জনবল-লজিস্টিক সংঙ্কটেও নোয়াখালীতে মাদকের বিরুদ্ধে ডিএনসি’র বিরাট সাফল্য
- আপডেট: ০৯:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৮০০৪
নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর
প্রাতিষ্ঠানিক নানান সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকট সত্ত্বেও নোয়াখালী জেলায় মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে জেলাজুড়ে ৮৬৬টি পরিচালনা করে ২১২ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি। এ সময় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক এবং পাচারে ব্যবহৃত যানবাহন ও নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত পরিচালনা করা ৮৬৬টি অভিযানে নিয়মিত ও ২০৩টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মোট ১৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার করা মাদকের মধ্যে রয়েছে- ৬৭ হাজার ৫৫৫ পিস ইয়াবা এবং ০.১৮ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া, ৪৮.৬২০ কেজি গাঁজা এবং ২টি গাঁজা গাছ, চোলাই মদ ১ লিটার ও ১০ বোতল বিদেশি মদ। এছাড়া ১টি সিএনজি, ১টি প্রাইভেটকার, ৪টি মোটরসাইকেল, ১টি অটোরিকশা, ৫৫টি মোবাইল ফোন এবং ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৮০ টাকা নগদ অর্থ জব্দ করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৯৪২টি অভিযান চালিয়ে ৩১২ জন আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছিল। সে বছর ৮৬ হাজার ১০৯ পিস ইয়াবা, ১৫৪.৫৩৫ কেজি গাঁজা, ১টি পিস্তল ও ১৬টি বুলেট জব্দ করা হয়েছিল। আর ২০২৪ সালে ১৬৫৫টি অভিযানে ১৮৪ জন এবং ২০২৩ সালে ২০২২টি অভিযানে ২৭১ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।
মাদক পাচার রুখতে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুব্রত সরকার শুভ বলেন, কৌশলগত স্থানে ৪০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে ১২৯০টি যানবাহন তল্লাশি করা হয়। এতে ১৭টি মামলায় ২২ জন পাচারকারীকে গ্রেফতার এবং ৫৬ হাজার ৩৫৭ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। র্যাব ও পুলিশের সহযোগিতায় ৩৫টি যৌথ অভিযানে ১১ জন আসামি এবং ৪৩ হাজার ১৮৮ পিস ইয়াবা আটক করা হয়। এ ছাড়া ৩২৫টি টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ১৩৫ জন মাদকসেবীকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিসসমূহে ৩২টি তদারকি অভিযান এবং জেলার ১১৫টি ডিনেচার্ড স্পিরিট ও অন্যান্য বৈধ মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে নোয়াখালী জেলার আদালতে ডিএনসির ১০৯৩টি মামলা পেন্ডিং রয়েছে, যার মধ্যে ৭৩৬টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং ৩৫৭টি দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এই পেন্ডিং মামলাগুলোর মধ্যে ২৬৬টি মামলা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বেশ কিছু মামলায় আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আবার তথ্য-প্রমাণের অভাবে কিছু আসামি খালাসও পেয়েছেন।
সুব্রত সরকার শুভ বলেন, নোয়াখালী জেলায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নেই। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সরকারি বিভাগীয় নিরাময় কেন্দ্র কিংবা পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় পাঠাতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ মেয়াদে ২২ জন মাদকাসক্তকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, মাদকের চাহিদা কমাতে ২০২৬ সালে ১২টি আলোচনা সভা, ৭টি সেমিনার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০টি পাঠদান বক্তৃতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ৪টি বক্তব্য এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার লিফলেট, পোস্টার ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে ডিএনসি কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, আধুনিক সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সংকটের মধ্যেও তারা সর্বোচ্চ সাধ্য দিয়ে মাদক নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছেন। জেলার সুশীল সমাজ মনে করেন, সরকারি লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারিবারিক নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া মাদক পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
নোয়াখালী জেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে:
আঞ্চলিক সিন্ডিকেট ও অনলাইন বিস্তার: প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক পাচারের নতুন কৌশল এবং দুর্গম নদী ও চরাঞ্চল এলাকায় নজরদারির অসুবিধা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ: শিল্প-কারখানার অভাব ও তরুণদের বেকারত্ব, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের অপব্যবহার এবং সামাজিক বিনোদনের ক্ষেত্রের ঘাটতি।
লজিস্টিক ও জনবল সংকট: সংস্থায় মঞ্জুরীকৃত ৩১টি পদের বিপরীতে ৬টি পদ (সহকারী পরিচালক, পরিদর্শক, সহকারী প্রসিকিউটরসহ) শূন্য রয়েছে। পুরো অপারেশন শাখায় কোনো নারী সদস্য নেই।
অবকাঠামোগত সমস্যা: নিজস্ব ভবন না থাকায় ভাড়া বাসায় অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। পুরো জেলার জন্য মাত্র ১টি যানবাহন রয়েছে, যা জরুরি অভিযানের জন্য অপ্রতুল। উপজেলা পর্যায়ে কোনো দপ্তর না থাকায় দূরবর্তী এলাকায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।









