০৯:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ারের উদ্যোগে:ঢাকার ট্রাফিক ও আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন

  • আপডেট: ০৫:২৯:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৮০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অন্যতম কারণ ছিল বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ফুটপাত দখল। সেই বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বর্তমান কমিশনার মো. সরওয়ার।

ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার নেওয়া উদ্যোগ ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফেরাতে শুরু করেছে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর ফুটপাত দখল ঠেকাতে সম্প্রতি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে অনেক এলাকাতেই পথচারীরা এখন নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন।

একইসঙ্গে যানজটও কিছুটা কমে এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে বসে জীবিকা নির্বাহ করা নিম্নবিত্তদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। তাদের জন্য পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট স্থানে ছোট আকারে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হতে পারে, যাতে একটি টেবিল বা নির্ধারিত জায়গার মধ্যে থেকেই তারা ব্যবসা চালাতে পারেন। এতে ফুটপাতও খালি থাকবে, আবার জীবিকাও বন্ধ হবে না।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা আনতে রাতে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারপ্রধানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডিএমপিতে পদায়ন করা হয় মো. সরওয়ারকে। প্রথমে তিনি ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান। সে সময় ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাকে সচল করতে সরাসরি মাঠে থেকে দিন-রাত কাজ করেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাকে।

বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা একসময় ‘মব’ হামলার শিকার হচ্ছিলেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল নেয় ডিএমপি। প্রথমবারের মতো ট্রাফিক সার্জেন্টদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়, যার ফলে অল্প সময়েই ওই ধরনের হামলা নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ছাড়া রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হচ্ছিল নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল। এ অবস্থায় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে সমন্বয় করে মো. সরওয়ার নিবন্ধনবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। এর সুফলও দ্রুত পাওয়া যায়—কমে আসে অপরাধ প্রবণতা।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরের রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত। ঈদের সময় নগরবাসী স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত ও কেনাকাটা করতে পেরেছেন। চুরি-ছিনতাই, মলমপার্টির দৌরাত্ম্য বা বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে চুরির ঘটনা ছিল খুবই কম। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটেনি বলে জানায় পুলিশ।

ঈদের ফাঁকা ঢাকায় রাতে প্রায় দুই শতাধিক ‘ফুট পেট্রোল’ মোতায়েন করে ফাঁকা ঢাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধ করা হয়। তাছাড়া ঈদের পর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ইভটিজিং, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাদা পোশাকের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সক্রিয় ছিলেন।

মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোতেও গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। নিয়মিতভাবে থানার ওসি, এসআই থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এতে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জানা গেছে, পুলিশের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ডিআইজি করা হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরে তাকে অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) করা হয়। সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী চাকরি থেকে অব্যাহতি নিলে মো. সরওয়ারকে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ারের উদ্যোগগুলো ইতোমধ্যে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে পরিকল্পনাগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় অব্যাহত রাখা জরুরি।

তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মোড় থেকে বসিলা সড়ক পর্যন্ত তিন রাস্তার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে দেওয়া ও সচেতন করা হয়, যার ফলে সড়কে যান চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গাতেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং প্রয়োজনে তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের আওতায় ইন্দিরা রোড, রিং রোড, পাসপোর্ট অফিস ও নির্বাচন ভবন সংলগ্ন সড়ক এবং ফার্মগেট এলাকাতেও একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। কেউ পুনরায় দখলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ডিএমপির মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস্ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, বর্তমান কমিশনারের নেতৃত্বে রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসনে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়–এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কমিশনারের দিকনির্দেশনায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ফলে ইতোমধ্যে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা রাজধানীবাসীর স্বস্তি বাড়াচ্ছে।

ফুটপাত ও সড়কে অভিযান:

ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদে গত ১ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পৃথক অভিযানে জরিমানা আদায়, কারাদণ্ড প্রদান ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ডিএমপি। ১লা এপ্রিল কোতোয়ালী ট্রাফিক জোনের গোয়ালঘাট–নারিন্দা, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার–বাংলামটর, পল্লবী ও ফকিরাপুল এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এতে মোট ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২ এপ্রিল ফুলবাড়িয়া, যাত্রাবাড়ী মোড়–সাইনবোর্ড, শাহবাগ, নিমতলী, বঙ্গবাজার ও মিরপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এদিন ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৫১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৪ এপ্রিল বংশাল, নয়াবাজার, যাত্রাবাড়ী গোলাপবাগ–ধলপুর, পান্থপথ–গ্রীনরোড, মালিবাগ–রামপুরা ও মহাখালী এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এতে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ১৩ জনকে কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমান আদালত।

৫ এপ্রিল নর্থ সাউথ রোড, জুরাইন–শ্যামপুর, নিউমার্কেট–ঢাকা কলেজ, শাহআলী ও মালিবাগ এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৬ এপ্রিল সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, টিকাটুলি ও হাটখোলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২১টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। এদিন কোনো জরিমানা বা গ্রেফতার হয়নি।

৭ এপ্রিল গুলশান-২, কাকলী, বনানী, চেয়ারম্যানবাড়ি ও আমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১টি দোকানে মোট ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদিন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ারের উদ্যোগে:ঢাকার ট্রাফিক ও আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন

আপডেট: ০৫:২৯:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অন্যতম কারণ ছিল বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ফুটপাত দখল। সেই বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বর্তমান কমিশনার মো. সরওয়ার।

ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার নেওয়া উদ্যোগ ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফেরাতে শুরু করেছে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর ফুটপাত দখল ঠেকাতে সম্প্রতি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে অনেক এলাকাতেই পথচারীরা এখন নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন।

একইসঙ্গে যানজটও কিছুটা কমে এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে বসে জীবিকা নির্বাহ করা নিম্নবিত্তদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। তাদের জন্য পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট স্থানে ছোট আকারে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হতে পারে, যাতে একটি টেবিল বা নির্ধারিত জায়গার মধ্যে থেকেই তারা ব্যবসা চালাতে পারেন। এতে ফুটপাতও খালি থাকবে, আবার জীবিকাও বন্ধ হবে না।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা আনতে রাতে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারপ্রধানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডিএমপিতে পদায়ন করা হয় মো. সরওয়ারকে। প্রথমে তিনি ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান। সে সময় ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাকে সচল করতে সরাসরি মাঠে থেকে দিন-রাত কাজ করেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাকে।

বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা একসময় ‘মব’ হামলার শিকার হচ্ছিলেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল নেয় ডিএমপি। প্রথমবারের মতো ট্রাফিক সার্জেন্টদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়, যার ফলে অল্প সময়েই ওই ধরনের হামলা নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ছাড়া রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হচ্ছিল নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল। এ অবস্থায় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে সমন্বয় করে মো. সরওয়ার নিবন্ধনবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। এর সুফলও দ্রুত পাওয়া যায়—কমে আসে অপরাধ প্রবণতা।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরের রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত। ঈদের সময় নগরবাসী স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত ও কেনাকাটা করতে পেরেছেন। চুরি-ছিনতাই, মলমপার্টির দৌরাত্ম্য বা বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে চুরির ঘটনা ছিল খুবই কম। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটেনি বলে জানায় পুলিশ।

ঈদের ফাঁকা ঢাকায় রাতে প্রায় দুই শতাধিক ‘ফুট পেট্রোল’ মোতায়েন করে ফাঁকা ঢাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধ করা হয়। তাছাড়া ঈদের পর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ইভটিজিং, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাদা পোশাকের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সক্রিয় ছিলেন।

মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোতেও গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। নিয়মিতভাবে থানার ওসি, এসআই থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এতে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জানা গেছে, পুলিশের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ডিআইজি করা হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরে তাকে অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) করা হয়। সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী চাকরি থেকে অব্যাহতি নিলে মো. সরওয়ারকে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ারের উদ্যোগগুলো ইতোমধ্যে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে পরিকল্পনাগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় অব্যাহত রাখা জরুরি।

তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মোড় থেকে বসিলা সড়ক পর্যন্ত তিন রাস্তার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে দেওয়া ও সচেতন করা হয়, যার ফলে সড়কে যান চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গাতেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং প্রয়োজনে তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের আওতায় ইন্দিরা রোড, রিং রোড, পাসপোর্ট অফিস ও নির্বাচন ভবন সংলগ্ন সড়ক এবং ফার্মগেট এলাকাতেও একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। কেউ পুনরায় দখলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ডিএমপির মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস্ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, বর্তমান কমিশনারের নেতৃত্বে রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসনে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়–এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কমিশনারের দিকনির্দেশনায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ফলে ইতোমধ্যে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা রাজধানীবাসীর স্বস্তি বাড়াচ্ছে।

ফুটপাত ও সড়কে অভিযান:

ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদে গত ১ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পৃথক অভিযানে জরিমানা আদায়, কারাদণ্ড প্রদান ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ডিএমপি। ১লা এপ্রিল কোতোয়ালী ট্রাফিক জোনের গোয়ালঘাট–নারিন্দা, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার–বাংলামটর, পল্লবী ও ফকিরাপুল এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এতে মোট ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২ এপ্রিল ফুলবাড়িয়া, যাত্রাবাড়ী মোড়–সাইনবোর্ড, শাহবাগ, নিমতলী, বঙ্গবাজার ও মিরপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এদিন ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৫১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৪ এপ্রিল বংশাল, নয়াবাজার, যাত্রাবাড়ী গোলাপবাগ–ধলপুর, পান্থপথ–গ্রীনরোড, মালিবাগ–রামপুরা ও মহাখালী এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এতে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ১৩ জনকে কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমান আদালত।

৫ এপ্রিল নর্থ সাউথ রোড, জুরাইন–শ্যামপুর, নিউমার্কেট–ঢাকা কলেজ, শাহআলী ও মালিবাগ এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৬ এপ্রিল সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, টিকাটুলি ও হাটখোলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২১টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। এদিন কোনো জরিমানা বা গ্রেফতার হয়নি।

৭ এপ্রিল গুলশান-২, কাকলী, বনানী, চেয়ারম্যানবাড়ি ও আমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১টি দোকানে মোট ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদিন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।