১২:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস: ভোটের অধিকার থেকে জবাবদিহির রাষ্ট্র—গণতন্ত্রের পথ এখনো দীর্ঘ

  • আপডেট: ০৪:৩৭:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০১১

মো. কামরুল ইসলাম:

১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। গণতন্ত্রের অবস্থা পর্যালোচনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের ভাষায়, গণতন্ত্র কোনো একক মডেলে আবদ্ধ নয়; এটি জনগণের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত ইচ্ছা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সার্বজনীন মূল্যবোধ।

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস নিছক একটি আন্তর্জাতিক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং এ দিনটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর দিন। আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি এবং কোথায় যেতে চাই—এই তিনটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে যুক্ত। জনগণের অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্যহীন সমাজ এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের প্রত্যাশা থেকেই এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। ফলে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র কোনো আমদানি করা রাজনৈতিক ধারণা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

পাঁচ দশকের বেশি সময়ের রাষ্ট্রযাত্রায় আমরা কি গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রেখেছি, নাকি গণতন্ত্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পেরেছি? উত্তরটি নিঃসন্দেহে আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়

গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ নির্বাচন। জনগণ ভোট দেবে, তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে, সেই প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করবে—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো। কিন্তু এখানেই গণতন্ত্রের সমাপ্তি নয়; বরং এখান থেকেই শুরু।

নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সংসদ কতটা কার্যকর, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম কতটা মুক্ত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, নাগরিক কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহির আওতায় রয়েছে—এসবই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণের ক্ষমতা। রাষ্ট্র জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত হবে—এটাই এর দর্শন। তাই একটি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্রের সব শর্ত পূরণ হয়ে যায় না। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থাও হতে হবে জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গণতন্ত্রের সংগ্রাম, অর্জন, সংকট ও পুনরুদ্ধারের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন—প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯০-এর গণআন্দোলন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছিল—জনগণ যখন রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো শাসনব্যবস্থাই জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু পরবর্তী তিন দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের দেখিয়েছে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা, সংসদ বর্জন, নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস, প্রতিষ্ঠানকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা এবং রাজনীতিতে সংঘাতের সংস্কৃতি বারবার গণতন্ত্রের ভিতকে দুর্বল করেছে।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন-আমরা কি শুধু সরকার পরিবর্তনের গণতন্ত্র চাই, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই?

২০২৬: নতুন সুযোগ, নতুন পরীক্ষা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সময় অতিক্রম করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। একই সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুন পরীক্ষার শুরু হয়েছে। নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতা পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা রক্ষা করা।

রাজনৈতিক দলগুলোরও এখন অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মসংশোধনের সক্ষমতা।

সংসদকে হতে হবে সত্যিকার অর্থে কার্যকর

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়। সংসদ সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করবে, জনগণের সমস্যা তুলে ধরবে এবং রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের সংসদকে আরও কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা সংসদের কাজ নয়। আবার বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করাও সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা—দুটিই সংসদীয় রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়। সংসদ সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করবে, জনগণের সমস্যা তুলে ধরবে এবং রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের সংসদকে আরও কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা সংসদের কাজ নয়। আবার বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করাও সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা—দুটিই সংসদীয় রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ।

…নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সংসদ কতটা কার্যকর, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম কতটা মুক্ত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, নাগরিক কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহির আওতায় রয়েছে—এসবই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।

বিরোধী দলকে তাই রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে গণতান্ত্রিকভাবে জবাবদিহির আওতায় রাখা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলা গণতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করে না।

একটি শক্তিশালী বিরোধী দল আসলে সরকারের জন্যও আশীর্বাদ। কারণ কার্যকর বিরোধী দল সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রাণ

গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ জনগণ যদি তথ্য না পায়, তাহলে সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও হারায়। স্বাধীন সাংবাদিকতা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। সংবাদমাধ্যমকে সত্য অনুসন্ধান করতে হবে, তথ্য যাচাই করতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, বিকৃত তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা নাগরিকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে গণতন্ত্র রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যমের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকে সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে সমালোচনা থেকে শেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কারণ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রশ্ন রাষ্ট্রবিরোধী নয়। বরং অনেক সময় প্রশ্নই রাষ্ট্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।

আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

গণতন্ত্রের আরেকটি মৌলিক স্তম্ভ হলো আইনের শাসন। রাষ্ট্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না—এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্য যদি আইনের প্রয়োগের মানদণ্ড আলাদা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তাই কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। মানুষকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে যে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য যাই হোক না কেন, আদালতে গেলে তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সাংবিধানিক দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে পারলেই গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা

গণতন্ত্রের সফলতার জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অপরিহার্য। নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি জনগণের মনে প্রশ্ন থাকে, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনকে এমন একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে হবে যেখানে বিজয়ী দল ফলাফলকে জনগণের ম্যান্ডেট হিসেবে গ্রহণ করবে এবং পরাজিত দলও ফলাফলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবে।

তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির বাইরে রাখা যাবে না

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণদের কেবল নির্বাচনের সময় ভোটার হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। তাদের নীতি নির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও জনসেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

তরুণরা প্রশ্ন করবে, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম দেবে—এটাই স্বাভাবিক। তাদের কণ্ঠকে রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।

একইভাবে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণও আরও অর্থবহ করতে হবে। শুধু নির্বাচনে নারী প্রার্থী থাকা যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক

একটি ভুল ধারণা হলো-দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র বাধা। বাস্তবতা বরং ভিন্ন। স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ায়। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, সম্পত্তির অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং আইনের প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমেয়, সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশও শক্তিশালী হয়। গণতন্ত্র তাই উন্নয়নের প্রতিপক্ষ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। গণতন্ত্রকে কেবল সংলাপ ও অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না-গণতন্ত্রকে মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ফল দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে না

গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছের অভিজ্ঞতা মানুষ পায় স্থানীয় পর্যায়ে। রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও স্থানীয় অবকাঠামো—এসব বিষয়ে নাগরিক সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।

কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা যত বেশি হবে, গণতন্ত্র তত বেশি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। আর ক্ষমতা যত বেশি জনগণের কাছাকাছি যাবে, গণতন্ত্র তত বেশি জীবন্ত হবে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো আইন বা সংবিধানে নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করি। ক্ষমতার পরিবর্তনকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার বদলে পরাজয়কে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখা হয়। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

রাজনীতিতে মতের অমিল থাকবে। বিতর্ক থাকবে। কঠোর সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সহিংসতা, প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং প্রতিপক্ষের অধিকার অস্বীকার করার কোনো স্থান গণতন্ত্রে থাকতে পারে না।

সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। বিচার বিভাগের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব সচেতন থাকা, প্রশ্ন করা এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাগ্রত থাকা।

আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যে দল বিরোধী দলে, জনগণ চাইলে আগামীকাল সেই দল সরকার গঠন করতে পারে। এই সত্য মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক পরিপক্বতাই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতায় নয়, ক্ষমতার আচরণে

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—এখানে ক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতা দেয়। জনগণ চাইলে সেই ক্ষমতা প্রত্যাহারও করতে পারে। ফলে নির্বাচিত সরকারকে সব সময় মনে রাখতে হবে—ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিকও জনগণ।

একটি সরকার কত বড় প্রকল্প করেছে, কত উন্নয়ন করেছে-এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি দেখতে হবে, সরকার কতটা জবাবদিহি করেছে, কতটা স্বচ্ছ ছিল, কতটা ভিন্নমত সহ্য করেছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী করেছে। কারণ উন্নয়ন দৃশ্যমান; কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেলে তার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি।

বাংলাদেশের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্রের নতুন ভিত্তি নির্মাণ করা সম্ভব। এই সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়।

প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যেখানে নির্বাচন নিয়ে ন্যূনতম আস্থা থাকবে; সংসদে কার্যকর বিতর্ক থাকবে; বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে; গণমাধ্যম নিরাপদে কাজ করবে; প্রশাসন পেশাদার থাকবে; নির্বাচন কমিশন আস্থার প্রতিষ্ঠান হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সাংবিধানিক অধিকারকে সম্মান করবে। আরও প্রয়োজন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি গণতন্ত্রেরও শত্রু। রাষ্ট্রের সম্পদ যখন জনগণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গণতন্ত্র কোনো একদিনের উৎসব নয়

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কোনো একদিনের উৎসব নয়। এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। জাতিসংঘও গণতন্ত্রকে একই সঙ্গে একটি লক্ষ্য ও একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে।

গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন একজন সাধারণ নাগরিক নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন; একজন সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধান করতে পারেন; একজন বিচারক স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন; একজন সংসদ সদস্য সরকারের কাছে জবাব চাইতে পারেন; একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন এবং একজন ভোটার কোনো ভয় বা প্রলোভন ছাড়াই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।

গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ, যখন নির্বাচনের পরও জনগণের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হবে এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহি আরও গভীর হবে?

