ডেমরার রাজস্ব সার্কেল দখলের খেলায় ভুমিদস্যু জুনায়েদের সিন্ডিকেট, চাপে সৎ কর্মকর্তা
- আপডেট: ০৯:২৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৮০০৬
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
রাজধানীর ঢাকা নগরীর ডেমরা রাজস্ব সার্কেল ঘিরে বহুল আলোচিত ভুমিদস্যু জুনায়েদকে নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রথম পর্বে তার জালিয়াতি, প্রতারণা ও সিন্ডিকেট কার্যক্রমের ভয়াবহতা উঠে এলেও, দ্বিতীয় পর্বে বেরিয়ে এসেছে আরও উদ্বেগজনক এক দিক—প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা এবং সৎ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধুমাত্র জমি দখল বা জাল দলিল তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই জুনায়েদের নেটওয়ার্ক। বরং তার চক্র এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা ভূমি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের বর্তমান এসি ল্যান্ডকে ঘিরে যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, জুনায়েদের সিন্ডিকেট থেকে এসি ল্যান্ডকে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল—ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পত্তি দখলের পথ আরও সহজ করা। কিন্তু ওই কর্মকর্তা প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শুরু হয় তাকে সরিয়ে দেওয়ার নানামুখী তদবির।
সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যোগাযোগ করে এসি ল্যান্ডকে ডেমরা থেকে প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। এই তদবিরের পেছনে সক্রিয় রয়েছে জুনায়েদের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট সদস্যরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তাদের লক্ষ্য একজন সৎ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে এমন কাউকে বসানো, যিনি তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের বর্তমান এসি ল্যান্ড দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ যখন চাইবে, তখন আমাকে প্রত্যাহার করতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমি এই দায়িত্বে আছি, কোনো ধরনের ভয়-ভীতি, পেশিশক্তির হুমকি বা বদলির আশঙ্কা দেখিয়ে আমাকে দিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি আপসহীন অবস্থানেই রয়েছেন। তিনি আরও জানান, ভূমি সেবার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বর্তমান সরকারের ভূমিবান্ধব নীতির আলোকে, সঠিক কাগজপত্র থাকলে দ্রুত ও নির্ভুল সেবা প্রদানই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এই অবস্থানকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলছেন এমন চাপের মধ্যে একজন কর্মকর্তা কতদিন টিকে থাকতে পারবেন
স্থানীয়দের মতে জুনায়েদের চক্রের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো তারা শুধু জমি দখলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে যদি প্রশাসনের ভেতরে সৎ কর্মকর্তারা টিকে থাকতে না পারেন তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এখন যদি সৎ কর্মকর্তাদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আর কোনো আশ্রয় অবশিষ্ট থাকবে না। তারা আশঙ্কা করছেন এতে করে ডেমরা অঞ্চলে ভুমিদস্যুতার দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা একটি বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। কোনো অপরাধচক্র যখন প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তখন তা শুধু একটি এলাকার সমস্যা থাকে না বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার জন্য হুমকিতে পরিণত হয়। তাই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এদিকে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। তারা চান, যারা অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের যেন বদলি বা হয়রানির শিকার হতে না হয়।
ডেমরার এই পরিস্থিতি এখন এক ধরনের নীরব সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে একদিকে প্রভাবশালী ভুমিদস্যু চক্র, অন্যদিকে সীমিত ক্ষমতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৎ প্রশাসন। এই লড়াইয়ের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে, নাকি আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।


















