ঘুষের রেট বাড়িয়েছে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের কানুনগো নাজমুল
- আপডেট: ০৯:১৯:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৮০২৪
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
রাজধানীর মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে ভূমি সেবার নামে চলতে থাকা অরাজকতার চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করে সেবাপ্রত্যাশীদের পকেট কাটতে এবার ঘুষের নির্ধারিত দর এক-তৃতীয়াংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রধান কারিগর কানুনগো নাজমুল। নামজারি ও মিসকেস সংক্রান্ত আবেদনের সংখ্যা কিছুটা কমে যাওয়ার অজুহাতে নিজের অবৈধ আয়ের অংক সচল রাখতে এবং আগের মতোই বিশাল অঙ্কের টাকা পকেটস্থ করতে এই নতুন ঘুষের রেট চালু করেছেন তিনি। এর ফলে জমিজমা সংক্রান্ত কাজে আসা সাধারণ সেবাগ্রহীতারা এক তীব্র আতঙ্ক, সীমাহীন হয়রানি ও নিরূপায় জিম্মিদশার মুখে পড়েছেন। প্রশাসনিক বিধিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারি এই দপ্তরটিকে খোলাখুলিভাবে ঘুষ ও বেআইনি লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা একই দপ্তরে তিন বছরের বেশি অবস্থান করতে না পারলেও অবৈধ ক্ষমতার দাপট ও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কানুনগো নাজমুল বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই একটি সার্কেলে নিজের একচ্ছত্র প্রভাব ও আধিপত্য টিকিয়ে রেখেছেন। সাবেক সরকারের প্রভাবশালী মহলের সাথে সখ্য রক্ষা করা ছাড়াও বদলি ঠেকাতে এবং পদে বহাল থাকতে তিনি প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ লেনদেন করেছেন বলে গুরুতর তথ্য রয়েছে। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের অধীনে থাকা দুটি প্রধান ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট সচল রাখতে নাজমুল নিজের তত্ত্বাবধানে ২২ জনের একটি বিশাল বহিরাগত ওমেদার ও দালাল বাহিনী পরিচালনা করছেন যাদের মাধ্যমে দপ্তরের স্বাভাবিক কাজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
নাজমুল বাহিনীর নতুন নির্ধারিত রেট অনুযায়ী বর্তমানে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে সাধারণ নামজারির আবেদন অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত ঘুষের পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১,৫০০ টাকা। এছাড়া বাণিজ্যিক বা শিল্প প্লটের নামজারি করতে হলে গুণতে হচ্ছে সরাসরি ৪০,০০০ টাকা, অর্পিত সম্পত্তির নামে ঝুলিয়ে রাখা ফাইলের জন্য ধার্য করা হয়েছে ৬০,০০০ টাকা এবং ১/১ সিটি জরিপভূক্ত বা জেলা প্রশাসকের নামে থাকা নথির অনুমোদন পেতে হাঁকা হচ্ছে সর্বোচ্চ ৭০,০০০ টাকা। ভূমির মালিকরা নামজারি বা মিসকেসের আবেদন নিয়ে আসা মাত্রই কানুনগো নাজমুল ও তাঁর সহযোগীরা কৃত্রিম নানা জটিলতা ও নথিপত্রের বিভেদ সৃষ্টি করেন। এরপর নির্দিষ্ট রেট অনুযায়ী ঘুষ পরিশোধ করতে না পারলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, এমনকি আবেদন গায়েব করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। টাকা জমা হওয়ার পর কেবল ফাইলের নীতিগত ছাড়পত্র মেলে। সংগৃহীত এই বিপুল অবৈধ আয়ের বিষয়ে নাজমুলের মন্তব্য আরও বিস্ফোরক। বিভিন্ন সূত্রের মতে তিনি দাবি করে থাকেন যে, ঘুষের এই বিপুল অংক একা তাঁর পকেটে যায় না, বরং রাজস্ব প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ভূমি সংস্কার বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ‘ম্যানেজ’ করতেই তাঁকে ঘুষের হার বাড়াতে হয়েছে। এই পুরো সিন্ডিকেটে কানুনগো নাজমুলের ডানহাত ও বাঁহাত হিসেবে ভূমিকা রাখছেন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা এবং বাইরের ক্যাডাররা। দপ্তরের ভেতরের কার্যক্রমে তাঁকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছেন সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান ও নতুন পদোন্নতি পাওয়া কয়েকজন কর্মচারী। টাকা আদায়ের অন্যতম চালিকাশক্তি নামজারি সহকারী খাদিজা রাজনৈতিক প্রভাব ও সাবেক বিতর্কিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে অফিস নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মাঠপর্যায়ে সেবাপ্রত্যাশীদের পকেট কাটতে সরাসরি কাজ করছেন মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান এবং ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা সঞ্জীব, যারা প্রতিদিন ‘লাইন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার জন্য মতিঝিল অফিসে সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান এবং ধনিয়া অফিসে হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির নামের দালালরা দিনদুপুরে প্রকাশ্যেই মহড়া দেয়।
এই সার্কেলের জালিয়াতি ও বেআইনি অর্থ লেনদেনের মূল কার্যক্রম শুরু হয় রাতের অন্ধকারে। দিনে লোকদেখানো কিছু দাপ্তরিক কাজ হলেও অফিস ছুটির পর বাতি জ্বালিয়ে চলে আসল নথি পরিবর্তন, ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুতকরণ এবং অনৈতিক টাকার ভাগবাটোয়ারা। কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা ফুটেজ যাতে না থাকে সেজন্য কাজ শুরুর আগেই সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। অতি সম্প্রতি মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে এক ব্যক্তির চাচার সম্পদকে আইনি সনদ ছাড়াই ‘নিঃসন্তান’ বানিয়ে ভুয়া কাগজ তৈরি করা হয় এবং শুরুতে ফাইল আটকে রেখে পরবর্তীতে ৫ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়। পূর্বে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নাজির নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও সার্কেলটিতে নাজমুলের নেতৃত্বাধীন ঘুষ বাণিজ্য এতটুকু কমেনি। বর্তমানে ক্যাডার কিরণ এবং নোয়াখালীর হাসানের মাধ্যমে ভেতরে ও বাইরে একাধিক কালেকশন পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ঘুষ জমা হলে ফাইলে বিশেষ কোড বা সংকেত বসিয়ে তা পাসের ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ঘুষের রেট বাড়িয়ে, জালিয়াতি ও ফাইল গুমের মাধ্যমে কানুনগো নাজমুল বিপুল পরিমাণ বেআইনি অর্থ ও অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। নিজের এই বিপুল কালো টাকা আড়াল করতে নাজমুল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে এক ব্যবসায়ীর সুবিশাল বিলাসবহুল বাড়ি নগদ অর্থে কিনে নিয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে বাবুবাজার ব্রিজের কাছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের এক বহুতল ভবন বাগিয়ে নিয়েছেন আপন বোনের নামে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা এই সিন্ডিকেটের খবর প্রকাশ করলে তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ঘুষের রেট বাড়িয়ে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের অতিষ্ঠ করে তোলা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় ভূমি মালিকরা। তারা অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি সংস্কার বোর্ড এবং বিভাগীয় কমিশনারের যৌথ তদন্তের মাধ্যমে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একই স্থানে থেকে ঘুষের রাজত্ব চালানো নাজমুল সহ পুরো সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের হিসাব বের করে কঠোর আইনানুগ শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।




