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয়ে নয়; জনগণের বিজয়ে। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়; বরং সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সরকারের জনপ্রিয়তায় নয়; বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতায়। আর গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য নির্বাচনের দিনে নয়; নির্বাচনের পর প্রতিটি দিন জনগণের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে, তার মধ্যে।

বাংলাদেশের মানুষ বহুবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। রক্ত দিয়েছে, ত্যাগ করেছে, রাজপথে দাঁড়িয়েছে। এখন সেই দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনকে একটি স্থায়ী, কার্যকর ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ দলগুলোই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তাদের বুঝতে হবে-রাষ্ট্র কোনো দলের নয়; রাষ্ট্র জনগণের।

সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। বিচার বিভাগের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব সচেতন থাকা, প্রশ্ন করা এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাগ্রত থাকা।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত-শুধু ভোটের অধিকার নয়, ভোটের মর্যাদা রক্ষা; শুধু সরকার নির্বাচিত করা নয়, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা; শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান; শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এই শিক্ষা কতটা গ্রহণ করতে পারি তার ওপর।

একটি সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে-গণতন্ত্র কোনো শাসকের দয়া নয়, জনগণের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়-সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজের।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই-বাংলাদেশ এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে জনগণ শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দিতে নয়, প্রতিদিন রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে নিজের অধিকার, মর্যাদা ও কণ্ঠের স্বীকৃতি পায়।

ভোটের বাক্সে গণতন্ত্রের শুরু হতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের পূর্ণতা আসে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি নাগরিকের জীবনে এবং প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চায়।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস: ভোটের অধিকার থেকে জবাবদিহির রাষ্ট্র—গণতন্ত্রের পথ এখনো দীর্ঘ

আপডেট: ০৪:৩৭:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মো. কামরুল ইসলাম:

১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। গণতন্ত্রের অবস্থা পর্যালোচনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের ভাষায়, গণতন্ত্র কোনো একক মডেলে আবদ্ধ নয়; এটি জনগণের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত ইচ্ছা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সার্বজনীন মূল্যবোধ।

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস নিছক একটি আন্তর্জাতিক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং এ দিনটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর দিন। আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি এবং কোথায় যেতে চাই—এই তিনটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে যুক্ত। জনগণের অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্যহীন সমাজ এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের প্রত্যাশা থেকেই এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। ফলে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র কোনো আমদানি করা রাজনৈতিক ধারণা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

পাঁচ দশকের বেশি সময়ের রাষ্ট্রযাত্রায় আমরা কি গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রেখেছি, নাকি গণতন্ত্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পেরেছি? উত্তরটি নিঃসন্দেহে আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়

গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ নির্বাচন। জনগণ ভোট দেবে, তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে, সেই প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করবে—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো। কিন্তু এখানেই গণতন্ত্রের সমাপ্তি নয়; বরং এখান থেকেই শুরু।

নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সংসদ কতটা কার্যকর, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম কতটা মুক্ত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, নাগরিক কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহির আওতায় রয়েছে—এসবই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণের ক্ষমতা। রাষ্ট্র জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত হবে—এটাই এর দর্শন। তাই একটি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্রের সব শর্ত পূরণ হয়ে যায় না। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থাও হতে হবে জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গণতন্ত্রের সংগ্রাম, অর্জন, সংকট ও পুনরুদ্ধারের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন—প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯০-এর গণআন্দোলন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছিল—জনগণ যখন রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো শাসনব্যবস্থাই জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু পরবর্তী তিন দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের দেখিয়েছে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা, সংসদ বর্জন, নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস, প্রতিষ্ঠানকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা এবং রাজনীতিতে সংঘাতের সংস্কৃতি বারবার গণতন্ত্রের ভিতকে দুর্বল করেছে।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন-আমরা কি শুধু সরকার পরিবর্তনের গণতন্ত্র চাই, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই?

