আর্কাইভ ফুটেজ, গ্রন্থাগারের দুর্লভ বই, রেকর্ড রুম -সবখানে চলতে থাকে নিবিড় অনুসন্ধান। পিলখানায় পতাকা উত্তোলনের আরেকটি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় বিজিবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাইফেলস’ শীর্ষক বইয়ের তথ্যের মাধ্যমে। তখন একটি ছবি হয়ে ওঠে ইতিহাস উদঘাটনের প্রগাঢ় অনুপ্রেরণা।

স্মৃতির পথে প্রত্যাবর্তন:

দীর্ঘদিনের গভীর অনুসন্ধান, বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যাপক গবেষণায় জানা যায়, ১৯৭১ সালের মার্চে পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ইপিআরের ১০/১১ জন অকুতোভয় বাঙালি সদস্য। বেঁচে আছেন শুধুই ল্যান্স নায়েক আব্দুল মালেক, বীর প্রতীক। বিজিবির চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সিলেটের আম্বরখানা থেকে তাঁকে পিলখানায় আনা হয়। সম্ভাব্য কয়েকটি প্রাচীন বটবৃক্ষ চিহ্নিত করে দেখানো হলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান -এসবের কোনোটিই সেই বটবৃক্ষ নয়। সময়ের প্রবাহে পরিবর্তিত পিলখানার ভৌগোলিক রূপ তাঁর স্মৃতিকে প্রথমে বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি যেতে চান ১৯৭১ সালে যেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, সেই সিগনাল সেন্টারের দিকে। কিন্তু পুরোনো স্থাপনার আর অস্তিত্ব নেই। পরে যে ব্যারাকে তিনি অবস্থান করতেন, সেখানে পৌঁছে যেন অতীতের দরজা ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়। স্মৃতির ছেঁড়া সূতোগুলো জোড়া লাগতে শুরু করে। ২২ মার্চ দিবাগত রাতের সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি বটবৃক্ষের সামনে থেমে থমকে দাঁড়ান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান -এই গাছেই উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীনতার সেই লাল সবুজের পতাকা। গাছটিকে তিনি স্যালুট করেন। মুহূর্তটি ছিল ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপের মতো -যেন বৃক্ষের নীরবতায় ধ্বনিত হচ্ছিল সাহস, শপথ ও আত্মত্যাগের প্রতিধ্বনি।

গাছটি শনাক্ত হলেও থেমে থাকেনি অনুসন্ধান। পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত অন্য সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত করতে শুরু হয় নতুন উদ্যোগ। বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের মুখ থেকে বের হয়ে আসে তৎকালীন ইপিআরের সিগন্যাল সেন্টারের সিনিয়র সদস্য নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই সাহেবের নাম। শুরু হয় হাই সাহেবের খোঁজ। বিজিবির রেকর্ড উইং সম্ভাব্য নামগুলো যাচাই করে। প্রাপ্ত নম্বর ধরে যোগাযোগ করা হয় বিভিন্ন স্থানে। বরিশালের উজিরপুরে গিয়ে সন্ধান মিলে আব্দুল হাইয়ের। সন্ধান মিললেও আব্দুল হাই জানান, তিনিও সেদিন পতাকা উত্তোলনের সাথে ছিলেন বটে কিন্তু তিনি সেই প্রত্যাশিত আব্দুল হাই নন। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। পরবর্তীতে রেকর্ড উইংয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার মিরপুরের কাফরুলে মিলে নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের পরিবারের সন্ধান। নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের সহধর্মিণী সুফিয়া বেগমের দেয়া তথ্যে উঠে আসতে থাকে ইতিহাসের সেই কাঙ্খিত সত্যের অকাট্য প্রমাণ।

