০৯:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৈনিক সোনালী খবরের অনুসন্ধানী সংবাদে তোলপাড়, অবশেষে বদলি ঢাকা ডিসি অফিসের বিতর্কিত সার্ভেয়ার মজিবুল হক

  • আপডেট: ০৮:১২:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০০৫

বদলি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ৫০ লাখ টাকার মিশন!

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির ২
ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, জালিয়াতি, ভুয়া দলিল বানিয়ে শত কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ ও সিন্ডিকেট রাজত্বের মূল কারিগর সার্ভেয়ার মজিবুল হকের অপকর্ম নিয়ে ‘দৈনিক সোনালী খবর’ পত্রিকায় ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। পত্রিকায় মজিবুল হকের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর নথিপত্র প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সার্বিক প্রশাসনিক ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং দুর্নীতির লাগাম টানতে গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর: ০৫.৪১.৩০০০.০০০.০০৯.১৯.০০০৪.২৫.৪৩৮) মজিবুল হকসহ চারজন সার্ভেয়ারকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। আদেশে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সার্ভেয়ার মো: মজিবুল হককে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। উক্ত সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, তাকে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে; অন্যথায় ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ অপরাহ্নে তিনি বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (ঝঃধহফ জবষবধংবফ) বলে গণ্য হবেন।
তবে সরকারি আদেশে টাঙ্গাইলে বদলি করা হলেও ঢাকা জেলা প্রশাসনের অঘোষিত ‘মাফিয়া’ হিসেবে পরিচিত এই বিতর্কিত কর্মকর্তা কোনোভাবেই ঢাকার ডিসি অফিস ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি নন। নিজের অবৈধ ক্ষমতার আস্তানা ও অনৈতিক অর্থ উপার্জনের আখড়া ধরে রাখতে তিনি যেকোনো মূল্যে এই বদলি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার ডিসি অফিসে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে এবং বদলি আদেশ স্থগিতের তদবির চালাতে মজিবুল হক তার অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকার পাহাড় থেকে প্রায় অর্ধকোটি (৫০ লাখ) টাকার বিশাল এক চুক্তি বা মিশনে নেমেছেন। উর্ধ্বতন প্রশাসনিক বলয়ে মোটা অঙ্কের টাকা ঢেলে এই বদলির সিদ্ধান্ত নস্যাৎ করার চক্রান্ত করছেন তিনি, কারণ ঢাকা ডিসি অফিসের এলএ শাখা ছেড়ে টাঙ্গাইলে যাওয়া মানেই তার কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও সুসংগঠিত দালালি সিন্ডিকেটের অবসান ঘটা, আর সেই ভয়েই তিনি নিজের অবৈধ সাম্রাজ্য বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের হাতে চরম হয়রানি, শোষণ ও জালিয়াতির শিকার হওয়া ভুক্তভোগী সাধারণ ভূমি মালিকেরা দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মজিবুল হকের টাঙ্গাইলে বদলির আদেশের খবর জানতে পেরে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তাদের মতে, ঢাকা ডিসি কার্যালয়ের ইতিহাসে মজিবুল হক ও তার অনুসারী চক্রটি সাধারণ জমিদাতাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের চরম অনুগত কর্মকর্তা ও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিবুল হক যখন ঢাকার জেলা প্রশাসক ছিলেন, তখন তার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় সার্ভেয়ার মজিবুল হক পুরো ডিসি অফিসে নিজের পেশী শক্তি প্রয়োগ করে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। তৎকালীন ডিসি মহিবুল হকের অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে মজিবুল হকের কথার বাইরে অন্য কোনো সার্ভেয়ার বা কর্মকর্তার কথা বলার সাহস ছিল না এবং তারা যৌথভাবে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বিল