এসিল্যান্ড শাহাদাতের ঘুষ বাণিজ্যে সেবা প্রার্থীরা জিম্মি
- আপডেট: ০৬:৫১:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
- / ১৮০১৫
মোঃ মনিরুজ্জামান মনিরঃ
বাংলাদেশের ভূমি অফিসকে ঘিরে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, দালাল ছাড়া ফাইল এগোয় না, আর ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভূমি অফিস নিয়ে এমন অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল-কে ঘিরে সম্প্রতি যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে তা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সাভার উপজেলাধীন ৪৪টি মৌজা নিয়ে গঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সার্কেল এখন স্থানীয়দের কাছে ঘুষের কারখানা হিসেবেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠছে। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিসিএস ৩৮ ব্যাচের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন খান। স্থানীয় ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের নানা বক্তব্য দিলেও বাস্তবে তার নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক ঘুষ, দালাল ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। নামজারি, খারিজ, রেকর্ড সংশোধন, জমি পরিমাপ, তদন্ত প্রতিবেদন সব ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া কাজ এগোয় না। স্থানীয়দের ভাষায় – এখন আমিনবাজার ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া ফাইলের পাতাও নড়ে না।
অভিযোগ রয়েছে এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান অতীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনের ভেতরে ক্ষমতাবান মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। আর সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই এখনো অফিসে একটি অঘোষিত বলয় তৈরি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি তবুও স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন এই অভিযোগই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য অফিস সহকারী (কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক) গাজী মাহামুদ হাসান যিনি এলাকায় ‘ওমেদার ইভান’ নামে বেশি পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন এডিসি রাজস্ব ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি যাদের চাকরি দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মতিঝিলের রাকিব ও গাজী মাহামুদুল হাসান ওরফে ওমেদার ইভান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এক অপ্রতিরোধ্য প্রভাববলয়। বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এই ব্যক্তিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ।
তাছাড়া গাজী মাহামুদুল হাসান ওরফে ওমেদার ইভান অফিসের ভেতরে নিজের আলাদা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। তার অনুমতি ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এগোয় না বলেও দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি নিজের আপন শ্যালককে অফিসে এনে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য বহিরাগতদের অফিসের ভেতরে এনে বসিয়ে রাখার বিষয়টি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গাজী মাহামুদুল হাসান ওরফে ইভানের নির্দেশেই বিভিন্ন ব্যক্তি অফিসে অবাধে প্রবেশ করে এবং ফাইল ম্যানেজ করার নামে টাকা লেনদেন করে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে সিসিটিভি ফুটেজ থেকেই বেরিয়ে আসবে কারা অফিসের ভেতরে রাম রাজত্ব চালাচ্ছে এমন মন্তব্যও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে ওমেদার দালাল হিসেবে পরিচিত জসিম ওরফে জইসা। এই ব্যক্তি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় থেকে কোটি কোটি টাকার ভিপি (ভেস্টেড প্রপার্টি) সম্পত্তি বাগিয়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয় সেই সম্পত্তির ওপর এখন বহুতল ভবন নির্মাণের কাজও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হলে ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে অতীতে কয়েকবার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও প্রতিবারই পরিস্থিতি ম্যানেজ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে নতুন কোনো এসিল্যান্ড যোগদান করলেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের টাকার মাধ্যমে তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এরপর আবার শুরু হয় আগের মতো দালালতন্ত্র, ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের রাম রাজত্ব। স্থানীয়দের দাবি বর্তমান এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান-এর সময় সেই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নামজারী ও মিসকেসে ঘুষ বাণিজ্য হয় সরাসরি এসিল্যান্ড শাহাদাতের নির্দেশনায়।
তাছাড়া সাদুল্যাপুর ক্যাম্প অফিসকে কেন্দ্র করেও উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ। এই অফিস এখন বহিরাগত দালালদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে নিয়মিত কোনো ভূমি সহকারী বা উপসহকারী কর্মকর্তার উপস্থিতি না থাকলেও দালালরাই পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ মানুষ নামজারি বা জমি সংক্রান্ত কাজে গেলে প্রথমেই তাদের ঘিরে ধরে দালাল চক্র। নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে বলা হয় সরাসরি করলে সময় লাগবে, ফাইল আটকে যাবে, উপরের অনুমতি লাগবে। পরে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই দালাল চক্র সরাসরি এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান-এর আশীর্বাদপুষ্ট।
স্থানীয় সূত্র জানায় প্রতি সপ্তাহে গোপনে বসে নামজারি ও অন্যান্য ফাইল থেকে ওঠা টাকার হিসাব নেওয়া হয়। কোন কেস থেকে কত টাকা উঠলো, কার মাধ্যমে আদায় হলো সবকিছুর হিসাব রাখা হয় সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে। রাব্বি নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে টাকার ভাগ নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি নামজারি কেসের জন্য আলাদা কোড ব্যবহার করা হয় যাতে বাইরের কেউ বুঝতে না পারে কোন ফাইল থেকে কত টাকা আদায় হয়েছে।
সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও কাজের অগ্রগতি জানতে পারেন না। কখনও বলা হয় রিপোর্ট আসেনি, কখনও সার্ভেয়ার ব্যস্ত, আবার কখনও ফাইল উপরে আছে বলে ঘুরানো হয়। অথচ দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে কয়েক দিনের মধ্যেই একই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। একাধিক সেবাপ্রত্যাশী জানিয়েছেন তারা সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়।
সম্প্রতি একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের ‘পাতা ছেঁড়া’ সিন্ডিকেট এবং সরকারি জমি ব্যক্তির নামে করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয় সরকারি রেকর্ড বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পাতা ছিঁড়ে ফেলে জালিয়াতির মাধ্যমে জমির মালিকানা পরিবর্তনের মতো ভয়ংকর অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে গেলে এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান-এর আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বরং তাদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠেন শাহাদাত হোসেন। সাংবাদিকদের তথ্য না দিয়ে উল্টো হেনস্তার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সাংবাদিক যখন রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এমনকি তিনি সাংবাদিককে বলেন, আপনি আমার কর্মকর্তাদের ডিস্টার্ব করবেন না। আপনার জন্য তারা কাজ করতে পারছে না। আপনার অফিসের অনুমতি নিয়ে আমার অফিসে আসবেন।
এই বক্তব্য ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন একজন সরকারি কর্মকর্তা কেন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতা না করে বরং তাদের আড়াল করার চেষ্টা করবেন কেন সরকারি রেকর্ড জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্তের বদলে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হবে। স্থানীয়দের অভিযোগ এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খান-এর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অফিসে দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়েছে। অফিসে ঢুকলেই দালালদের আনাগোনা চোখে পড়ে। সাধারণ মানুষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান না। বরং বিভিন্ন টেবিলে ঘুরিয়ে ক্লান্ত করে তোলা হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত তারা দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন ভূমি অফিসে দুর্নীতি মানে শুধু অর্থ লুট নয় এটি মানুষের সম্পদ, উত্তরাধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে খেলা। আর যদি সেই দুর্নীতির নেপথ্যে থাকেন একজন এসিল্যান্ড তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে এতসব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কঠোর তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি শাহাদাত হোসেন খান ও তার কথিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একইসঙ্গে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল চক্র, সরকারি রেকর্ড জালিয়াতি এবং সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল একসময় দুর্নীতির এমন অভয়ারণ্যে পরিণত হবে যেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়সঙ্গত সেবা পাওয়ার আশা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।




















