‘জেনারেলের দায়মুক্তি’ প্রতিবেদন নিয়ে বিজিবির ১০ প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা
- আপডেট: ০৫:৫০:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮০০৪
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে নেত্র নিউজের প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনকে ‘বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাহিনীটির বলছে, প্রতিবেদনে বিজিবি ও এর মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলো ইতিমধ্যে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য।
সম্প্রতি নেত্র নিউজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘[জুলাই অনুসন্ধান] জেনারেলের দায়মুক্তি’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। এতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহত হওয়ার দাবি, বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার মতো অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে বিজিবি বলেছে, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত প্রতিটি প্রাণহানির নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত সত্যের মধ্যে পার্থক্য থাকা জরুরি।
বিজিবির দাবি, নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে মহাপরিচালকের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখানো হয়নি। বরং বিভিন্ন ঘটনা, সাক্ষ্য, স্থিরচিত্র ও চলমান তদন্তের তথ্য পাশাপাশি সাজিয়ে মহাপরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার ধারণা তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, বিটিভি ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রেক্ষাপটে দেওয়া মহাপরিচালকের একটি বক্তব্য প্রতিবেদনে একাধিকবার দেখানো হয়েছে। বিজিবির দাবি, বক্তব্যটি সরকারি সম্পদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে ছিল। সেখানে কোনো শিশু বা কিশোরের মৃত্যুর প্রসঙ্গ ছিল না। বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে পরবর্তী প্রাণহানির দৃশ্যের সঙ্গে সেটি যুক্ত করায় দর্শকের কাছে ভিন্ন অর্থ তৈরি হতে পারে।
বিজিবি আরও বলেছে, মহাপরিচালকের বক্তব্যের পর ৩৬টি মৃত্যুর মধ্যে ৩৫টি ঘটেছে—এমন সময়ক্রম দেখিয়ে বক্তব্যের সঙ্গে প্রাণহানির কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাদের দাবি, এ ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য পরবর্তী কোনো লিখিত আদেশ, বেতার বার্তা বা মাঠপর্যায়ের অপারেশনাল নির্দেশনার প্রমাণ প্রয়োজন। প্রতিবেদনে এমন প্রমাণ দেখানো হয়নি।
মহাপরিচালক ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কথোপকথনের স্থিরচিত্র ব্যবহার নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিজিবি। বাহিনীটির ভাষ্য, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্রিফিং ও পরিদর্শন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো স্থিরচিত্রের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে লিখিত আদেশ, অডিও, বেতার বার্তা বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।
বিজিবি বলেছে, বাহিনীর প্রধান হওয়ার কারণে অধীনস্থ প্রত্যেক সদস্যের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ব্যক্তিগত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাপরিচালকের ওপর বর্তায় না। কমান্ডের দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন কি না, এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না অথবা তা প্রতিরোধ বা পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিজিবি। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে বিজিবির বিরুদ্ধে পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা হলেও জীবনহানির চরম ঝুঁকি ছাড়া বলপ্রয়োগ না করা এবং প্রয়োজন হলে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ব্যবহারের নির্দেশনার বিষয়টি যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়নি।
বিজিবির ভাষ্য, নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নিয়েও অসংগতি রয়েছে। একই প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে ৬১, ৬৩ ও ৮৬ জনের কথা বলা হয়েছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে এবং কোন সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে সংখ্যা পরিবর্তন করা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
সিলেটের গোলাপগঞ্জের একটি ঘটনাতেও ফরেনসিক প্রমাণ ছাড়া বিজিবির ওপর গুলির দায় চাপানোর অভিযোগ করেছে বিজিবি। তাদের দাবি, ওই ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ ও বিজিবি কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য অনুযায়ী ওই গুলিতে কেউ হতাহত হননি। ফলে কোন অস্ত্র বা কোন বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মতো প্রমাণ প্রয়োজন।
রামপুরার একটি ঘটনায়ও প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে পূর্বে প্রকাশিত সংবাদে পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করেছে বিজিবি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন তথ্য থাকলে কোন প্রমাণের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছে বাহিনীটি।
নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প থাকার দাবিরও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। তাদের দাবি, সেখানে বিজিবির কোনো ক্যাম্প ছিল না। এ দাবির পক্ষে মোতায়েন আদেশ, পার্ক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা যাচাইযোগ্য অন্য কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে দেখানো হয়নি।
সবশেষে বিজিবি বলেছে, জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য, সময়ের ধারাবাহিকতাকে কার্যকারণ এবং স্থিরচিত্রকে নির্দেশের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করলে অনুসন্ধানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বিজিবি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রমাণ, প্রেক্ষাপট, ন্যায্যতা ও তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
















