ডেমরায় ভয়ংকর ভুমিদস্যু জুনায়েদের দৌরাত্ম্য, জাল দলিলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা
- আপডেট: ১১:১৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৮০১৫
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:
রাজধানীর ঢাকা নগরীর ডেমরা রাজস্ব সার্কেলকে কেন্দ্র করে ভয়ংকর ভুমিদস্যু হিসেবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে জুনায়েদ নামের এক প্রতারক। অভিযোগ উঠেছে, জালিয়াতি, প্রতারণা এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছে এই চক্রের হোতা জুনায়েদ। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার কর্মকাণ্ড এতটাই বিস্তৃত ও সংগঠিত যে সাধারণ মানুষ নিজেদের বৈধ জমির মালিকানাও হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুনায়েদ দীর্ঘদিন ধরে ডেমরা এবং আশপাশের বিভিন্ন ভুমি অফিসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সে জাল দলিল তৈরি করে অন্যের জমি নিজের নামে মিউটেশন করিয়ে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, তারা জমির প্রকৃত মালিক হয়েও হঠাৎ করে দেখতে পান তাদের জমির রেকর্ড পরিবর্তন হয়ে গেছে, এবং সেখানে মালিক হিসেবে উঠে এসেছে জুনায়েদের নাম। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই জমি দখল হয়ে যাচ্ছে এবং আইনি জটিলতায় পড়ে অসহায় হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এমন কর্মকাণ্ড সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাল কাগজপত্রকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে জুনায়েদের প্রতারণার জাল দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ভুমিদস্যুতার এই ভয়াবহ চক্র শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ দখলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রে পরিণত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জানা গেছে, জুনায়েদের গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলায় হলেও বর্তমানে সে রাজধানীর গোপিবাগ এলাকায় বসবাস করছে। গোপিবাগে অবস্থান করেই সে তার পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছে। রাজধানীসহ আশপাশের বিভিন্ন ভুমি অফিসে তার লোকজন সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রয়োজন অনুযায়ী জাল কাগজপত্র তৈরি, দালালি এবং প্রভাব খাটানোর কাজ করে থাকে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জুনায়েদ অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছে। নামজারি কেস নং ১৩৭৬৯/২২-২৩ ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দ্বারা সম্পাদিত হয় কেসটি। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, জমির প্রকৃত মালিক বর্তমানে ভারতে বসবাস করছে এবং বাংলাদেশের তার কোন বৈধ ওয়ারিশ নাই। দীর্ঘদিন ধরে, মাস্টারমাইন্ডে থাকা এই ভূমিদস্য, ডেমরা রাজস্ব সার্কেলে বিভিন্ন অফিসারদের জিম্মি করে, ভুয়া নামজারি করে আজ ভূমির প্রকৃত মালিকদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছেন।
এছাড়া অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় থেকে জুনায়েদ তার অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে সে প্রশাসনিক বাধা অতিক্রম করে সহজেই তার অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। যারা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন, তাদের নানা ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ভুমিদস্যুতা বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। জুনায়েদের মতো ভয়ংকর ভুমিদস্যুরা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য সম্পত্তি হারাচ্ছে এবং আইনের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের অপরাধ দমনে দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভুমি অফিসগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে জুনায়েদের মতো ভুমিদস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা চান, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং তাদের জমি ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হোক। অন্যথায়, এই ভয়ংকর ভুমিদস্যু চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বিপন্ন হয়ে পড়বে।


