যোগাযোগ করা হয় ঢাকার মোহাম্মদপুরে শহীদ নায়েব সুবেদার শামসুল হকের সহধর্মিনী (আমেরিকা প্রবাসী) ও তার ছেলে শহীদুল হক, মোহাম্মদপুরে শহীদ হাবিলদার খোরশেদ আলমের ছেলে আজিজুল আলম, নোয়াখালীর শহীদ হাবিলদার খোরশেদ আলমের নাতি মামুন, ঢাকার মানিকদীতে পতাকা উত্তোলনকারী হাবিলদার মোশাররফ হোসেনের ছেলে শাহাদৎ হোসেন, নরসিংদীর শহীদ নায়েক সিগন্যাল মহি উদ্দিন ভূইয়ার সহধর্মিনী রওশনারা বেগম ও মেয়ে মাসুদা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পতাকা উত্তোলনকারী ল্যান্স নায়েক রেজাউল হক এবং গোপালগঞ্জের শহীদ সিপাহী সিগন্যাল আবুল বাশারের ভাই আবুল কালাম ও ঢাকার বাড্ডায় বোন পারুল আক্তারের সাথে। সকলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ছবি। পাশাপাশি সাংবাদিকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয় পিলখানার আশেপাশের স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য -সব মিলিয়ে তৈরি হয় প্রমাণভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ।

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হয়- গাছটি বটবৃক্ষ নয়, পাকুড়গাছ। তবে নামের এই সংশোধন তার মাহাত্ম্যকে বিন্দুমাত্র ম্লান করেনি বরং ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রজ্ঞা ও দায়বদ্ধতাকে উজ্জ্বল করেছে। গাছটির অবস্থান ও বয়স ১৯৭১ সালের ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অনুসন্ধান কেবল একটি গাছ চিহ্নিত করার প্রয়াস ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসকে সত্যের আলোয় পুনর্গঠনের দায়িত্বশীল প্রয়াস।

২২ মার্চ দিবাগত রাতে ইপিআর সদস্যদের সেই দুঃসাহসিক বীরত্বগাঁথা :

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্য ও শোষণের প্রতিবাদে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ। মুক্তিকামী বাঙালি সিদ্ধান্ত নেয় -২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ নয়, পালিত হবে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে- উড়বে না আর পাকিস্তানের পতাকা; বাংলার মাটিতে উড়ানো হবে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মুহূর্তেই এ খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর কাছে। ১৫ মার্চ সমগ্র পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয় পাকিস্তান থেকে ছুটে আসা ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের সামরিক সদস্যরা। ১৬ মার্চ নিরস্ত্র করা হয় পিলখানাস্থ ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের; একদিকে বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আরেক দিকে চাপা উত্তেজনা -চারদিকে বন্দুক তাক করা, থমথমে পরিস্থিতি; যেকোনো মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যেই ইপিআরের একদল সাহসী বাঙালি সৈনিক নিলেন এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত -উত্তোলন করবেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে, গোপনে, সতর্কতায়, নীরব পরিকল্পনায় তারা এগিয়ে গেলেন। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পিলখানার সবচেয়ে উঁচু একটি গাছ। ২২ মার্চ দিবাগত রাতে, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে ইপিআরের১০/১১ জন দেশপ্রেমিক ও সাহসী সৈনিক সেই গাছে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ মার্চ সকালে তা উড়তে থাকে দৃপ্তভাবে -শত্রুর ঘাঁটির ভেতরেই স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে। এই ঘটনাই ছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক বিদ্রোহ-বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ, যা মুহূর্তেই বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ঢাকার পাশাপাশি যশোর, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, দিনাজপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই সাহসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বেলুচ রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রিত পিলখানায় এই পতাকা উত্তোলন ছিল এক অসাধারণ দুঃসাহসিকতা -যা পাকিস্তানি শাসকদের জন্য ছিল সুস্পষ্ট বার্তা; বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অটল সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ।

২৫ মার্চের কালরাত ও মহান মুক্তিযুদ্ধ:

২২ মার্চ দিবাগত রাতের সেই সাহসিকতার পর আসে ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ এর নামে পিলখানায় চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত ইপিআর সদস্যদের ওপর নেমে আসে নৃশংসতা। সুবেদার মেজর শওকত আলী, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই, নায়েব সুবেদার শামসুল হক ও হাবিলদার খোরশেদ আলমসহ অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে। তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় -নির্যাতন তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। শেষে তাঁদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের পাগলায় শীতলক্ষা নদীর তীরে; সেখানে ব্রাশ ফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁদের। সেদিন রাতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেন তৎকালীন ইপিআরের সিপাহী আব্দুল মালেকসহ পতাকা উত্তোলনকারী বেশ কয়েকজন সদস্য।

