১০:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা ডিসি অফিসে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের নতুন মিশন, সাবেক ডিসি মহিবুল ও সার্ভেয়ার মজিবুল সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাত

  • আপডেট: ০৯:১১:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০৮

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

সাবেক ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের চরম অনুগত ও আস্থাভাজন আমলা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিবুল হক ঢাকায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে তার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার কাজে লাগিয়ে ডিসি অফিসে একচ্ছত্র দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বিতর্কিত সার্ভেয়ার মজিবুল হক। আওয়ামী ক্ষমতার প্রভাবে তৎকালীন ডিসি মহিবুল হকের সাথে সার্ভেয়ার মজিবুলের গড়ে উঠেছিল এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। যার মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সমুদয় কার্যক্রমকে হাতের পুতুল বানিয়ে অবাধ ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়ম পরিচালিত হতো। ওই সময়ে মহিবুল হকের একক প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় মজিবুল হক পেশী শক্তি ও রাজনৈতিক বলয়ের এমন দাপট প্রদর্শন করতেন যে, জেলা প্রশাসনের অন্য কোনো সার্ভেয়ার বা কর্মচারীর তার সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ন্যূনতম সাহস ছিল না। সরকারী টাকা আত্মসাৎ দুর্নীতির কারণে কারাবরণ সহ চাকুরিচ্যুত হওয়া এই চতুর সিন্ডিকেট জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা আবার বিভিন্ন ভাবে সক্রিয় এমন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল যে আইন কানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে এক ভাইয়ের অধিগ্রহণকৃত জমির পাওনা ক্ষতিপূরণের কোটি কোটি টাকা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য ভাইয়ের নামে ছাড় করে দেওয়ার মতো গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত করে। এছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন মূল্যবান সরকারি সম্পত্তির কোনো প্রকার আইনানুগ ছাড়পত্র বা সঠিক প্রশাসনিক অনুমোদের প্রক্রিয়া গ্রহণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র সাজিয়ে অনায়াসে বিল প্রদান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে । এমনকি একই জমির ওপর একাধিক খতিয়ান ও দলিল বানিয়ে ‘ওভারল্যাপিং’ বা ক্ষতিপূরণ বিলের ক্ষতিকর দ্বৈত প্রদান সম্পন্ন করার মতো নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছেন এই কুখ্যাত দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড সার্ভেয়ার মজিবুল হক গংরা।
দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই সমস্ত অপকর্মের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও সার্ভেয়ার মজিবুল হক ও তার অনুসারী দালাল চক্রটি ভূমি অধিগ্রহণের বিল হস্তান্তরের নামে নতুন করে সরকারি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ করার এক বিশাল অন্তর্ঘাতমূলক মিশনে মেতে উঠেছে। দাপ্তরিক পদায়ন অনুযায়ী মজিবুল হক কাগজপত্রে এলএ শাখা-১ এর সার্ভেয়ার হলেও তিনি তার ক্ষমতার চরম দাপট দেখিয়ে এলএ শাখা-৩ এর সকল প্রকার দাপ্তরিক কার্যক্রম, ফাইল অনুমোদন ও বিল ছাড়করণের চাবিকাঠি নিজের কব্জায় রেখেছেন। মূলত বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামোগত বিলের ফাইলগুলো এল এ শাখা-৩ এ প্রক্রিয়াকরণ ও চলমান থাকায় তিনি নিয়ম নীতি ভেঙে এই শাখাকে নিজের অপকর্মের প্রধান আস্তানা বানিয়ে নিয়েছেন। নিজ দফতরে অবৈধ আধিপত্য চিরস্থায়ী করতে ও অন্য কর্মচারীদের তটস্থ রাখতে তিনি ‘সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’ নামে রেজিস্ট্রেশন বিহীন নামসর্বস্ব একটি ভুয়া ও সম্পূর্ণ বেআইনি সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং প্রশাসনিক সুরক্ষা পেতে ডিসি অফিসের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা শামীম হুসাইন ৩৩ ব্যাচ সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন । অনুসন্ধানে জানা যায় ৩৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তা শামীম হুসাইন কক্সবাজারে কর্মরত থাকা অবস্থায় সেখানেই অনিয়ম দুর্নীতির সাথে তিনি নিজেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।
