ডিসি অফিসে অঘোষিত আধিপত্য, কে এই হেলেনা
- আপডেট: ০৯:৪০:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৮০২৭
বিশেষ প্রতিনিধি:
রাজধানীর গুলিস্তান থেকে শুরু করে ঢাকার প্রশাসনিক অঙ্গন—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটি নাম, হেলেনা। স্থানীয়দের দাবি এক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত এই নারী আজ প্রভাব, ক্ষমতা ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের জোরে নিজেকে এক অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে নিয়ে গেছেন। তার উত্থান, প্রভাব বিস্তার এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় একসময় সেলিনা অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ওই সময় থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বিশেষ করে আ.লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে তিনি ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন তিনি আ.লীগের পার্টি অফিসের সামনে অনৈতক কাজ পাওয়ার আশায় দাড়িয়ে থাকতেন।
হেলেনার জীবনের বড় মোড় আসে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনায়। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং সামান্য আহত হন বলে দাবি করা হয়। এই ঘটনার পর তিনি আহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রবেশ আরও সুদৃঢ় হয়। পরবর্তীতে এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে তিনি নিজেকে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এরপর থেকেই হেলেনার কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেন এবং একপর্যায়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও কানুনগোদের বদলি, পদায়ন কিংবা বদলি স্থগিত করার মতো বিষয়ে তার সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ উঠে আসে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক পোস্টিং নিশ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তিনি নানা কৌশল অবলম্বন করেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তিনি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখতে এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক পন্থা ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোনো সরকারি পদে না থেকেও হেলেনা নিয়মিত ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেখা যায় বলে জানা গেছে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তিনি অফিসে অবস্থান করেন এবং বিশেষ করে এলএ শাখায় তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে একজন বেসরকারি ব্যক্তি সরকারি অফিসে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “তার সঙ্গে উর্ধ্বতন পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, যা তাকে এই ধরনের সুযোগ করে দিয়েছে।” তবে এ বিষয়ে কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে গুলিস্তান এলাকার সাধারণ মানুষও হেলেনার অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, তার উত্থান স্বাভাবিক নয় এবং এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তারা বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু একজন ব্যক্তির অনৈতিক উত্থানের গল্প নয়—বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাবের একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে, হেলেনাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন গুরুত্ব সহকারে তদন্তের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালালে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও জবাব মিলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।




















