নোয়াখালী সিটি করপোরেশন ও বিভাগ বাস্তবায়নে বিলম্ব কেন?
- আপডেট: ০৬:১২:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৮০০৪
লেখক :মোহাম্মদ সোহেল বাদশা
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন থেকে বেরিয়ে এসে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় নোয়াখালীকে দ্রুত সিটি করপোরেশন এবং বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা শুধু একটি দাবি নয়- এটি সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন।
নোয়াখালী বহুদিন ধরেই অবহেলিত সম্ভাবনার প্রতীক। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই জনবহুল অঞ্চলটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক কাঠামোয় এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পায়নি। অথচ জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয়ের দিক থেকে নোয়াখালী একটি পূর্ণাঙ্গ সিটি করপোরেশন হওয়ার সব যোগ্যতা ইতোমধ্যে অর্জন করেছে।
বর্তমানে নোয়াখালী পৌরসভা একটি বিস্তৃত নগর জনপদকে ধারণ করছে, যেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে জনসংখ্যা ও নাগরিক চাহিদা। কিন্তু পৌরসভার সীমিত কাঠামো ও বাজেট দিয়ে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নাগরিকরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন- যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবার মতো সমস্যাগুলো দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এই অবস্থার উত্তরণে নোয়াখালী পৌরসভা ও দেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক শহর চৌমুহনী পৌরসভাকে নিয়ে ‘নোয়াখালী সিটি করপোরেশন’ গঠন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য। একই সঙ্গে নোয়াখালীকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তব রূপ পাবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে থাকায় নোয়াখালীসহ আশপাশের জেলার মানুষকে অনেক প্রশাসনিক সেবার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় ও অর্থ-উভয়েরই অপচয় হয়। নোয়াখালী বিভাগ গঠিত হলে লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর’সহ আশপাশের জেলাগুলো সরাসরি প্রশাসনিক সুবিধার আওতায় আসবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মেঘনা নদী ও উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থান নোয়াখালীকে দিয়েছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি উৎপাদন এবং নৌ-বাণিজ্যের বিশাল সুযোগ। এর পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এই অঞ্চলের মানুষের মাধ্যমে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সহায়তার অভাবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন ও বিভাগ গঠন করা হলে বিনিয়োগ বাড়বে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নোয়াখালী একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এখানে রয়েছে বহু স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু বিভাগীয় মর্যাদা না থাকায় এই খাতগুলোও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিভাগ গঠিত হলে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা জাতীয় পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে এই দাবি বাস্তবায়নে শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। সিটি করপোরেশন গঠনের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে বিভাগ গঠনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে এই প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সবকিছু বিবেচনায় একথা স্পষ্ট যে, নোয়াখালী সিটি করপোরেশন এবং বিভাগ বাস্তবায়ন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন নয়- এটি বর্তমানের জরুরি প্রয়োজন। এই দুটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু নোয়াখালী নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
অতএব, সরকারের কাছে দৃঢ় আহ্বান- জনগণের দীর্ঘদিনের এই ন্যায্য দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হোক। নোয়াখালী সিটি করপোরেশন ও বিভাগ ঘোষণা হবে উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক:মোহাম্মদ সোহেল বাদশা
সাংবাদিক নাগরিক টেলিভিশন ও ভোরের কাগজ।



