প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বছরের পর বছর ধরে ঘুষ, নথি গায়েব, জাল দলিল তৈরি ও কৃত্রিম নামজারি জটিলতার এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে সেবা নিতে আসা ঢাকার সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার সাধারণ জমির মূল মালিকেরা দিনরাত ছুটেও কর্মকর্তাদের অনিচ্ছার কারণে নিজেদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ সাভার অঞ্চলের এক সাধারণ স্কুলশিক্ষক দীর্ঘ দুই বছর ধরে নিজের প্রকৃত জমির নামজারি করতে এসে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে হয়রান হয়ে শেষ পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন, যারা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয় যে মোটা অঙ্কের ঘুষ না দিলে সরকারি দপ্তরে নিজের ফাইল চিরতরে আটকা পড়ে থাকবে।
তদন্তে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, সাধারণ মানুষের নথি আটকে রেখে কৃত্রিমভাবে ‘ফাইল হারিয়ে গেছে’ নাটকের মাধ্যমে গ্রাহকদের বাধ্য করা ডিসি অফিসের পুরনো ট্রাডিশনে পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সিঁড়ি ও করিডোরে ওত পেতে থাকা দালালেরা সর্ব সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ফাইলের চাকা সচল করার অনৈতিক কারবার চালায়। পূর্বের ইতিহাসে দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬ এর অধীনে একাধিক মৌজার মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সর্বোচ্চ মূল্যের মৌজা দর বসিয়ে এবং বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের একটি সম্পূর্ণ অসংশ্লিষ্ট ভুয়া ও জাল দলিল সাজিয়ে কোটি কোটি সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন এই সার্ভেয়ার মজিবুল হক, সার্ভেয়ার কবির হোসেন ও আনিসুর রহমান সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে উক্ত জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় মজিবুল হক গং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। তবে বিস্ময়করভাবে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে মজিবুল হক তার পুরনো চতুরতায় উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ও আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে পুনরায় একই ডিসি অফিসে নিজের স্বপদে পুনর্বাহাল হতে সক্ষম হন। বর্তমানে তিনি ও তার অনুসারী দালাল চক্র মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন (এলএ কেস নং ১৭/২৩-২৪), মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা (এলএ কেস নং ১৫/২৩-২৪) এবং মৌজা: বাড্ডা (এলএ কেস নং ০৭/২৩-২৪) এর কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিল ছাড় করতে ১ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রকাশ্য নগদ কমিশন দাবি করছেন।
বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহনের পর বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেও এই দুর্নীতিবাজদের দমাতে পারেননি। তিনি বলেন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স। কোনো ভুক্তভোগী এই অন্যায্য কমিশন বা ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করলে মজিবুল হক তার পোষ্য ও ভুয়া ব্যক্তিদের দিয়ে ওই জমিতে মিথ্যা ও বানোয়াট ‘মিস কেস’ দায়ের করিয়ে দেন, যার ফলে ক্ষতিপূরণের ফাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে জমির মূল মালিকেরা ঘুষের টাকা তুলে দিতে বাধ্য হন। জেলা প্রশাসনের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নিচতলা থেকে ওপরের তলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুসংগঠিত ঘুষের ভাগবাটোয়ারার কারণে সৎ কোনো কর্মকর্তা কাজ করতে গেলে তাকে কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়। এমতাবস্থায় সেবাপ্রার্থী নাগরিক ও সচেতন সমাজের তীব্র দাবি অবিলম্বে চিহ্নিত দুর্নীতির কারিগর সার্ভেয়ার মজিবুল হক, তার স্ত্রী এবং তার সহযোগী সিন্ডিকেটের সদস্যদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের গোপন লেনদেন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সঠিক নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে ঢাকা ডিসি অফিসের এই দীর্ঘদিনের লুটেরা সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল ও আসল ভয়ংকর রূপ প্রকাশ্যে আসবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