২০২৬: নতুন সুযোগ, নতুন পরীক্ষা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সময় অতিক্রম করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। একই সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুন পরীক্ষার শুরু হয়েছে। নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতা পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা রক্ষা করা।

রাজনৈতিক দলগুলোরও এখন অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মসংশোধনের সক্ষমতা।

সংসদকে হতে হবে সত্যিকার অর্থে কার্যকর

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়। সংসদ সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করবে, জনগণের সমস্যা তুলে ধরবে এবং রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের সংসদকে আরও কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা সংসদের কাজ নয়। আবার বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করাও সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা—দুটিই সংসদীয় রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়। সংসদ সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করবে, জনগণের সমস্যা তুলে ধরবে এবং রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের সংসদকে আরও কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা সংসদের কাজ নয়। আবার বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করাও সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা—দুটিই সংসদীয় রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ।

…নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সংসদ কতটা কার্যকর, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম কতটা মুক্ত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, নাগরিক কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহির আওতায় রয়েছে—এসবই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।

বিরোধী দলকে তাই রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে গণতান্ত্রিকভাবে জবাবদিহির আওতায় রাখা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলা গণতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করে না।

একটি শক্তিশালী বিরোধী দল আসলে সরকারের জন্যও আশীর্বাদ। কারণ কার্যকর বিরোধী দল সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রাণ

গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ জনগণ যদি তথ্য না পায়, তাহলে সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও হারায়। স্বাধীন সাংবাদিকতা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। সংবাদমাধ্যমকে সত্য অনুসন্ধান করতে হবে, তথ্য যাচাই করতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, বিকৃত তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা নাগরিকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে গণতন্ত্র রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যমের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকে সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে সমালোচনা থেকে শেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কারণ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রশ্ন রাষ্ট্রবিরোধী নয়। বরং অনেক সময় প্রশ্নই রাষ্ট্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।

আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

গণতন্ত্রের আরেকটি মৌলিক স্তম্ভ হলো আইনের শাসন। রাষ্ট্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না—এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্য যদি আইনের প্রয়োগের মানদণ্ড আলাদা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তাই কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। মানুষকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে যে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য যাই হোক না কেন, আদালতে গেলে তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সাংবিধানিক দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে পারলেই গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা

গণতন্ত্রের সফলতার জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অপরিহার্য। নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি জনগণের মনে প্রশ্ন থাকে, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনকে এমন একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে হবে যেখানে বিজয়ী দল ফলাফলকে জনগণের ম্যান্ডেট হিসেবে গ্রহণ করবে এবং পরাজিত দলও ফলাফলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবে।

তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির বাইরে রাখা যাবে না

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণদের কেবল নির্বাচনের সময় ভোটার হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। তাদের নীতি নির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও জনসেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

তরুণরা প্রশ্ন করবে, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম দেবে—এটাই স্বাভাবিক। তাদের কণ্ঠকে রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।

একইভাবে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণও আরও অর্থবহ করতে হবে। শুধু নির্বাচনে নারী প্রার্থী থাকা যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক

একটি ভুল ধারণা হলো-দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র বাধা। বাস্তবতা বরং ভিন্ন। স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ায়। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, সম্পত্তির অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং আইনের প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমেয়, সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশও শক্তিশালী হয়। গণতন্ত্র তাই উন্নয়নের প্রতিপক্ষ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। গণতন্ত্রকে কেবল সংলাপ ও অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না-গণতন্ত্রকে মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ফল দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে না

গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছের অভিজ্ঞতা মানুষ পায় স্থানীয় পর্যায়ে। রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও স্থানীয় অবকাঠামো—এসব বিষয়ে নাগরিক সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।

কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা যত বেশি হবে, গণতন্ত্র তত বেশি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। আর ক্ষমতা যত বেশি জনগণের কাছাকাছি যাবে, গণতন্ত্র তত বেশি জীবন্ত হবে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো আইন বা সংবিধানে নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করি। ক্ষমতার পরিবর্তনকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার বদলে পরাজয়কে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখা হয়। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

