০৫:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

নোয়াখালীতে অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশ বিপর্যয়, রহস্যে ঘেরা প্রশাসনের ভূমিকা

  • আপডেট: ১২:৫৫:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৮০০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর

নোয়াখালী জেলায় একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা। এসব ভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফসলি জমি ও বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

সরেজিমন জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের পশ্চিম চরজব্বর গ্রামের ‘মেসার্স তাহেরা ব্রিক ফিল্ড’। এই ইট ভাটায় ঢুকতেই দেখা যায়, করাতকলের মাধ্যমে কাটা হচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। সেই কাঠ জ্বালিয়েই পাশেই পোড়ানো হচ্ছে ইট। এছাড়া, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের দিয়েও ইট তৈরি ও কাঁচামাল বহনের কাজ করানো হচ্ছে। এই ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিনিয়তই অসুস্থ হচ্ছেন প্রতিবেশী নারী ও শিশুরা।

এই ইট ভাটার পাশের একাধিক বাসিন্দা বলেন- গত কয়েক বছর ধরেই ভাটাটি অবৈধভাবে চালানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর’সহ উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সিজনের শুরুতে নামে মাত্র অভিযান চালিয়ে সামন্য জরিমানা আদায় করাতেই সীমাবদ্ধ প্রশাসনের ভূমিকা। এরপর পুরো সিজনজুড়ে চলে এই অবৈধ কার্যক্রম। তাদের অভিযোগ- উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই চলছে এই ইটভাটা।

শুধু তাহেরা ব্রিক ফিল্ডই নয়, পুরো উপজেলাজুড়ে আলিফ, এ.কে.বি, আল্লাহর দান, একতা, যমুনা, মুক্তা, মহিন, রোহান, পপুলারসহ অন্তত ১৫টি ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে। জেলার হাতিয়া উপজেলাতেও একই চিত্র। সেখানে প্রায় সব ইটভাটাই চলছে অবৈধভাবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর, নোয়াখালীর তথ্যমতে- জেলায় মোট ১১৫টি ইটভাটার মধ্যে ৫৯টি বৈধ এবং ৫৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা দেড় শতাধিক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফসলি জমি ও বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ ভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। এর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, পরিবেশ বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং বাড়ছে নানা রোগব্যাধি। তাদের দাবি, প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই চলছে এসব অবৈধ ইটভাটা। সিজনের শুরুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি ভাটায় অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও, পরে আর তদারকি থাকে না। ফলে পুরো মৌসুমজুড়েই নির্বিঘেœ চালানো হয় অবৈধ কার্যক্রম।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা হলেও, আদালতের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চালু থাকে এসব ইটভাটা। এতে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক এবং ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ।

অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকলেও, অজানা কারণে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি বলেন- অবৈধ ইট ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে সিজনের শুরুতেই আমরা ৬টা অভিযান করেছি। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার পাশাপাশি আমাদের চট্রগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তার মহোদয়ের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলামান রয়েছে। শীঘ্রই আবারো অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তবে সিজন শেষে এখন অভিযান চালানো হলে তা কতটুকু কার্যকর হবে এমন প্রশ্নে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা কোন সঠিক জবাব দিতে পারেননি।

পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে শুধু অভিযান আর পরিকল্পনা নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান স্থানীয়রা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

নোয়াখালীতে অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশ বিপর্যয়, রহস্যে ঘেরা প্রশাসনের ভূমিকা

আপডেট: ১২:৫৫:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনালী খবর

নোয়াখালী জেলায় একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা। এসব ভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফসলি জমি ও বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

সরেজিমন জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের পশ্চিম চরজব্বর গ্রামের ‘মেসার্স তাহেরা ব্রিক ফিল্ড’। এই ইট ভাটায় ঢুকতেই দেখা যায়, করাতকলের মাধ্যমে কাটা হচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। সেই কাঠ জ্বালিয়েই পাশেই পোড়ানো হচ্ছে ইট। এছাড়া, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের দিয়েও ইট তৈরি ও কাঁচামাল বহনের কাজ করানো হচ্ছে। এই ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিনিয়তই অসুস্থ হচ্ছেন প্রতিবেশী নারী ও শিশুরা।

এই ইট ভাটার পাশের একাধিক বাসিন্দা বলেন- গত কয়েক বছর ধরেই ভাটাটি অবৈধভাবে চালানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর’সহ উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সিজনের শুরুতে নামে মাত্র অভিযান চালিয়ে সামন্য জরিমানা আদায় করাতেই সীমাবদ্ধ প্রশাসনের ভূমিকা। এরপর পুরো সিজনজুড়ে চলে এই অবৈধ কার্যক্রম। তাদের অভিযোগ- উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই চলছে এই ইটভাটা।

শুধু তাহেরা ব্রিক ফিল্ডই নয়, পুরো উপজেলাজুড়ে আলিফ, এ.কে.বি, আল্লাহর দান, একতা, যমুনা, মুক্তা, মহিন, রোহান, পপুলারসহ অন্তত ১৫টি ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে। জেলার হাতিয়া উপজেলাতেও একই চিত্র। সেখানে প্রায় সব ইটভাটাই চলছে অবৈধভাবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর, নোয়াখালীর তথ্যমতে- জেলায় মোট ১১৫টি ইটভাটার মধ্যে ৫৯টি বৈধ এবং ৫৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা দেড় শতাধিক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফসলি জমি ও বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ ভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। এর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, পরিবেশ বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং বাড়ছে নানা রোগব্যাধি। তাদের দাবি, প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই চলছে এসব অবৈধ ইটভাটা। সিজনের শুরুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি ভাটায় অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও, পরে আর তদারকি থাকে না। ফলে পুরো মৌসুমজুড়েই নির্বিঘেœ চালানো হয় অবৈধ কার্যক্রম।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা হলেও, আদালতের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চালু থাকে এসব ইটভাটা। এতে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক এবং ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ।

অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকলেও, অজানা কারণে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি বলেন- অবৈধ ইট ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে সিজনের শুরুতেই আমরা ৬টা অভিযান করেছি। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার পাশাপাশি আমাদের চট্রগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তার মহোদয়ের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলামান রয়েছে। শীঘ্রই আবারো অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তবে সিজন শেষে এখন অভিযান চালানো হলে তা কতটুকু কার্যকর হবে এমন প্রশ্নে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা কোন সঠিক জবাব দিতে পারেননি।

পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে শুধু অভিযান আর পরিকল্পনা নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান স্থানীয়রা।