ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কিটামিন পাচার, উত্তরায় চীনা চক্রের ল্যাব ধরা
- আপডেট: ০১:২৬:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৮০০৬
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
রাজধানী ঢাকায় গোপনে কিটামিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপন করে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযানে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন,বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য ও ল্যাব সরঞ্জাম জব্দের পাশাপাশি তিন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ডিএনসির তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রীলঙ্কাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মাদক বাণিজ্য পরিচালনা করছিল এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অভিনব কৌশলে এসব মাদক পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছিল।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন যাবত কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান পরিচালনা করে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়। পরবর্তীতে পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভিতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পায় ডিএনসি। পরবর্তীতে একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিক–লি বিন, ইয়াং চুনশেং ও ইউ ঝে’কে আটক করা হয়।
এ অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য (সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল), বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করে যে, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করতো এবং পরবর্তীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করতো।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করত এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভিতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করতো।
ডিএনসি আরও জানায়, অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা মূলত TRON নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করতো এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করতো।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করতো এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করতো। এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপিত থাকতে পারে। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব সহকারে তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখত। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে।
মানবদেহে কিটামিনের ক্ষতিকর প্রভাব:
কিটামিন (Ketamine) একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


















