লক্ষ্মীপুরের আবাসিক হোটেলে বসে বিশ্বব্যাংকের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট চালাচ্ছিলেন সোহাগ-করছিলেন প্রতারণা, অতঃপর…
- আপডেট: ০৫:৪০:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৮০০৪
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে বিশ্বব্যাংকের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে অনলাইনে কম সুদে ঋণ প্রদানের প্রতারণামূলক প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছিল একটি আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। লক্ষ্মীপুরের একটি আবাসিক হোটেল থেকে চক্রের সক্রিয় এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) ইউনিট। গ্রেফতারকৃত আসামির নাম–মো. সোহাগ হোসেন।
রবিবার (৩০ নভেম্বর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান,প্রতারক চক্রের সদস্যরা সাধারণ জনগণের সাথে প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে নিজেদেরকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ কর্মসূচির প্রতিনিধি পরিচয় দেয়। তারপর নিজেদেরকে “লোন অফিসার,এমএসএস ইউনিট,কার্ড ডিভিশন, হেড অফিস, ঢাকা, World Bank” পদবিতে পরিচয় দিয়ে ২% সুদে ১০ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদনের প্রলোভন দেখায়।
পরবর্তীতৈ প্রতারকরা ভিকটিমদেরকে “https://bdworldloanprojectcw.com” নামের একটি ভুয়া ব্যাংকিং ওয়েবসাইটের লিংক পাঠিয়ে সেখানে আবেদন করতে বলে এবং বিভিন্ন চার্জ, ভ্যাট, ইন্সুরেন্স ও প্রক্রিয়াকরণ ফি বাবদ একাধিকবার টাকা পাঠাতে বাধ্য করে।
এভাবেই বিকাশ ও নগদসহ অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪৮ টাকা ধাপে ধাপে প্রদান করে প্রতারণার শিকার হয়ে একজন ভুক্তোভোগী ডিএমপির শাহজাহানপুর মামলা করেন। মামলাটির তদন্তভার গ্রহন করে সাইবার পুলিশ সেন্টারের সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট টিম তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত মূল সক্রিয় সদস্য লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা মো.সোহাগ হোসেনকে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে ২৮ নভেম্বর ভোরে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানা এলাকার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে ৫টি মোবাইল ফোন,একাধিক বিকাশ ও নগদ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট,এবং ব্যক্তিগত তথ্যসহ মোট ৯টি মোবাইল নম্বর ও অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে জানা গেছে,গ্রেফতারকৃত সোহাগ হোসেন একটি আন্তর্জাতিক “বিনিয়োগ ও ঋণ প্রতারণা” চক্রের অংশ,যার মূল হোতা বিদেশে অবস্থান করছে। এই চক্র বিশ্বব্যাংক,ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার নাম,লোগো,ওয়েবসাইট ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অনলাইনে টাকা আত্মসাৎ করে আসছে।
সিআইডি জানায়,গ্রেফতারকৃত আসামি মো.সোহাগ হোসেন এই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। চক্রটির বিদেশে অবস্থানরত মূল হোতার সরাসরি নির্দেশে সোহাগ প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বিকাশ ও নগদ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানির সিমকার্ড পরিচালনা ও সরবরাহ করতেন। এছাড়া,তিনি বাংলাদেশে চক্রটির অবৈধ আর্থিক লেনদেন সমন্বয় করতেন এবং প্রতারণার মাধ্যমে আয় হওয়া অর্থ চক্রটির বিদেশে থাকা সদস্যদের কাছে পাঠাত।
বিশ্বব্যাংক,ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এরই মধ্যে অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ বাংলাদেশ পুলিশ এর বিভিন্ন ইউনিটের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে,যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সাইবার সাপোর্ট সেন্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী,একই পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে এ ধরনের একাধিক মামলা রুজু হয়েছে। এসকল মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি মো.সোহাগ হোসেন এবং বিদেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামি সোহাগ হোসেনকে আদালতে সোপর্দ করে আন্তঃদেশীয় চক্রের অন্যান্য সদস্য,ব্যবহৃত ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাব,জাল ওয়েবসাইট, টাকার লেনদেনের পথ এবং চক্রটি কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত সকল ভুক্তভোগীর সংখ্যা ও পরিচয় যাচাই করার স্বার্থে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
প্রতারণা এড়াতে সিআইডির সতর্কতা
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার সাধারণ জনগণকে সতর্ক করে জানিয়েছে যে,কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কখনোই ফেসবুক,অচেনা নম্বর বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ঋণ প্রদান করে না। যদি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা “ফি,ট্যাক্স,চার্জ বা ভেরিফিকেশন কস্ট” এর নামে টাকা চায়,তবে সেটি নিঃসন্দেহে প্রতারণা।




















