হাউসবোটের হাত ধরে কর্মসংস্থান:হাওরপাড়ের তরুণদের নতুন স্বপ্ন
- আপডেট: ০১:১১:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / ১৮০০১
সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে মো.দীন ইসলাম,ঢাকা
বর্ষাকাল মানেই একসময়ে ছিল সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, মধ্যনগর কিংবা ধর্মপাশার হাওরপারের তরুণদের জন্য এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার ও অলস সময়। চারদিকে অথৈ জল,কাজের অভাব, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চেনা দৃশ্যপটে আজ লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।
শত শত বিলাসবহুল ও মাঝারি হাউসবোটের আগমনে হাওরের থৈ থৈ জলরাশি এখন কেবল পর্যটকদের আনন্দই দিচ্ছে না, বরং জন্ম দিচ্ছে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের। হাওরপারের বেকার যুবকদের চোখে বুনে দিচ্ছে আত্মনির্ভরশীলতার নতুন স্বপ্ন।
টঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে আগে বর্ষা মানেই ছিল জীবনযাত্রার গতি শ্লথ হয়ে যাওয়া। মাছ ধরা বা ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে তরুণদের বেশিরভাগই অলস সময় কাটাতেন অথবা জীবিকার তাগিদে রাজধানী কিংবা বড় শহরে পাড়ি জমাতেন। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের প্রসারে সেই দিন এখন অতীত। হাওরে এখন চলাচল করছে কয়েকশ হাউসবোট। কয়েক বছর আগেও যেখানে হাওরে কেবল ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকা চলত, সেখানে আজ রয়েছে বিলাসবহুল থেকে শুরু করে মাঝারি মানের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি সুসজ্জিত হাউসবোট।
প্রতিটি হাউসবোট তৈরিতে খরচ হয় ১৫ লাখ থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত। আর এই হাউসবোটগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো এই হাওরেরই স্থানীয় তরুণরা।
একটি হাউসবোট কেবল একটি ভাসমান জলযান নয়,এটি মিনি-হোটেলের মতো একটি স্বাবলম্বী ইকোসিস্টেম। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুমুখী পেশা। এখানকার ঐতিহ্যবাহী নৌকার কারিগর বা স্থানীয় জেলেরা এখন আধুনিক ইঞ্জিনের হাউসবোট চালনায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন। পর্যটকদের ঐতিহ্যবাহী হাওরের খাবার পরিবেশন করতে স্থানীয় তরুণরা যুক্ত হচ্ছেন রান্নার কাজে।
সেইসঙ্গে হাওরের কূল-কিনারা,পাখি ও ঝরনার সঙ্গে পরিচিত স্থানীয় তরুণরাই এখন সেরা ট্যুর গাইড। বোটের বিদ্যুৎ, কাঠ ও ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। ঘাটে পর্যটকদের পৌঁছে দিতে সিএনজি, মোটরসাইকেল এবং বাইক চালকদের সিংহভাগই তরুণ।
তাহিরপুরের তরুণ রাশেদ আহমেদের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর। কয়েক বছর আগেও জীবিকার টানে ঢাকায় রিকশা চালানো বা গ্যারেজে কাজ করার কথা ভাবতেন তিনি।
আজ তিনি একটি নামকরা হাউসবোটের প্রধান চালক ও ব্যবস্থাপক। তার মাসিক আয় এখন কেবল তার নিজের পরিবারকেই সচ্ছল করেনি, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও জুগিয়েছে। রাশেদের মতো শত শত তরুণের মুখে আজ হাসির ঝিলিক।
তাহিরপুরের জয়াল পুরের তরুণ পারভেজ আহমেদ একসময় ঢাকায় একটা তৈরি পোশাক কারখানায় অল্প বেতনে কাজ করতেন। বোট সংস্কৃতির ছোঁয়ায় তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি একটি বড় হাউসবোটের মূল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পারভেজের মতে,শহরের ঘিঞ্জি জীবনে নিজের কোনো আত্মসম্মান ছিল না। এখন নিজ গ্রামে কাজ করে বাবা-মায়ের সাথে থাকতে পারছি,আয়ও দ্বিগুণ।
হাউসবোটভিত্তিক এই কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক মুক্তি আনেনি,এটি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতাও তৈরি করেছে। অনেকেই নিজেরা ছোট ট্রলার বা বোট কিনে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেছেন।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জেলেরা দৈনিক সোনালী খবরকে বলেন,আগে হাওর থাইকা মাছ ধইরা পাইকারদের কাছে কম দামে বেইচা দিতে বাধ্য হইতাম। অহন পর্যটক ভাইরা আইসা সরাসরি আমদের কাছ থাইকা বড় আইড়,বোয়াল আর দেশি হাঁস ভালো দামে কিনা নেয়। আমাদের মতো সাধারণ জেলে ও খামারিদের জন্য পর্যটন এক বড় আশীর্বাদ। এছাড়া, হাউজবোটের কারণে আমাদের মুদি দোকানসহ অন্যান্য বেচা-বিক্রি বেড়েছে।
হাউজবোটে একটি মাত্র ট্যুর প্যাকেজের মাধ্যমে পর্যটকরা হাওরের মূল জলাভূমির পাশাপাশি আশপাশের বহু ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান ভ্রমণের সুযোগ পান। এরমধ্যে রয়েছে – হাওরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াচটাওয়ার এলাকা এবং চারপাশের হিজল-করচের জলজ বন;টেকেরঘাটের চুনাপাথরের পরিত্যক্ত খনি, যা বর্তমানে নীলাভ পানির এক অপরূপ জলাধারে পরিণত হয়েছে এবং এখানকার ভারতের সীমান্তবর্তী আসা পানিতে লাকমা ছড়া যেন সিলেটের সাদা পাথরের রুপের স্বাদ দিবে; পাহারের কোল ঘেঁষে নিলাদ্রি লেকের সৌন্দর্য্য যেন আপনাকে নিয়ে যাবে নিউজিল্যান্ডে;যাদুকাটা নদী ও বারিক্কা টিলায় মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নদী এবং সবুজ টিলা;এখানে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিমুল বাগান বসন্তের পাশাপাশি বর্ষাতেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
