হাওড়ে কমবে অপরাধ বাড়বে পর্যটক, কিশোরগঞ্জ পুলিশের অভিনব উদ্যোগ
- আপডেট: ০১:৫৫:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮০১৮
কিশোরগঞ্জ থেকে ফিরে মো. দীন ইসলাম
কিশোরগঞ্জে প্রায় ৩২ লাখ ৬৭ হাজার ৬৩০ জন মানুষের বসবাস। এই জেলার শহরটি খুবই ছোট। কিশোরগঞ্জ জেলার সেরা দর্শনীয় স্থান হতে পারে ভ্রমনপিপাসুদের জন্য সেরা ভ্রমনস্থান, কেননা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কিশোরগঞ্জ জেলা প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। এই জেলায় রয়েছে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল, প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শোলাকিয়া ঈদগাহ ও জঙ্গলবাড়ির প্রাচীন দুর্গ এবং ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদ সবকিছু মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। তবে হাওরের বুক চিরে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল-ওয়েদার এই তিন উপজেলার সংযোগকারী পিচঢালা সড়কটি ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে দিগন্তবিস্তৃত থৈ থৈ পানি আর পানির ওপর ভেসে থাকা ডুবো সড়কের দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে অসংখ্য মানুষ।
এছাড়া, পাকুন্দিয়া উপজেলায় অবস্থিত ইসা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক এগারোসিন্ধুর দুর্গ ও মসজিদ ও প্রাচীন স্থাপত্যকলা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতি বিজড়িত চন্দ্রাবতীর মন্দির সাহিত্যপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।
এদিকে,পর্যটনের বিকাশ কিশোরগঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোট চালক, স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও হোটেল ব্যবসায়ীদের আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ আবাসন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। স্বল্প সময়ে ঢাকা বা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে আসা সহজ হওয়ায় কিশোরগঞ্জ এখন দেশের ট্রাভেলারদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উইকেন্ড গন্তব্য।
হাওড়কন্যা কিশোরগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ।
পর্যটকরা যাতে কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য জেলা জুড়ে নেওয়া হয়েছে একাধিক অভূতপূর্ব ও সমন্বিত পদক্ষেপ। পর্যটকদের তাৎক্ষণিক সেবা ও দিকনির্দেশনা দিতে নিকলী, বালিকলা এবং অলওয়েদার রোডে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি শক্তিশালী ও সুবিধাজনক কন্ট্রোল রুম। প্রতিটি কন্ট্রোল রুমে ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যটক একত্রে বসে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি যেকোনো আইনি সহায়তা নিতে পারছেন।
এছাড়া ভ্রমণকালে দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুস্থতায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দিতে ৮ জন পুলিশ সদস্যকে ফার্স্ট এইড বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে সংগৃহীত আন্তর্জাতিক মানের পরিপূর্ণ ‘ফার্স্ট এইড বক্স’সহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সদস্যকে পয়েন্টগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পুলিশ। স্থানীয় আবাসিক হোটেল মালিক ও সমিতিগুলোর সাথে আলোচনা করে পর্যটক শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইডি কার্ড প্রদর্শন বা আগাম প্রি-বুকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আবাসিক হোটেলগুলোতে বিনামূল্যে থাকার এই অনন্য সুবিধা পাচ্ছেন।
হাওড় অঞ্চলে পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। অতীতে ঘটে যাওয়া ডাকাতির আসামীদের গ্রেফতার এবং লুণ্ঠিত নৌকা ও মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। রাতে হাওড়ের অন্ধকারে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে সাইরেন এবং হলার (মাইক) বাজিয়ে নিয়মিত সান্ধ্যকালীন ও নৈশ টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে হাওড় এলাকায় অপরাধীদের আনাগোনা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ ‘পর্যটন পুলিশ ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জেলায় আগমনকারী পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ঝামেলা ছাড়া সুন্দরভাবে তাদের ভ্রমণ শেষ করতে সাহায্য করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। হাওরে তিনটি অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি কন্ট্রোল রুমে ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যটক বসে বিশ্রাম নিতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাবেন। এমনকি, আন্তর্জাতিক মানের ফার্স্ট এইড বক্সের মাধ্যমে পর্যটকদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
হোটেলে শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রী থাকার ব্যবস্থার প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জের এসপি বলেন, জেলা শহরের বাইরের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে বা প্রি-বুকিং করে কিশোরগঞ্জের আবাসিক হোটেলগুলোতে বিনামূল্যে বা ছাড়প্রাপ্ত মূল্যে থাকতে পারবেন। এ বিষয়ে আবাসিক হোটেল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে আমার পক্ষ থেকে তাদের রাজি করানো হয়েছে।
একসময়ে হাওরে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, বর্তমানে নিরাপত্তা কেমন রয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, হাওড়ে পূর্বে ঘটে যাওয়া ডাকাতির আসামীদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং লুণ্ঠিত মালামাল ও নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে। হাওরে এখন আর কোনো এই ধরনের ঘটনায় নাই। আমার কঠোরভাবে তদারকি করছি। রাতে অন্ধকার হাওড়ে পুলিশের উপস্থিতি জানান দিতে হলার (মাইক) ও সাইরেন বাজিয়ে স্পিডবোট ও ট্রলার নিয়ে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।



















