কার্গো থেকে সরানো হলো চাঁদাবাজি-রোস্টার বাণিজ্যে আলোচিত মঈনউদ্দীন লোটাসকে
- আপডেট: ০৮:০৬:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো সেক্টরে চাঁদাবাজি, ‘রোস্টার বাণিজ্য’ এবং পণ্য খালাসে অনিয়মসহ নানান অভিযোগে আলোচিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা মো. মঈনউদ্দীন লোটাসকে অবশেষে কার্গো বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে মতিঝিলের জেলা বিক্রয় কার্যালয়ে (ডিএসও) বদলি করেছে বিমান প্রশাসন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে মঈনউদ্দীন লোটাসকে সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বর্তমান কর্মস্থল ছিল কার্গো, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা। বদলিকৃত কর্মস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কমার্শিয়াল, ডিএসও, মতিঝিল, ঢাকা।
এর আগে, বিমানবন্দরের কার্গো সেক্টরে রোস্টার বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে মঈনউদ্দীন লোটাসসহ বিমান কার্গোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের কথাও প্রকাশিত হয়েছিল।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো সেকশনে নির্দিষ্ট স্থানে ডিউটি পাওয়ার জন্য কিছু হেলপারের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাথাপিছু মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে পছন্দের জায়গায় ডিউটি বা রোস্টারে নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ মিলত। এই কথিত ‘রোস্টার বাণিজ্য’ থেকে সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তাদের মাসে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আয়ের অভিযোগও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে বারবার একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পাওয়ায় কার্গো এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র তৈরি হয়। আর এই চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় পণ্য চুরি, কাগজপত্র জালিয়াতি ও শুল্কায়ন এড়িয়ে পণ্য বের করে নেওয়ার মতো অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মঈনউদ্দীন লোটাসের নাম কমার্শিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, কার্গো হিসেবে উল্লেখ করে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে তাকে অভিযুক্তদের তালিকায় রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মঈনউদ্দীন লোটাস গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তিনি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।
কার্গো এলাকার অনিয়মের ভয়াবহতা বোঝাতে তদন্ত প্রতিবেদনে একটি বড় পণ্য খালাসের ঘটনাও তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে আমদানি করা ৪ হাজার ২৩৭ কেজি ফেব্রিকস ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে এবং যথাযথ বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস শুল্কায়ন ছাড়াই কার্গো থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিমান ও কাস্টমসের একটি অসাধু চক্রের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসেন এ ধরনের ঘটনার পর কার্গো ব্যবস্থাপনায় রোস্টার অটোমেশন চালুর বিষয়টি সামনে আসে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অটোমেশন দ্রুত কার্যকর করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন একই জায়গায় থেকে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বদলি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
কার্গো সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, মঈনউদ্দীন লোটাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্গো সেকশনে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে তিনি ঠিক কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের প্রভাব ব্যবহার করেছেন- এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলে নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
এসব আলোচনা-অভিযোগের মধ্যেই বিমান প্রশাসনের ৭ সেপ্টেম্বরের আদেশে মঈনউদ্দীন লোটাসকে কার্গো থেকে সরিয়ে মতিঝিল ডিএসওতে বদলি করা হলো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করা আলোচিত এই কর্মকর্তাকে আর কার্গোতে রাখা হচ্ছে না। তবে বদলির আদেশে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে- এমন কোনো কারণ উল্লেখ নেই। তাই প্রশাসনিক আদেশটিকে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। একইভাবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়েছে- এমন তথ্যও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মঈনউদ্দীন লোটাসকে কার্গো থেকে সরানোর পর প্রশ্ন উঠেছে- শুধু বদলিতেই কি শেষ হচ্ছে ব্যবস্থা, নাকি রোস্টার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, পণ্য চুরি ও জালিয়াতির অভিযোগগুলোরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবে বিমান কর্তৃপক্ষ?




















