শুভেচ্ছা টেইলার্স নাকি গোপন সিন্ডিকেটের কেন্দ্র? টেইলার্স ব্যবসার আড়ালে কোটি টাকার বাণিজ্যে আলোচিত হেলেনা
- আপডেট: ০৮:৪৫:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
- / ১৮০০৩
রাজধানীর গুলিস্তান থেকে প্রশাসনিক অঙ্গন সবখানেই এখন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে হেলেনা নামের এক নারীকে ঘিরে বিস্তৃত প্রভাবের অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য একসময় সাধারণ পরিচয়ে চলাফেরা করা এই নারী বর্তমানে এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন যার প্রভাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে শুরু করে ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন কৌতূহল তেমনি বাড়ছে ক্ষোভ ও প্রশ্নও। গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার ফতেপট্টি গ্রামে জন্ম এই হেলেনার। অভিযোগ রয়েছে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ (পুরাতন) ফ্যাসিস্ট আ.লীগের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত “শুভেচ্ছা টেইলার্স”-এর স্বত্তাধিকারী হেলেনা নিজেই। স্থানীয়দের দাবি টেইলার্স ব্যবসাকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি। এমনকি বন্ড সুবিধায় আনা মালামালও এই ব্যবসার আড়ালে ক্রয়-বিক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য দোকানটি কেবল পোশাক ব্যবসার স্থান নয় বরং বিভিন্ন ধরনের তদবির, যোগাযোগ ও গোপন লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ গুলিস্তান এলাকায় বহু বছর আগে থেকেই হেলেনা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে সময় থেকেই রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসের সামনের এলাকায় অবস্থান করে তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তার জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে বলে দাবি স্থানীয়দের। ওই ঘটনায় আহতদের তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর থেকেই বিভিন্ন ক্ষমতাধর মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং সেই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে তদবির বাণিজ্য শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি, পদায়ন কিংবা বদলি স্থগিত করার বিষয়ে হেলেনার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে সার্ভেয়ার ও কানুনগোদের পোস্টিং নিয়ে তার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা সুবিধাজনক কর্মস্থল পেতে তার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগ আরও রয়েছে অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন। শুধু তাই নয় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তিনি অনৈতিক নানা কৌশল ব্যবহার করেছেন বলেও দাবি করেছে একাধিক সূত্র। বিষয়টি প্রশাসনিক অন্দরমহলেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তার নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে। কোনো সরকারি পদ বা দায়িত্বে না থেকেও প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তাকে ডিসি অফিসে দেখা যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে এলএ শাখায় তার যাতায়াত ও অবস্থান নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও নানা আলোচনা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া থাকায় তিনি প্রশাসনিক কার্যালয়ে অবাধে চলাফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। গুলিস্তানের সাধারণ মানুষ বলছেন একজন বেসরকারি ব্যক্তি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক দপ্তরে এতটা প্রভাব বিস্তার করেন সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি তার উত্থান কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি বরং এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতাবানদের একটি শক্তিশালী চক্র। তারা মনে করছেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে হেলেনাকে ঘিরে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একজন নারীর বিতর্কিত উত্থানের গল্প হবে না, বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদবির সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতার সংকটের বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই হেলেনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে নামলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নেরও উত্তর মিলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



