বণ্টনের নামে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ করেন। তারা আইনকানুন ও প্রশাসনিক বিধিমালার তোয়াক্কা না করে এক ভাইয়ের প্রাপ্য জমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত করেছেন। তাছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন মূল্যবান সরকারি সম্পত্তির কোনো বৈধ ছাড়পত্র বা আইনি অনুমোদন গ্রহণ না করেই ভুয়া ফাইল সাজিয়ে বিল প্রদান করা হয়, এবং একই জমির দ্বৈত খতিয়ান দেখিয়ে ‘ওভারল্যাপিং’ এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট করার নজির স্থাপন করেন মজিবুল হক।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আগেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬ এর অধীনে সর্বোচ্চ মূল্যের মৌজা দর বসিয়ে এবং বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের অসংশ্লিষ্ট ভুয়া দলিল তৈরি করে এক ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকার সরকারি ক্ষতিপূরণ বিল আত্মসাৎ করেছিলেন সার্ভেয়ার মজিবুল হক, কবির হোসেন ও আনিসুর রহমান সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে উক্ত জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় মজিবুল হক গং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং চাকরিচ্যুত হন। কিন্তু সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করে জেল থেকে বের হয়েও থেমে থাকেননি মজিবুল; উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চতুরতার সাথে ম্যানেজ করে ও আইনি ফাঁকফোকরের অজুহাতে সুকৌশলে পুনরায় একই ডিসি অফিসের এলএ শাখাতেই স্বপদে ফিরে আসেন। দাপ্তরিকভাবে তিনি এলএ শাখা-১ এ পোস্টিং থাকলেও মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের মোটা অঙ্কের বিল চলমান থাকা এলএ শাখা-৩ এর সকল অপকর্মের মূল চাবিকাঠি নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। এমনকি নিজের ভিত মজবুত রাখতে ‘সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি ভুয়া কমিটি গঠন করেন এবং এডিসি এলএ ও অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের সাথে গভীর সখ্য গড়ে তোলেন। সর্বশেষ মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন (এলএ কেস নং ১৭/২৩-২৪), মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা (এলএ কেস নং ১৫/২৩-২৪) এবং মৌজা: বাড্ডা (এলএ কেস নং ০৭/২৩-২৪) এর কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিলে ১ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ কমিশন নিচ্ছিলেন মজিবুল। কেউ চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিতে না চাইলে তার পোষ্য দালাল দিয়ে জমিতে মিথ্যা ‘মিস কেস’ করিয়ে ফাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হতো। দৈনিক সোনালী খবরে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় মজিবুলকে টাঙ্গাইলে বদলি করলেও ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিকেরা কেবল বদলিতেই শান্ত হতে পারছেন না। ভুক্তভোগী ভূমি মালিকেরা জোর দাবি জানিয়েছেন, যেসব মৌজার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বিল প্রতারণা, জালিয়াতি ও ভুয়া দলিল সাজিয়ে অসাধু চক্রকে প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত করা হোক। ভুয়া দলিল ও ভুয়া মালিক বানিয়ে যে বিপুল পরিমাণ বিল প্রদান করা হয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে সরকারের আত্মসাৎকৃত শত শত কোটি টাকার রাজস্ব দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সাথে ভুক্তভোগী ভূমি মালিকেরা সার্ভেয়ার মজিবুল হকের এই বদলির পর ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও মতিঝিলের সাবেক এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি শাস্তির জোর দাবি প্রকাশ করেছেন, যাতে ডিসি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সিন্ডিকেটের অবসান ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

