ডিএমপির একজন সৎ ও কর্মঠ পুলিশ কর্মকর্তার প্রস্থান
- আপডেট: ০৭:৪১:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৮০১১
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বুধবার(২৫ ফেব্রুয়ারি) পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ এখনও প্রায় নয় মাস বাকি থাকলেও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
বলা হচ্ছে, পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসে ডিএমপি কমিশনার পদ থেকে এভাবে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর নজির বিরল। অতীতে অধিকাংশ কর্মকর্তাই দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত পদে বহাল থাকতে আগ্রহী ছিলেন; কিন্তু সাজ্জাত আলী দায়িত্ববোধ ও আত্মসম্মানের উজ্জ্বল উদাহরণ দেখালেন।
এদিকে, পুলিশ প্রশাসনে চলমান পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা আলী হোসেন ফকিরকে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী আইজিপি বাহারুল আলমকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে র্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) শহিদুর রহমান ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান গোলাম রসুলেরও দায়িত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
কর্মজীবনে সাজ্জাত আলী সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সবার কাছে পরিচিতি রয়েছে। বিএনপি পরিবারের হওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করে। চাকরি হারানোর পর প্রায় এক দশক তিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করেন।
তাঁর সহকর্মীরা বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তোলার চেয়ে পেশাগত সততাকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন; ঢাকায় নিজের বাড়ি বা উল্লেখযোগ্য ব্যাংক সঞ্চয় না থাকলেও নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করেননি—এ কারণেই তাকে বাহিনীতে একজন নীতিবান কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয়।
কারণ, বিগত সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে যেসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই অবৈধ উপায়ে শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে টাকা হাতানোর অহরহ অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সাজ্জাত আলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দায়িত্ব পালনের প্রায় ১৫ মাসে এমন অভিযোগ কেউ সামনে আনতে পারেনি। এমনকি অধিনস্ত কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
এদিকে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই সাজ্জাত আলীকে ওএসডি করে। পরে ২০১৬ সালে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাঁর আগে ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হন তিনি। পরে পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি অ্যাডমিন করা হয় তাকে। তৎকালীন বিএনপি সরকার সাজ্জাত আলীকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি করে। সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সাজ্জাত আলীকে সরিয়ে সারদা পুলিশ স্টাফ কলেজের প্রিন্সিপাল করে। এসময় তিনি এনডিসি কোর্সে যান। সেখান থেকে ফিরে এলে তাকে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ওএসডি করে।
সাজ্জাত আলী বিসিএস ষষ্ঠ ব্যাচের কর্মকর্তা। এই ব্যাচ থেকে আওয়ামী লীগ সরকার দু’জনকে আইজিপি করে। তাদের একজন জাবেদ পাটোয়ারী; অপরজন হলেন এ কে এম শহীদুল হক। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা বাহারুল আলমকে আইজিপি করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে শেখ মো. সাজ্জাত আলী সরাসরি মাঠে নেমে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পূর্ব মুহূর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘিরে আন্দোলন শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একাধিক দফায় সংঘর্ষের সময় ডিএমপি কমিশনার নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দেন।
সহকর্মীদের মতে, তাঁর সততা, নেতৃত্বগুণ এবং দায়িত্ববোধ পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তাঁর প্রস্থান পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি শূন্যতা তৈরি করবে।




















