*ভোটের আগে সীমান্তে অস্ত্র উদ্ধার: সাফল্য নাকি শঙ্কা?*
- আপডেট: ০৪:৫৩:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৮০০৩
সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক:
ভোট সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার ও চোরাচালান প্রতিরোধের ঘটনাগুলো নিয়ে যে সংবাদপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা আরও সতর্ক সাংবাদিকতাগত বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এখানে তথ্য গোপনের প্রশ্ন নেই; বরং প্রশ্ন হলো, কোন তথ্য কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং সেই উপস্থাপন জনমনে কী ধরনের ধারণা তৈরি করছে। প্রেক্ষাপটহীন শিরোনাম যদি কেবল উদ্বেগ বাড়ায়, তবে তা তথ্য নয়, অনিচ্ছাকৃত আতঙ্ক উৎপাদনে পরিণত হয়।বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলের একাধিক পয়েন্টে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান আটকানো হয়েছে।
র্যাব, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে এসব অস্ত্র দেশের ভেতরে প্রবেশের আগেই বা প্রাথমিক পর্যায়েই জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এসব তথ্য নিঃসন্দেহে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে যখন উদ্ধারকেই সীমান্তের দুর্বলতা বা ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে ফ্রেম করা হয়, তখন সংবাদ ও বিশ্লেষণের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।নিরাপত্তা বাস্তবতায় যে এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার হয়, সেটি সব ক্ষেত্রে অস্ত্র প্রবেশের মুক্ত পথ নয়। বরং অনেক সময় সেটিই এমন এলাকা, যেখানে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে চোরাচালানকারীদের তৎপরতা ধরা পড়ে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অস্ত্র চোরাচালান সাধারণত সেসব রুটেই সফল হয়, যেখানে নজরদারি দুর্বল। সেখানে অস্ত্র ধরা পড়ে না; বরং সেগুলো দেশের অভ্যন্তরে গিয়ে অপরাধ সংঘটনের পর উদ্ধার হয়। এই প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করলে পাঠক বাস্তবতার অসম্পূর্ণ চিত্র পান।এই বাস্তবতায় সীমান্তের সাতটি, আঠারোটি বা ত্রিশটি পয়েন্টে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার অর্থ হলো, ওই সব স্থানে চোরাচালানকারীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পয়েন্ট আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল এবং সেখানে পরিকল্পিত নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েনি, যা সম্ভাব্য নির্বাচনী সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা কমাতে বাস্তব ভূমিকা রেখেছে।সাম্প্রতিক গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদে দেখা গেছে, চোরাচালানকারীরা বারবার একই রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছে, তবে নজরদারি জোরদার থাকায় এসব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়, ঝুঁকি থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় ও অভিযোজিত রয়েছে।এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল উদ্বেগ তুলে ধরা নয়; একই সঙ্গে সেই উদ্বেগের প্রেক্ষাপট, প্রতিরোধের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট করা। উদ্ধার ও অভিযানের তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে যদি শিরোনাম বা উপসংহারে ব্যর্থতার বয়ান তৈরি হয়, তবে সংবাদ ও মতামতের সীমারেখা ঝাপসা হয়।উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো ব্যবহারের আগেই আটকানো হয়েছে, যা নির্বাচনী সহিংসতা রোধে একটি বাস্তব সাফল্য। সীমান্তের যেসব পয়েন্টে বারবার অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, সেগুলোকে ব্যর্থতার মানচিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ও নজরদারির মানচিত্র হিসেবে দেখা উচিত।
নজরদারি যত কার্যকর হবে, উদ্ধার তত দৃশ্যমান হবে। এই দৃশ্যমানতাই প্রতিরোধের প্রমাণ।ভোটের আগে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ এখানেই—ঝুঁকি দেখানো, কিন্তু আতঙ্ক না ছড়ানো; প্রশ্ন তোলা, কিন্তু বাস্তব সাফল্য আড়াল না করা।


















