কোটি টাকার পেনশন কেলেঙ্কারি – এবার আলোচনায় অবসরপ্রাপ্ত নৌ সদস্য জি এম সাজ্জাদ
- আপডেট: ০৬:০৮:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮০০৩
মেয়ের ডায়ালাইসিসের অর্থ জোগাতে অনিয়মে জড়ানোর কথা জানালেন অবসরপ্রাপ্ত নৌ সদস্য সাজ্জাদ
মোসলেহ্উদ্দিন তুহিনঃ সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জি এম সাজ্জাদ হোসেনের ভূমিকা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। কথোপকথনে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, তাঁর অসুস্থ মেয়ের কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যয় মেটাতে অর্থের প্রয়োজন ছিল এবং অর্থ জোগাড়ের অন্য কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে তিনি অনিয়মের এই প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েন। তবে তাঁর মেয়ের চিকিৎসা ও আর্থিক পরিস্থিতি-সংক্রান্ত বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, এটি তাঁর নিজের দেওয়া ব্যাখ্যা হিসেবেই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে অভিযোগ উঠেছে, অডিট অফিসের শাহীনুর রহমানের সঙ্গে সাজ্জাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং অবসরপ্রাপ্ত নৌ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখতেন। দৈনিক সোনালী খবরের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে কথা বলা একাধিক অবসরপ্রাপ্ত নৌ সদস্য দাবি করেছেন, পরিচয় ও আস্থার সম্পর্কের মাধ্যমে তাঁদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাঁদের কয়েকজন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির কাছেও এ বিষয়ে বক্তব্য ও প্রমাণ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নথি, ব্যাংক রেকর্ড এবং iBAS++-এর তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকাশিত অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, জি এম সাজ্জাদ হোসেনের ব্যাংক হিসাবে এক বছরের বেশি সময়ে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছিল। অস্বাভাবিক লেনদেন হওয়া কয়েকজন পেনশনভোগীর বক্তব্যেও শাহীনুর রহমান খান ও জি এম সাজ্জাদ হোসেনসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। সাজ্জাদ এর আগে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁর হিসাবে অর্থ আসার পর শাহীনুর রহমান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং কখনো নগদে, কখনো ব্যাংক হিসাবে অর্থ দেওয়া হতো। তবে নিজের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কথা বিশ্বাস করে তিনি সমস্যায় পড়েছেন।
দৈনিক সোনালী খবরের অনুসন্ধানে সাজ্জাদ হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাজ্জাদের সঙ্গে রেকর্ডকৃত কথোপকথনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম, অফিস বা দোকান, ক্রয়-বিক্রয়, কর্মচারী, ট্রেড লাইসেন্স, TIN/VAT নথি এবং ব্যাংক লেনদেন যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পেনশনভোগীদের কাছ থেকে এসব ব্যবসায়িক হিসাবে অর্থ গিয়ে থাকলে তার বৈধ ব্যবসায়িক কারণ কী ছিল এবং পরে সেই অর্থ কোথায় গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দৈনিক সোনালী খবরের কাছে বক্তব্য দেওয়া ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ জমা হওয়ার পর সেই অর্থের একটি অংশ অন্যত্র ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ছিল। এ কারণে তদন্তে শুধু কার হিসাবে সরকারি অর্থ প্রথমে জমা হয়েছে তা নয়, পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ নগদে উত্তোলন হয়েছে নাকি অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক হিসাবে স্থানান্তর হয়েছে, পুরো অর্থপ্রবাহ অনুসরণ করা জরুরি।
এ ঘটনায় সাজ্জাদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কেবল নিজের ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন, নাকি অবসরপ্রাপ্ত নৌ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ, অর্থ গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ অন্যত্র পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্য ও দৈনিক সোনালী খবরের হাতে থাকা রেকর্ডকৃত কথোপকথনের কারণে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে সাজ্জাদের নিজের দেওয়া নতুন ব্যাখ্যাও। দৈনিক সোনালী খবরের সঙ্গে রেকর্ডকৃত কথোপকথনে তিনি তাঁর অসুস্থ মেয়ের কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচের কথা উল্লেখ করে অর্থসংকটের কারণে অনিয়মের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ার কথা জানান। তাঁর এই বক্তব্য আগের ‘সরল বিশ্বাসে সমস্যায় পড়ার’ ব্যাখ্যার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক সংকট বা পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কোনো বেআইনি আর্থিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের আইনগত বৈধতা দেয় না, তাঁর প্রকৃত ভূমিকা ও দায় কতটুকু, সেটি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
পুরো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে এখন অর্থের গতিপথ বা ‘মানি ট্রেইল’ অনুসরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। iBAS++-এ কার User ID ব্যবহার করে বকেয়া পেনশন বিল তৈরি হয়েছে, কে Certificate ও Token তৈরি বা অনুমোদন করেছেন, কোন EFT/BRN-এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ পেনশনভোগীর হিসাবে গেছে, সেখান থেকে কত টাকা নগদে তোলা হয়েছে বা অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থের সুবিধাভোগী কারা, এই পুরো শৃঙ্খল তদন্তে বের করা প্রয়োজন।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট EFT-এর BRN, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, Deposit Slip, ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবের KYC, iBAS++ User ID ও Audit Trail এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্য আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে সাজ্জাদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বা নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসায়িক হিসাবের লেনদেন পরীক্ষা করলে সরকারি অর্থের শেষ গন্তব্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ঘটনাটি সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ, একাধিক পেনশনভোগী, ব্যাংক হিসাব এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় তদন্তে যাঁদের ভূমিকা ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের কারও দেশত্যাগের ফলে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কিংবা সরকারি অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এমন ঝুঁকির সুনির্দিষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।
জি এম সাজ্জাদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা ও দায় নির্ধারণ করতে হবে ব্যাংক লেনদেন, iBAS++ Audit Trail, সরকারি নথি, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সমন্বিতভাবে যাচাই করে। দৈনিক সোনালী খবর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। নতুন নথি ও তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে।



