রাজনীতিতে মতের অমিল থাকবে। বিতর্ক থাকবে। কঠোর সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সহিংসতা, প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং প্রতিপক্ষের অধিকার অস্বীকার করার কোনো স্থান গণতন্ত্রে থাকতে পারে না।

সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। বিচার বিভাগের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব সচেতন থাকা, প্রশ্ন করা এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাগ্রত থাকা।

আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যে দল বিরোধী দলে, জনগণ চাইলে আগামীকাল সেই দল সরকার গঠন করতে পারে। এই সত্য মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক পরিপক্বতাই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতায় নয়, ক্ষমতার আচরণে

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—এখানে ক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতা দেয়। জনগণ চাইলে সেই ক্ষমতা প্রত্যাহারও করতে পারে। ফলে নির্বাচিত সরকারকে সব সময় মনে রাখতে হবে—ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিকও জনগণ।

একটি সরকার কত বড় প্রকল্প করেছে, কত উন্নয়ন করেছে-এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি দেখতে হবে, সরকার কতটা জবাবদিহি করেছে, কতটা স্বচ্ছ ছিল, কতটা ভিন্নমত সহ্য করেছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী করেছে। কারণ উন্নয়ন দৃশ্যমান; কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেলে তার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি।

বাংলাদেশের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্রের নতুন ভিত্তি নির্মাণ করা সম্ভব। এই সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়।

প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যেখানে নির্বাচন নিয়ে ন্যূনতম আস্থা থাকবে; সংসদে কার্যকর বিতর্ক থাকবে; বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে; গণমাধ্যম নিরাপদে কাজ করবে; প্রশাসন পেশাদার থাকবে; নির্বাচন কমিশন আস্থার প্রতিষ্ঠান হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সাংবিধানিক অধিকারকে সম্মান করবে। আরও প্রয়োজন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি গণতন্ত্রেরও শত্রু। রাষ্ট্রের সম্পদ যখন জনগণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গণতন্ত্র কোনো একদিনের উৎসব নয়

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কোনো একদিনের উৎসব নয়। এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। জাতিসংঘও গণতন্ত্রকে একই সঙ্গে একটি লক্ষ্য ও একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে।

গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন একজন সাধারণ নাগরিক নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন; একজন সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধান করতে পারেন; একজন বিচারক স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন; একজন সংসদ সদস্য সরকারের কাছে জবাব চাইতে পারেন; একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন এবং একজন ভোটার কোনো ভয় বা প্রলোভন ছাড়াই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।

গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ, যখন নির্বাচনের পরও জনগণের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হবে এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহি আরও গভীর হবে?

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয়ে নয়; জনগণের বিজয়ে। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়; বরং সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সরকারের জনপ্রিয়তায় নয়; বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতায়। আর গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য নির্বাচনের দিনে নয়; নির্বাচনের পর প্রতিটি দিন জনগণের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে, তার মধ্যে।

বাংলাদেশের মানুষ বহুবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। রক্ত দিয়েছে, ত্যাগ করেছে, রাজপথে দাঁড়িয়েছে। এখন সেই দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনকে একটি স্থায়ী, কার্যকর ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ দলগুলোই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তাদের বুঝতে হবে-রাষ্ট্র কোনো দলের নয়; রাষ্ট্র জনগণের।

সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। বিচার বিভাগের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব সচেতন থাকা, প্রশ্ন করা এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাগ্রত থাকা।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত-শুধু ভোটের অধিকার নয়, ভোটের মর্যাদা রক্ষা; শুধু সরকার নির্বাচিত করা নয়, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা; শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান; শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এই শিক্ষা কতটা গ্রহণ করতে পারি তার ওপর।

একটি সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে-গণতন্ত্র কোনো শাসকের দয়া নয়, জনগণের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়-সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজের।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই-বাংলাদেশ এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে জনগণ শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দিতে নয়, প্রতিদিন রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে নিজের অধিকার, মর্যাদা ও কণ্ঠের স্বীকৃতি পায়।

ভোটের বাক্সে গণতন্ত্রের শুরু হতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের পূর্ণতা আসে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি নাগরিকের জীবনে এবং প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চায়।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট