সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান সুলতান মাহমুদের মৃত্যুবার্ষিকী পালন
- আপডেট: ১১:১১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৮০০৪
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তি ‘কিলো ফ্লাইট’ কমান্ডার ও সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) সুলতান মাহমুদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
এ উপলক্ষে বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি ও ইউনিটের মসজিদে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাদ জুমা তার জীবনীর ওপর আলোকপাত করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমানে ফেনী) জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নূরুল হুদা এবং মা আনকুরেন্নেছা বেগম।
তিনি ঢাকার আরমানিটোলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সারগোদার পিএএফ পাবলিক স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন ও ১৯৬২ সালে রিসালপুরের পিএএফ একাডেমি থেকে এফএসসি এবং ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
সুলতান মাহমুদ ১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট তদানীন্তন পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সালের ১ জুলাই জিডি (পি) শাখায় কমিশন লাভ করেন।
আইএসপিআর জানায়, এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ ছিলেন একজন চৌকস বৈমানিক। চাকরিকালে তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশাগত কোর্সে অংশ নেন এবং সফলতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করেন।
সুলতান মাহমুদ ১৯৭১ সালে দেশপ্রেমের অদম্য চেতনায় মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অর্জন করেন লাল-সবুজের পতাকা। তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদের বীরত্বগাঁথা এ মহান ইতিহাসের এক অনুকরণীয় অধ্যায়।
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অদম্য ইচ্ছায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে ২ নম্বর সেক্টরে (মতিনগর ও মেলাঘর) স্থলযুদ্ধে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
স্থলযুদ্ধে তিনি অদম্য সাহসের সঙ্গে রামগড় থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অসংখ্য দুঃসাহসিক অপারেশন পরিচালনা করেন। গেরিলা কমান্ডার হিসেবে তার পরিচালিত বড় একটি অভিযান ছিল চট্টগ্রামের মদুনাঘাটে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ধ্বংস ও চট্টগ্রাম এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা। এই স্থলযুদ্ধ চলাকালে তিনি শত্রু কর্তৃক ডান হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ সুস্থ হয়ে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে নবগঠিত ‘কিলো ফ্লাইট’-এর অধিনায়কত্ব গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিমানবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তিনি পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে অ্যালুয়েট-থ্রি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপো ধ্বংস করে প্রথম বিমান আক্রমণ অভিযানের সূচনা করেন।
তার চৌকস অধিনায়কত্বে ‘কিলো ফ্লাইট’ স্বল্পসময়ের মধ্যে মোট ৫০টি দুঃসাহসিক বিমান অভিযান সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করে। এর মধ্যে তিনি ২৫টি অভিযানে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। আকাশ থেকে পরিচালিত এসব অভিযান শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি তাদের মনোবল দুর্বল করে, যা বাংলাদেশের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ যুগপৎভাবে স্থলযুদ্ধে দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা, নবগঠিত বিমান বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া এবং আকাশযুদ্ধে অকুতোভয় আক্রমণ পরিচালনা করার মাধ্যমে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশাত্মবোধ ও সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের জন্য তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন এবং অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন।
এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ ১৯৮১ সালের ২৩ জুলাই বিমানবাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৭ সালের ২৩ জুলাই বর্ণাঢ্য কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তার অনন্য ভূমিকা, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে দেশ গঠনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮’-এ ভূষিত করে।
তিনি ৩৬ বছর ২২ দিন অবসর যাপনের পর ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর ১৪ দিন। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।



