হাউজবোট ওনার্স এসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আরাফাত হোসাইন দৈনিক সোনালী খবরকে বলেন,একসময়ে হাওরে এক দীর্ঘ সময় পানিতে টইটম্বুর থাকার কারণে মানুষ বেকার থাকতো। কিন্তু হাউজবোটের কারণে এখানে পর্যটন ব্যবস্থা সহজ হয়েছে,বলা যায় হাওর তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এছাড়া,পর্যটন ব্যবস্থা শুরু হওয়ায় এখানের স্থানীরা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছেন। পানির মৌসুমে তারা আর বেকার থাকছেন না। কোনো কোনো উপায়ে হাউজবোট ও পর্যটন ব্যবস্থার কারণে স্থানীয়রা জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে স্থানীয় প্রশাসনকে এই দিকে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় অনকে অসাদু মানুষের কারণে দূর থেকে আগত ব্যবসায়ীরা নানান সমস্যার সম্মুখীন হন। সেইসঙ্গে সড়ক ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে হাওরের এই পর্যটন ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি সাফওয়ান দৈনিক সোনালী খবরকে বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনখাতের দিকে সরকার আরও সু-দৃষ্টি দিলে এখান থেকেই জাতীয়ভাবে অর্থনীতে অবদান রাখা সম্ভব। হাওরে পর্যটন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। আশা করছি হাওরে পর্যটনখাত আরো এগিয়ে যাবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোট পর্যটনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে,এর মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের মানুষের আর্থিক অবস্থা তথা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবের বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান দৈনিক সোনালী খবরকে বলেন,আমাদের যে টাঙ্গুয়ার হাওর বা হাওরবেষ্টিত যে পর্যটন শিল্প আছে,সেটা ওখানের সাধারণ এলাকাবাসীর নাগরিক জীবনে অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। সেটা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কাজ করছি। হাউজবোটগুলোতে পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। পর্যটকরা কিন্তু এখানে লোকাল খাবারগুলোই খাচ্ছে। তো সেই ক্ষেত্রে হাওরের মাছ,হাঁস,দেশি মুরগি,চাল,ডালসহ যা তৈজসপত্র-সবই কিন্তু লোকাল বাজার থেকেই হাউজবোট ওনার্সরা কিনতেছে। সেক্ষেত্রে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা অবধারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তাছাড়া যে পর্যটন এলাকাগুলো আছে সেসব জায়গায় যখন লোকজন যায়, সেখান থেকেও লোকাল জিনিসপত্র কিনে পর্যটকরা। এটা অবশ্যই আমাদের লোকাল লোকদের ক্ষেত্রে পজিটিভ একটা সাইড।
সকড় পথের বেহাল অবস্থা দূর হলে পর্যটক আরও বাড়বে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা আসলে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করার চেষ্টা করতেছি, যাতে পর্যটন এরিয়া যেগুলো আছে সেখানে রাস্তার কাজগুলো ভালো হয়। এটা নিয়ে আমাদের জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে নিয়মিত আলোচনা হয়।
যাতে এলজিইডির যে রাস্তার অংশটুকু আছে,এলজিইডি যাতে সেটা সঠিকভাবে এবং সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করে। আমাদের ছয় লেনের যে রাস্তার কাজ হচ্ছে,এইটা আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই ধীরগতিতে। এটা নিয়েও আমাদের মাসিক মিটিংগুলোতে আলোচনা হয় এবং আমরা এক্সেন মহোদয়কে সরাসরি একটা চিঠিও দিয়েছি যে,দ্রুততম সময়ে যেন কাজটা শেষ করতে পারেন। এছাড়া আরও কিছু এলজিইডির কাজ আছে। একটা বাধাঁঘাটি ব্রিজ আছে এলজিইডির,এটার কাজ অর্ধসমাপ্ত। এটা নিয়েও আমরা তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি যাতে দ্রুত সমাপ্ত হয়। এছাড়া আমাদের উপজেলা পরিষদের অধীনে যে সকল রাস্তাঘাট আছে-তাদেরকেও আমরা জানিয়ে দিয়েছি যাতে তারা এই সকল বিষয়ে প্রজেক্টগুলো নিতে পারে। অন্য প্রজেক্টের মাধ্যমেও এগুলো নিয়ে নিতে পারলে রাস্তাঘাট বা পরিবহনটা আরও সহজ হবে।
বাইরের জেলাগুলো থেকে অনেকে এখানে এসে ব্যবসা করা হাউজবোটের মালিকরা স্থানীয় প্রভাবশালী বা অসাধু চক্রের মাধমে ক্ষতির সম্মুখীন হন,তাদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। আমাদের হাউজবোট ওনার্স যারা আছে,তাদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং করি আমরা। এখন পর্যন্ত তারা এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে করে নাই। যদি এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, সত্যতা পাওয়া যায়- আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেব।



