শুধু আব্দুল হাই, আব্দুল মালেকেরা নন, তৎকালীন ইপিআরের ১২ হাজার অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজনকে রেখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের ৮১৭ জন সদস্য তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের কাছে পতাকা ছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক; জীবন উৎসর্গের শপথ। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বাহিনীর ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ও ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, ৮ জন বীরউত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার:

এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চের পতাকা উত্তোলনের পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণভিত্তিক বিবরণ উঠে আসে। তথ্যচিত্র আকারে উপস্থাপিত হলে আবেগাপ্লুত হন বিজিবির সদস্যবৃন্দ। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই গৌরবগাঁথা -যেন তারা জানে, সীমান্ত রক্ষার বর্তমান দায়িত্বের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের গভীর ঐতিহ্য। আজও সেই বটবৃক্ষ (পাকুড়গাছ) নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। তার ছায়ায় ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। সে সাক্ষ্য দেয় -কিছু সাহসী মানুষ জীবন বাজি রেখে যে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, তা কেবল একটি প্রতীক নয়; এটি স্বাধীনতার অঙ্গীকার, আত্মমর্যাদার ঘোষণা এবং সীমান্ত রক্ষার অমোঘ প্রেরণা।

জাতীয় পতাকা -আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অতীতে যেমন দায়িত্ব পালন করেছে, আজও তেমনি সতর্ক ও অঙ্গীকারাবদ্ধ। ভবিষ্যতেও থাকবে -জাতির পতাকা সমুন্নত রাখার দৃপ্ত প্রত্যয়ে, ইতিহাসের গৌরব বুকে ধারণ করে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, সদর দপ্তর, বিজিবি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

পিলখানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন:পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ

আপডেট: ০৬:৩৩:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

মো. শরিফুল ইসলাম

২৩০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম বাহিনীর সদর দপ্তর; এটি কেবল একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়,দেশপ্রেম, বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর অঙ্গীকার পূরণের এক জীবন্ত প্রাঙ্গন। এখানকার প্রাণবন্ত প্রকৃতি যেন ধারণ করে আছে জাতির সংকটকালের স্পন্দন।

সবুজ-শ্যামল বৃক্ষরাজিতে ভরপুর পিলখানার অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষের মাঝে একটি বিশেষ বটবৃক্ষ -যার সাথে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মার্চের দুঃসাহসিক বীরত্বগাঁথা, যার ইতিহাস বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেই বিস্মৃত ইতিহাসের অনুসন্ধানে:
২০২১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ‘স্পাইস’ নামের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অংশ হিসেবে পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে ‘অতন্দ্র: বিজয়ের ৫০’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে। প্রামাণ্যচিত্রটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়েই ‘স্পাইস’ টেলিভিশন তার যাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্যে পিলখানার অভ্যন্তরে শ্যুটিংয়ের অনুমতি চেয়ে টেলিভশন কর্তৃপক্ষ বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় মহাপরিচালক মহোদয় জনসংযোগ কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের নির্দেশ দেন। শ্যুটিংয়ের প্রস্তুতিকালে টেলিভশন কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫ মার্চের ঘটনার সময় পিলখানায় উপস্থিত ছিলেন এবং বর্তমানে জীবিত আছেন -এমন একজন তৎকালীন ইপিআর সদস্যের সাক্ষাৎকার তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিশ্চিত করতে জনসংযোগ কর্মকর্তা রেকর্ড উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৎকালীন ইপিআরের সিপাহী (পরবর্তীতে ল্যান্স নায়েক) আব্দুল মালেক, বীরপ্রতীক-এর সন্ধান পায় এবং আব্দুল মালেকের মোবাইল নাম্বার স্পাইস টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করে। টেলিভশন কর্তৃপক্ষ সিলেট থেকে বীর প্রতীক আব্দুল মালেককে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং পিলখানার অভ্যন্তরে টানা তিন রাত ধরে শ্যুটিং সম্পন্ন করে। ল্যান্স নায়েক বীরপ্রতীক আব্দুল মালেক-এর সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এক অসীম সাহসিকতার বীরত্বগাঁথা -১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে তৎকালীন ইপিআরের কতিপয় সাহসী ও অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পিলখানার বটবৃক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটায়। সাক্ষাৎকার শেষে ঘটনাটির বিস্তারিত জানতে চাইলে বীর প্রতীক আব্দুল মালেক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত ‘যুদ্ধদিনের আত্মস্মৃতি’ শীর্ষক একটি বই ধরিয়ে দেন, যা সেই সময়কার ঘটনাবলীর এক মূল্যবান দলিল।

বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের সাক্ষাৎকার এবং তাঁর বইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা অনুসন্ধানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে পিলখানায় বটবৃক্ষে পতাকা উত্তোলনের একটি সাদাকালো ছবি আবিষ্কার করা হয়। ছবির নিচে সংক্ষিপ্ত তথ্য -১৯৭১ সালের মার্চে পিলখানার এক গাছে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। তথ্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাৎপর্যে বিপুল। পরাধীন দেশে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের এই ঘটনা শুধু প্রতীকী সাহসিকতা নয়; এটি ছিলো পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ- মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ এবং স্বাধীনতার প্রত্যয়ে এক সুদৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ। বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও সে সময়ের বিজিবি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আর অগ্রসর হননি।

পরবর্তীতে বিজিবি দিবস উপলক্ষ্যে বাহিনীর ২৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ১৭৯৫ সালে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ থেকে শুরু করে কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে আজকের আধুনিক, ত্রিমাত্রিক ও সুশৃংখল ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আসালং বিদ্রোহ ও চাইনিজ আম্বানসহ বিভিন্ন বিদ্রোহে বাহিনীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ ‘ভাইসরয় কমেন্ডেশন’ ও ‘নিশান-ই-হায়দার’ এর মতো গৌরবময় পদক অর্জন এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের অবিস্মরণীয় অবদান ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিডিআর ও বর্তমান বিজিবির অবদান খুঁজতে গিয়ে আবারো সামনে আসে ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে তৎকালীন ইপিআরের অকুতোভয় সাহসী সৈনিকদের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের বীরত্বগাঁথা। এই পতাকা উত্তোলনের ছবি থেকে মেজর রইসুল আজম মনির তত্ত্বাবধানে শিল্পী মনোজ পালের দক্ষ হাতের সুনিপুন কারুকার্যে তামার তারে গড়ে ওঠে পতাকা উত্তোলিত সেই প্রতীকী বটবৃক্ষের অবয়ব।

বিজিবির বর্তমান মহাপরিচালককে তার বিজিবিতে যোগদানের অব্যবহিত পরেই তামার তারে নির্মিত একটি প্রতীকী বটবৃক্ষ দেখিয়ে এর পেছনে তৎকালীন ইপিআর সদস্যদের বীরত্বগাঁথা বর্ণনা করা হলে মহাপরিচালক মহোদয় ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, বটবৃক্ষের অবস্থান এবং পতাকা উত্তোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দেন। শুরু হয় বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধান। পুরোনো পত্রিকা, আর্কাইভ ফুটেজ, গ্রন্থাগারের দুর্লভ বই, রেকর্ড রুম -সবখানে চলতে থাকে নিবিড় অনুসন্ধান। পিলখানায় পতাকা উত্তোলনের আরেকটি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় বিজিবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাইফেলস’ শীর্ষক বইয়ের তথ্যের মাধ্যমে। তখন একটি ছবি হয়ে ওঠে ইতিহাস উদঘাটনের প্রগাঢ় অনুপ্রেরণা।

স্মৃতির পথে প্রত্যাবর্তন:

দীর্ঘদিনের গভীর অনুসন্ধান, বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যাপক গবেষণায় জানা যায়, ১৯৭১ সালের মার্চে পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ইপিআরের ১০/১১ জন অকুতোভয় বাঙালি সদস্য। বেঁচে আছেন শুধুই ল্যান্স নায়েক আব্দুল মালেক, বীর প্রতীক। বিজিবির চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সিলেটের আম্বরখানা থেকে তাঁকে পিলখানায় আনা হয়। সম্ভাব্য কয়েকটি প্রাচীন বটবৃক্ষ চিহ্নিত করে দেখানো হলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান -এসবের কোনোটিই সেই বটবৃক্ষ নয়। সময়ের প্রবাহে পরিবর্তিত পিলখানার ভৌগোলিক রূপ তাঁর স্মৃতিকে প্রথমে বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি যেতে চান ১৯৭১ সালে যেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, সেই সিগনাল সেন্টারের দিকে। কিন্তু পুরোনো স্থাপনার আর অস্তিত্ব নেই। পরে যে ব্যারাকে তিনি অবস্থান করতেন, সেখানে পৌঁছে যেন অতীতের দরজা ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়। স্মৃতির ছেঁড়া সূতোগুলো জোড়া লাগতে শুরু করে। ২২ মার্চ দিবাগত রাতের সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি বটবৃক্ষের সামনে থেমে থমকে দাঁড়ান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান -এই গাছেই উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীনতার সেই লাল সবুজের পতাকা। গাছটিকে তিনি স্যালুট করেন। মুহূর্তটি ছিল ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপের মতো -যেন বৃক্ষের নীরবতায় ধ্বনিত হচ্ছিল সাহস, শপথ ও আত্মত্যাগের প্রতিধ্বনি।