ঢাকা ডিসি অফিসে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের নতুন মিশন, সাবেক ডিসি মহিবুল ও সার্ভেয়ার মজিবুল সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাত

আপডেট: ০৯:১১:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :

সাবেক ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের চরম অনুগত ও আস্থাভাজন আমলা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিবুল হক ঢাকায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে তার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার কাজে লাগিয়ে ডিসি অফিসে একচ্ছত্র দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বিতর্কিত সার্ভেয়ার মজিবুল হক। আওয়ামী ক্ষমতার প্রভাবে তৎকালীন ডিসি মহিবুল হকের সাথে সার্ভেয়ার মজিবুলের গড়ে উঠেছিল এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। যার মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সমুদয় কার্যক্রমকে হাতের পুতুল বানিয়ে অবাধ ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়ম পরিচালিত হতো। ওই সময়ে মহিবুল হকের একক প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় মজিবুল হক পেশী শক্তি ও রাজনৈতিক বলয়ের এমন দাপট প্রদর্শন করতেন যে, জেলা প্রশাসনের অন্য কোনো সার্ভেয়ার বা কর্মচারীর তার সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ন্যূনতম সাহস ছিল না। সরকারী টাকা আত্মসাৎ দুর্নীতির কারণে কারাবরণ সহ চাকুরিচ্যুত হওয়া এই চতুর সিন্ডিকেট জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা আবার বিভিন্ন ভাবে সক্রিয় এমন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল যে আইন কানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে এক ভাইয়ের অধিগ্রহণকৃত জমির পাওনা ক্ষতিপূরণের কোটি কোটি টাকা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য ভাইয়ের নামে ছাড় করে দেওয়ার মতো গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত করে। এছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন মূল্যবান সরকারি সম্পত্তির কোনো প্রকার আইনানুগ ছাড়পত্র বা সঠিক প্রশাসনিক অনুমোদের প্রক্রিয়া গ্রহণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র সাজিয়ে অনায়াসে বিল প্রদান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে । এমনকি একই জমির ওপর একাধিক খতিয়ান ও দলিল বানিয়ে ‘ওভারল্যাপিং’ বা ক্ষতিপূরণ বিলের ক্ষতিকর দ্বৈত প্রদান সম্পন্ন করার মতো নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছেন এই কুখ্যাত দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড সার্ভেয়ার মজিবুল হক গংরা।
দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই সমস্ত অপকর্মের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও সার্ভেয়ার মজিবুল হক ও তার অনুসারী দালাল চক্রটি ভূমি অধিগ্রহণের বিল হস্তান্তরের নামে নতুন করে সরকারি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ করার এক বিশাল অন্তর্ঘাতমূলক মিশনে মেতে উঠেছে। দাপ্তরিক পদায়ন অনুযায়ী মজিবুল হক কাগজপত্রে এলএ শাখা-১ এর সার্ভেয়ার হলেও তিনি তার ক্ষমতার চরম দাপট দেখিয়ে এলএ শাখা-৩ এর সকল প্রকার দাপ্তরিক কার্যক্রম, ফাইল অনুমোদন ও বিল ছাড়করণের চাবিকাঠি নিজের কব্জায় রেখেছেন। মূলত বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামোগত বিলের ফাইলগুলো এল এ শাখা-৩ এ প্রক্রিয়াকরণ ও চলমান থাকায় তিনি নিয়ম নীতি ভেঙে এই শাখাকে নিজের অপকর্মের প্রধান আস্তানা বানিয়ে নিয়েছেন। নিজ দফতরে অবৈধ আধিপত্য চিরস্থায়ী করতে ও অন্য কর্মচারীদের তটস্থ রাখতে তিনি ‘সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’ নামে রেজিস্ট্রেশন বিহীন নামসর্বস্ব একটি ভুয়া ও সম্পূর্ণ বেআইনি সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং প্রশাসনিক সুরক্ষা পেতে ডিসি অফিসের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা শামীম হুসাইন ৩৩ ব্যাচ সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন । অনুসন্ধানে জানা যায় ৩৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তা শামীম হুসাইন কক্সবাজারে কর্মরত থাকা অবস্থায় সেখানেই অনিয়ম দুর্নীতির সাথে তিনি নিজেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।