দৈনিক সোনালী খবরের অনুসন্ধানী সংবাদে তোলপাড়, অবশেষে বদলি ঢাকা ডিসি অফিসের বিতর্কিত সার্ভেয়ার মজিবুল হক

আপডেট: ০৮:১২:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বদলি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ৫০ লাখ টাকার মিশন!

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির ২
ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, জালিয়াতি, ভুয়া দলিল বানিয়ে শত কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ ও সিন্ডিকেট রাজত্বের মূল কারিগর সার্ভেয়ার মজিবুল হকের অপকর্ম নিয়ে ‘দৈনিক সোনালী খবর’ পত্রিকায় ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। পত্রিকায় মজিবুল হকের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর নথিপত্র প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সার্বিক প্রশাসনিক ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং দুর্নীতির লাগাম টানতে গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর: ০৫.৪১.৩০০০.০০০.০০৯.১৯.০০০৪.২৫.৪৩৮) মজিবুল হকসহ চারজন সার্ভেয়ারকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। আদেশে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সার্ভেয়ার মো: মজিবুল হককে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। উক্ত সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, তাকে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে; অন্যথায় ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ অপরাহ্নে তিনি বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (ঝঃধহফ জবষবধংবফ) বলে গণ্য হবেন।
তবে সরকারি আদেশে টাঙ্গাইলে বদলি করা হলেও ঢাকা জেলা প্রশাসনের অঘোষিত ‘মাফিয়া’ হিসেবে পরিচিত এই বিতর্কিত কর্মকর্তা কোনোভাবেই ঢাকার ডিসি অফিস ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি নন। নিজের অবৈধ ক্ষমতার আস্তানা ও অনৈতিক অর্থ উপার্জনের আখড়া ধরে রাখতে তিনি যেকোনো মূল্যে এই বদলি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার ডিসি অফিসে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে এবং বদলি আদেশ স্থগিতের তদবির চালাতে মজিবুল হক তার অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকার পাহাড় থেকে প্রায় অর্ধকোটি (৫০ লাখ) টাকার বিশাল এক চুক্তি বা মিশনে নেমেছেন। উর্ধ্বতন প্রশাসনিক বলয়ে মোটা অঙ্কের টাকা ঢেলে এই বদলির সিদ্ধান্ত নস্যাৎ করার চক্রান্ত করছেন তিনি, কারণ ঢাকা ডিসি অফিসের এলএ শাখা ছেড়ে টাঙ্গাইলে যাওয়া মানেই তার কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও সুসংগঠিত দালালি সিন্ডিকেটের অবসান ঘটা, আর সেই ভয়েই তিনি নিজের অবৈধ সাম্রাজ্য বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের হাতে চরম হয়রানি, শোষণ ও জালিয়াতির শিকার হওয়া ভুক্তভোগী সাধারণ ভূমি মালিকেরা দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মজিবুল হকের টাঙ্গাইলে বদলির আদেশের খবর জানতে পেরে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তাদের মতে, ঢাকা ডিসি কার্যালয়ের ইতিহাসে মজিবুল হক ও তার অনুসারী চক্রটি সাধারণ জমিদাতাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের চরম অনুগত কর্মকর্তা ও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিবুল হক যখন ঢাকার জেলা প্রশাসক ছিলেন, তখন তার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় সার্ভেয়ার মজিবুল হক পুরো ডিসি অফিসে নিজের পেশী শক্তি প্রয়োগ করে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। তৎকালীন ডিসি মহিবুল হকের অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে মজিবুল হকের কথার বাইরে অন্য কোনো সার্ভেয়ার বা কর্মকর্তার কথা বলার সাহস ছিল না এবং তারা যৌথভাবে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বিল বণ্টনের নামে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ করেন। তারা আইনকানুন ও প্রশাসনিক বিধিমালার তোয়াক্কা না করে এক ভাইয়ের প্রাপ্য জমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত করেছেন। তাছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন মূল্যবান সরকারি সম্পত্তির কোনো বৈধ ছাড়পত্র বা আইনি অনুমোদন গ্রহণ না করেই ভুয়া ফাইল সাজিয়ে বিল প্রদান করা হয়, এবং একই জমির দ্বৈত খতিয়ান দেখিয়ে ‘ওভারল্যাপিং’ এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট করার নজির স্থাপন করেন মজিবুল হক।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আগেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬ এর অধীনে সর্বোচ্চ মূল্যের মৌজা দর বসিয়ে এবং বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের অসংশ্লিষ্ট ভুয়া দলিল তৈরি করে এক ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকার সরকারি ক্ষতিপূরণ বিল আত্মসাৎ করেছিলেন সার্ভেয়ার মজিবুল হক, কবির হোসেন ও আনিসুর রহমান সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে উক্ত জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় মজিবুল হক গং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং চাকরিচ্যুত হন। কিন্তু সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করে জেল থেকে বের হয়েও থেমে থাকেননি মজিবুল; উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চতুরতার সাথে ম্যানেজ করে ও আইনি ফাঁকফোকরের অজুহাতে সুকৌশলে পুনরায় একই ডিসি অফিসের এলএ শাখাতেই স্বপদে ফিরে আসেন। দাপ্তরিকভাবে তিনি এলএ শাখা-১ এ পোস্টিং থাকলেও মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের মোটা অঙ্কের বিল চলমান থাকা এলএ শাখা-৩ এর সকল অপকর্মের মূল চাবিকাঠি নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। এমনকি নিজের ভিত মজবুত রাখতে ‘সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি ভুয়া কমিটি গঠন করেন এবং এডিসি এলএ ও অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের সাথে গভীর সখ্য গড়ে তোলেন। সর্বশেষ মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন (এলএ কেস নং ১৭/২৩-২৪), মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা (এলএ কেস নং ১৫/২৩-২৪) এবং মৌজা: বাড্ডা (এলএ কেস নং ০৭/২৩-২৪) এর কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিলে ১ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ কমিশন নিচ্ছিলেন মজিবুল। কেউ চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিতে না চাইলে তার পোষ্য দালাল দিয়ে জমিতে মিথ্যা ‘মিস কেস’ করিয়ে ফাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হতো। দৈনিক সোনালী খবরে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় মজিবুলকে টাঙ্গাইলে বদলি করলেও ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিকেরা কেবল বদলিতেই শান্ত হতে পারছেন না। ভুক্তভোগী ভূমি মালিকেরা জোর দাবি জানিয়েছেন, যেসব মৌজার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বিল প্রতারণা, জালিয়াতি ও ভুয়া দলিল সাজিয়ে অসাধু চক্রকে প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত করা হোক। ভুয়া দলিল ও ভুয়া মালিক বানিয়ে যে বিপুল পরিমাণ বিল প্রদান করা হয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে সরকারের আত্মসাৎকৃত শত শত কোটি টাকার রাজস্ব দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সাথে ভুক্তভোগী ভূমি মালিকেরা সার্ভেয়ার মজিবুল হকের এই বদলির পর ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও মতিঝিলের সাবেক এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি শাস্তির জোর দাবি প্রকাশ করেছেন, যাতে ডিসি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সিন্ডিকেটের অবসান ঘটে।