গাছটি শনাক্ত হলেও থেমে থাকেনি অনুসন্ধান। পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত অন্য সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত করতে শুরু হয় নতুন উদ্যোগ। বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের মুখ থেকে বের হয়ে আসে তৎকালীন ইপিআরের সিগন্যাল সেন্টারের সিনিয়র সদস্য নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই সাহেবের নাম। শুরু হয় হাই সাহেবের খোঁজ। বিজিবির রেকর্ড উইং সম্ভাব্য নামগুলো যাচাই করে। প্রাপ্ত নম্বর ধরে যোগাযোগ করা হয় বিভিন্ন স্থানে। বরিশালের উজিরপুরে গিয়ে সন্ধান মিলে আব্দুল হাইয়ের। সন্ধান মিললেও আব্দুল হাই জানান, তিনিও সেদিন পতাকা উত্তোলনের সাথে ছিলেন বটে কিন্তু তিনি সেই প্রত্যাশিত আব্দুল হাই নন। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। পরবর্তীতে রেকর্ড উইংয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার মিরপুরের কাফরুলে মিলে নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের পরিবারের সন্ধান। নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের সহধর্মিণী সুফিয়া বেগমের দেয়া তথ্যে উঠে আসতে থাকে ইতিহাসের সেই কাঙ্খিত সত্যের অকাট্য প্রমাণ।

যোগাযোগ করা হয় ঢাকার মোহাম্মদপুরে শহীদ নায়েব সুবেদার শামসুল হকের সহধর্মিনী (আমেরিকা প্রবাসী) ও তার ছেলে শহীদুল হক, মোহাম্মদপুরে শহীদ হাবিলদার খোরশেদ আলমের ছেলে আজিজুল আলম, নোয়াখালীর শহীদ হাবিলদার খোরশেদ আলমের নাতি মামুন, ঢাকার মানিকদীতে পতাকা উত্তোলনকারী হাবিলদার মোশাররফ হোসেনের ছেলে শাহাদৎ হোসেন, নরসিংদীর শহীদ নায়েক সিগন্যাল মহি উদ্দিন ভূইয়ার সহধর্মিনী রওশনারা বেগম ও মেয়ে মাসুদা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পতাকা উত্তোলনকারী ল্যান্স নায়েক রেজাউল হক এবং গোপালগঞ্জের শহীদ সিপাহী সিগন্যাল আবুল বাশারের ভাই আবুল কালাম ও ঢাকার বাড্ডায় বোন পারুল আক্তারের সাথে। সকলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ছবি। পাশাপাশি সাংবাদিকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয় পিলখানার আশেপাশের স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য -সব মিলিয়ে তৈরি হয় প্রমাণভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ।

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হয়- গাছটি বটবৃক্ষ নয়, পাকুড়গাছ। তবে নামের এই সংশোধন তার মাহাত্ম্যকে বিন্দুমাত্র ম্লান করেনি বরং ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রজ্ঞা ও দায়বদ্ধতাকে উজ্জ্বল করেছে। গাছটির অবস্থান ও বয়স ১৯৭১ সালের ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অনুসন্ধান কেবল একটি গাছ চিহ্নিত করার প্রয়াস ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসকে সত্যের আলোয় পুনর্গঠনের দায়িত্বশীল প্রয়াস।

২২ মার্চ দিবাগত রাতে ইপিআর সদস্যদের সেই দুঃসাহসিক বীরত্বগাঁথা :

