০১:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বি. চৌধুরীর ৯৬তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল

  • আপডেট: ১১:২৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৮০০৩

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ৯৬তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল ১১ অক্টোবর। ১৯৩০ সালের এই দিনে কুমিল্লায় নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বহুমাত্রিক অবদান রাখা এই গুণী ব্যক্তিত্ব সবার কাছে ডা. বি. চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন।

ডা. বি. চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মজিদপুর দয়াহাটায়। তাঁর বাবা আইনজীবী কফিলউদ্দিন চৌধুরী তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন।

১৯৪৭ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন ডা. বি. চৌধুরী। দুই পরীক্ষাতেই তিনি মেধাতালিকায় স্থান পান। ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, এডিনবরা ও গ্লাসগোর তিন রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের ফেলো (এফআরসিপি) হন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস তাঁকে সম্মানসূচক এফসিপিএস ডিগ্রি প্রদান করে।

চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও সিলেট মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ মেডিসিনের অধ্যাপক ছিলেন। দেশের অন্যতম খ্যাতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। যক্ষ্মা প্রতিরোধেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ন্যাশনাল অ্যান্টি-টিউবারকিউলোসিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ন্যাটাব) সভাপতি এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অ্যাগেইনস্ট টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হেলথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন ডা. বি. চৌধুরী। তাঁর উদ্যোগে উত্তরায় দেশের প্রথম নারী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও তিনি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৩ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

চিকিৎসার পাশাপাশি টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপিত ‘আপনার ডাক্তার’ অনুষ্ঠান ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭৭ সালে শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে পুরস্কৃত হন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৭৮ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন ডা. বি. চৌধুরী। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ছিলেন।

নিজ নির্বাচনী এলাকা মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। পরে সংসদে সরকারি দলের উপনেতা এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ অক্টোবর তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। পরে ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি বাংলাদেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। প্রায় সাত মাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।

২০০৪ সালে ‘বিকল্পধারা বাংলাদেশ’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন ডা. বি. চৌধুরী। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনে তাঁর স্ত্রী হাসিনা ওয়ার্দা চৌধুরী। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে মাহী বি. চৌধুরী রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। দুই মেয়ের মধ্যে ব্যারিস্টার মুনা চৌধুরী আইনজীবী এবং ডা. শায়লা সাফিয়া চৌধুরী চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক।

দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী ডা. বি. চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসক, শিক্ষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বি. চৌধুরীর ৯৬তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল

আপডেট: ১১:২৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ৯৬তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল ১১ অক্টোবর। ১৯৩০ সালের এই দিনে কুমিল্লায় নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বহুমাত্রিক অবদান রাখা এই গুণী ব্যক্তিত্ব সবার কাছে ডা. বি. চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন।

ডা. বি. চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মজিদপুর দয়াহাটায়। তাঁর বাবা আইনজীবী কফিলউদ্দিন চৌধুরী তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন।

১৯৪৭ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন ডা. বি. চৌধুরী। দুই পরীক্ষাতেই তিনি মেধাতালিকায় স্থান পান। ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, এডিনবরা ও গ্লাসগোর তিন রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের ফেলো (এফআরসিপি) হন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস তাঁকে সম্মানসূচক এফসিপিএস ডিগ্রি প্রদান করে।

চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও সিলেট মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ মেডিসিনের অধ্যাপক ছিলেন। দেশের অন্যতম খ্যাতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। যক্ষ্মা প্রতিরোধেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ন্যাশনাল অ্যান্টি-টিউবারকিউলোসিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ন্যাটাব) সভাপতি এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অ্যাগেইনস্ট টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হেলথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন ডা. বি. চৌধুরী। তাঁর উদ্যোগে উত্তরায় দেশের প্রথম নারী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও তিনি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৩ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

চিকিৎসার পাশাপাশি টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপিত ‘আপনার ডাক্তার’ অনুষ্ঠান ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭৭ সালে শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে পুরস্কৃত হন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৭৮ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন ডা. বি. চৌধুরী। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ছিলেন।

নিজ নির্বাচনী এলাকা মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। পরে সংসদে সরকারি দলের উপনেতা এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ অক্টোবর তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। পরে ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি বাংলাদেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। প্রায় সাত মাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।

২০০৪ সালে ‘বিকল্পধারা বাংলাদেশ’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন ডা. বি. চৌধুরী। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনে তাঁর স্ত্রী হাসিনা ওয়ার্দা চৌধুরী। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে মাহী বি. চৌধুরী রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। দুই মেয়ের মধ্যে ব্যারিস্টার মুনা চৌধুরী আইনজীবী এবং ডা. শায়লা সাফিয়া চৌধুরী চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক।

দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী ডা. বি. চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসক, শিক্ষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।