গুমের শিকার সালাহউদ্দিন আহমদ পেলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব
- আপডেট: ১০:১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৮০৪৫
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ার পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে গঠন করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদও। এতে দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলটির জ্যেষ্ঠ ও ত্যাগী নেতারা। তাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথবাক্য পাঠ করেন
সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজার জেলার তৎকালীন বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতার নাম বেগম আয়েশা হক।
পেকুয়াতে প্রাথমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করে কিশোর সালাহ উদ্দিন আহমদ পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় হতে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে ১৯৭৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন ১৯৮০ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অ্যাডভোকেট হিসেবে সনদ লাভ করেন। ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় ১৯৮৫ সালে অংশ নিয়ে তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বিসিএস (প্রশাসন) চাকরিতে যোগদান করেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে যোগ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতিসহ সফলতার সঙ্গে আরো বিভিন্ন পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করেন। কিছুদিন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রদলের দায়িত্বে থাকাকালে স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন অনেকবার।
বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে এই সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নেমে পড়েন। এরপর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একটানা তিনবার কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি রেকর্ড সৃষ্টি করেন। সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করেন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর চারদলীয় জোট দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করলে সালাহ উদ্দিন আহমদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার ইনচার্জ মিনিস্টার হিসাবেও দায়িত্বপালন করেন তিনি। ২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ বছর ২ মাস ওয়ান ইলাভেন সরকারের কারাগারে বন্দী থেকে ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ তিনি কারামুক্ত হন। পরে ২০১০ সালে বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে সালাহ উদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্মমহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ভারতের মেঘালয়ের সিলং শহরে নির্বাসিত থাকাবস্থায় বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালে দেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ঐ বছরের ১০ মার্চ গুমের শিকার হন সালাহউদ্দিন আহমদ,দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের শিলংয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ভারতের শিলং থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
শিলংয়ের কারাগারে বন্দি জীবন,নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় নিজের শেষ নির্বাচনি সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন,আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না,আমাকে গুম করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশে। আপনারা দোয়া করেছেন,রাব্বুল আলামিন আপনাদের মোনাজাত শুনেছেন এবং আমাকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমার এই নতুন জীবন, এই বর্ধিত হায়াত এ দেশের মানুষের সেবা করার জন্য। আমার জন্ম হয়েছে এ দেশের উন্নয়নের জন্য, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না বলেন,কক্সবাজারবাসীর প্রিয় নেতা সালাউদ্দিন আহমদ পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব¡ পাওয়ায় আমরা কক্সবাজারবাসী অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। আমাদের জেলার একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতার হাতে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বড় অর্জন। আমরা তাঁর প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাঁর নেতৃত্বে দেশ ও জনগণ আরও বেশি নিরাপত্তা,স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, ‘একইসঙ্গে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং সংসদের উপনেতা হিসেবে শপথ গ্রহণ করায় আমরা গভীরভাবে আনন্দিত। এটি বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বাংলাদেশের নতুন এই অগ্রযাত্রায় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশ ও জনগণের কল্যাণে এই নতুন অধ্যায় সফল হোক-এই কামনা করি।’
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত বিপু বলেন,পুরো জেলাবাসীর জন্য আজকে গৌরবের দিন,আমরা একজন যোগ্য মানুষকে মন্ত্রী হিসেবে পেতে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ পুরো দেশের সাথে সালাহউদ্দিন আহমদের যোগ্য নেতৃত্বে আরো সমৃদ্ধ হবে আমাদের কক্সবাজার।
উল্লেখ্য,ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকাস্থ উত্তরার একটি বাড়ী থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে অচেনা মুখোশধারী অপহরনকারীরা সালাহউদ্দিন আহমদকে চোখ বেঁধে গুপ্ত স্থানে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে ভারতে পাওয়া যায়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১১ আগস্ট ২০২৪ সালে তিনি দেশে ফেরেন।




