প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বছরের পর বছর ধরে ঘুষ, নথি গায়েব, জাল দলিল তৈরি ও কৃত্রিম নামজারি জটিলতার এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে সেবা নিতে আসা ঢাকার সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার সাধারণ জমির মূল মালিকেরা দিনরাত ছুটেও কর্মকর্তাদের অনিচ্ছার কারণে নিজেদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ সাভার অঞ্চলের এক সাধারণ স্কুলশিক্ষক দীর্ঘ দুই বছর ধরে নিজের প্রকৃত জমির নামজারি করতে এসে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে হয়রান হয়ে শেষ পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন, যারা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয় যে মোটা অঙ্কের ঘুষ না দিলে সরকারি দপ্তরে নিজের ফাইল চিরতরে আটকা পড়ে থাকবে।
তদন্তে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, সাধারণ মানুষের নথি আটকে রেখে কৃত্রিমভাবে ‘ফাইল হারিয়ে গেছে’ নাটকের মাধ্যমে গ্রাহকদের বাধ্য করা ডিসি অফিসের পুরনো ট্রাডিশনে পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সিঁড়ি ও করিডোরে ওত পেতে থাকা দালালেরা সর্ব সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ফাইলের চাকা সচল করার অনৈতিক কারবার চালায়। পূর্বের ইতিহাসে দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬ এর অধীনে একাধিক মৌজার মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সর্বোচ্চ মূল্যের মৌজা দর বসিয়ে এবং বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের একটি সম্পূর্ণ অসংশ্লিষ্ট ভুয়া ও জাল দলিল সাজিয়ে কোটি কোটি সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন এই সার্ভেয়ার মজিবুল হক, সার্ভেয়ার কবির হোসেন ও আনিসুর রহমান সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে উক্ত জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় মজিবুল হক গং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। তবে বিস্ময়করভাবে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে মজিবুল হক তার পুরনো চতুরতায় উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ও আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে পুনরায় একই ডিসি অফিসে নিজের স্বপদে পুনর্বাহাল হতে সক্ষম হন। বর্তমানে তিনি ও তার অনুসারী দালাল চক্র মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন (এলএ কেস নং ১৭/২৩-২৪), মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা (এলএ কেস নং ১৫/২৩-২৪) এবং মৌজা: বাড্ডা (এলএ কেস নং ০৭/২৩-২৪) এর কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিল ছাড় করতে ১ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রকাশ্য নগদ কমিশন দাবি করছেন।
বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহনের পর বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেও এই দুর্নীতিবাজদের দমাতে পারেননি। তিনি বলেন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স। কোনো ভুক্তভোগী এই অন্যায্য কমিশন বা ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করলে মজিবুল হক তার পোষ্য ও ভুয়া ব্যক্তিদের দিয়ে ওই জমিতে মিথ্যা ও বানোয়াট ‘মিস কেস’ দায়ের করিয়ে দেন, যার ফলে ক্ষতিপূরণের ফাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে জমির মূল মালিকেরা ঘুষের টাকা তুলে দিতে বাধ্য হন। জেলা প্রশাসনের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নিচতলা থেকে ওপরের তলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুসংগঠিত ঘুষের ভাগবাটোয়ারার কারণে সৎ কোনো কর্মকর্তা কাজ করতে গেলে তাকে কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়। এমতাবস্থায় সেবাপ্রার্থী নাগরিক ও সচেতন সমাজের তীব্র দাবি অবিলম্বে চিহ্নিত দুর্নীতির কারিগর সার্ভেয়ার মজিবুল হক, তার স্ত্রী এবং তার সহযোগী সিন্ডিকেটের সদস্যদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের গোপন লেনদেন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সঠিক নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে ঢাকা ডিসি অফিসের এই দীর্ঘদিনের লুটেরা সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল ও আসল ভয়ংকর রূপ প্রকাশ্যে আসবে।