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্য ও শোষণের প্রতিবাদে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ। মুক্তিকামী বাঙালি সিদ্ধান্ত নেয় -২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ নয়, পালিত হবে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে- উড়বে না আর পাকিস্তানের পতাকা; বাংলার মাটিতে উড়ানো হবে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মুহূর্তেই এ খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর কাছে। ১৫ মার্চ সমগ্র পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয় পাকিস্তান থেকে ছুটে আসা ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের সামরিক সদস্যরা। ১৬ মার্চ নিরস্ত্র করা হয় পিলখানাস্থ ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের; একদিকে বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আরেক দিকে চাপা উত্তেজনা -চারদিকে বন্দুক তাক করা, থমথমে পরিস্থিতি; যেকোনো মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যেই ইপিআরের একদল সাহসী বাঙালি সৈনিক নিলেন এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত -উত্তোলন করবেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে, গোপনে, সতর্কতায়, নীরব পরিকল্পনায় তারা এগিয়ে গেলেন। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পিলখানার সবচেয়ে উঁচু একটি গাছ। ২২ মার্চ দিবাগত রাতে, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে ইপিআরের১০/১১ জন দেশপ্রেমিক ও সাহসী সৈনিক সেই গাছে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ মার্চ সকালে তা উড়তে থাকে দৃপ্তভাবে -শত্রুর ঘাঁটির ভেতরেই স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে। এই ঘটনাই ছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক বিদ্রোহ-বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ, যা মুহূর্তেই বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ঢাকার পাশাপাশি যশোর, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, দিনাজপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই সাহসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বেলুচ রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রিত পিলখানায় এই পতাকা উত্তোলন ছিল এক অসাধারণ দুঃসাহসিকতা -যা পাকিস্তানি শাসকদের জন্য ছিল সুস্পষ্ট বার্তা; বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অটল সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ।

২৫ মার্চের কালরাত ও মহান মুক্তিযুদ্ধ:

২২ মার্চ দিবাগত রাতের সেই সাহসিকতার পর আসে ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ এর নামে পিলখানায় চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত ইপিআর সদস্যদের ওপর নেমে আসে নৃশংসতা। সুবেদার মেজর শওকত আলী, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই, নায়েব সুবেদার শামসুল হক ও হাবিলদার খোরশেদ আলমসহ অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে। তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় -নির্যাতন তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। শেষে তাঁদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের পাগলায় শীতলক্ষা নদীর তীরে; সেখানে ব্রাশ ফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁদের। সেদিন রাতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেন তৎকালীন ইপিআরের সিপাহী আব্দুল মালেকসহ পতাকা উত্তোলনকারী বেশ কয়েকজন সদস্য।

শুধু আব্দুল হাই, আব্দুল মালেকেরা নন, তৎকালীন ইপিআরের ১২ হাজার অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজনকে রেখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের ৮১৭ জন সদস্য তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের কাছে পতাকা ছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক; জীবন উৎসর্গের শপথ। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বাহিনীর ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ও ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, ৮ জন বীরউত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার:

এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চের পতাকা উত্তোলনের পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণভিত্তিক বিবরণ উঠে আসে। তথ্যচিত্র আকারে উপস্থাপিত হলে আবেগাপ্লুত হন বিজিবির সদস্যবৃন্দ। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই গৌরবগাঁথা -যেন তারা জানে, সীমান্ত রক্ষার বর্তমান দায়িত্বের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের গভীর ঐতিহ্য। আজও সেই বটবৃক্ষ (পাকুড়গাছ) নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। তার ছায়ায় ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। সে সাক্ষ্য দেয় -কিছু সাহসী মানুষ জীবন বাজি রেখে যে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, তা কেবল একটি প্রতীক নয়; এটি স্বাধীনতার অঙ্গীকার, আত্মমর্যাদার ঘোষণা এবং সীমান্ত রক্ষার অমোঘ প্রেরণা।

জাতীয় পতাকা -আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অতীতে যেমন দায়িত্ব পালন করেছে, আজও তেমনি সতর্ক ও অঙ্গীকারাবদ্ধ। ভবিষ্যতেও থাকবে -জাতির পতাকা সমুন্নত রাখার দৃপ্ত প্রত্যয়ে, ইতিহাসের গৌরব বুকে ধারণ করে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, সদর দপ্তর, বিজিবি।