প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে আলোচনায় আমিনবাজার ভূমি অফিস
- আপডেট: ০৬:০৮:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
- / ১৮০৩০
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
সাভারের আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন খানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ, জনভোগান্তি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার যে আলোচনা স্থানীয় পর্যায়ে চলছিল ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আকস্মিক পরিদর্শনের পর তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গতকাল সোমবার (৮ জুন) সকালে প্রতিমন্ত্রীর হঠাৎ পরিদর্শনে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি, নাগরিক সেবায় দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার যে চিত্র সামনে এসেছে তাতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর প্রতি কি অবশেষে প্রশাসনের নজর পড়তে শুরু করেছে। বিসিএস ৩৮ ব্যাচের কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন খান বর্তমানে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দায়িত্বকালকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সেবাপ্রার্থীদের পক্ষ থেকে সেবা পেতে বিলম্ব, ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, দালালদের প্রভাব এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের বিষয়গুলো এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন খানের অনুপস্থিতি। জানা যায় প্রতিমন্ত্রী অফিসে পৌঁছানোর সময় তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর তিনি অফিসে আসেন। একই সঙ্গে কার্যালয়ের মোট আটজন কর্মকর্তার মধ্যে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন। বিষয়টি দেখে প্রতিমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতি যাচাইয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনের সময় সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিমন্ত্রী জানতে পারেন অনেক মানুষকে একই কাজের জন্য বারবার অফিসে আসতে হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত সময়ে সেবা না পাওয়া, ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ার অভিযোগ করেন তারা। এসব অভিযোগ শুনে প্রতিমন্ত্রী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উল্লেখ্য এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলকে ঘিরে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সোনালী খবরসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয় এবং অফিসে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছিল যে, নামজারি, খারিজ, রেকর্ড সংশোধন ও তদন্ত প্রতিবেদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো নিয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি শাহাদাত হোসেন খানের দায়িত্বকালে অফিসে কথিত দালালচক্রের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অফিস সহকারীসহ কয়েকজন ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে যাদের বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে মধ্যস্থতার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও সম্পন্ন হয়নি। কিছু সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেন ভূমি সংক্রান্ত কিছু ফাইল নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক সময় লাগছে। তাদের দাবি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যদিও কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে সার্ভার জটিলতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নথিপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা জানান দীর্ঘদিন ধরে সার্ভারজনিত সমস্যার কারণে নামজারি বা মিউটেশন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি তথ্যকেন্দ্রকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনে তথ্যকেন্দ্র-কাম-হেল্প ডেস্কের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রতিমন্ত্রী। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে তথ্য ও সেবা পেতে পারেন সে জন্য গঠিত এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে রেকর্ড কিপিং ও ডেটা এন্ট্রি ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও কাজ তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল বলে জানা গেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শন আমিনবাজার ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাদের বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে যেসব অভিযোগ বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলোর সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়মুক্তি পাবেন, আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে ভূমি অফিসে সেবা সংক্রান্ত অনিয়ম বা প্রশাসনিক দুর্বলতা শুধু একটি অফিসের সমস্যা নয় এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত। ফলে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর স্থানীয়দের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরু হবে কি না। বিশেষ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন খানের দায়িত্বকাল নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও বিতর্ক বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে সেগুলোরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিদর্শন শেষে ভূমি প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শুধু অফিসে উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট নয় জনগণকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানসম্মত সেবা প্রদান নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। তার এই বক্তব্যকে অনেকেই আমিনবাজার ভূমি অফিসসহ দেশের অন্যান্য ভূমি প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্নের অবসান ঘটিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




















